সাহিত্য পত্রিকার জন্য ডাকঘর – ‘অর্চনা উপ ডাকঘর, কলকাতা ৭০০০০৭’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম দিয়েছিলেন ‘অর্চ্চনা’

লাইন এগিয়ে যায়। চিঠি ফেলে আসি ডাকবাক্সে।

আমি জানি এচিঠির কোনও উত্তর আসবে না।

কেননা যেখানে চিঠি পাঠাই

তার ঠিকানা জানি না আমি। চিনি না তাকে

যার কাছে চিঠি লিখি।

বাংলাদেশের কবি মাশা’র লেখা এই কবিতা সেখানে নিয়ে যায়, যেখানে সচরাচর কেউ যায় না আর; কেউ যায় না ডাকঘরে, কেউ আর চিঠি লেখে না। তবু, শহরের আনাচে কানাচে চুপিসাড়ে বসে কোনও কোনও ডাকঘর এখনও অপেক্ষা করে, কেউ আসবে… চিঠির জন্য নয়, কলকাতার পরতে পরতে যে ইতিহাস রয়েছে, তার কাহিনি শোনাবে বলে। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির তোরণ বরাবর সোজা তাকালে দেখা যাবে সেরকমই এক ডাকঘর। অর্চনা উপ ডাকঘর। কলকাতা-৭০০০০৭।

জোড়াসাঁকোর পার্বতী ঘোষ লেন এবং রমানাথ সাধু লেন জুড়ে থাকা তারিণীচরণ চন্দ্রের বাড়িতে শুরু হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক যাত্রা। তারিণীচরণের ছেলে কৃষ্ণদাস চন্দ্র ছিলেন ব্যবসায়ী। সাহিত্যের নেশায় ১৯০৪ সালে শুরু করেন একটি পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাম দিয়েছিলেন ‘অর্চ্চনা’। হ্যাঁ, ঠিক বানানই দেখছেন, ‘অর্চ্চনা’। পরের প্রজন্মে ‘অর্চ্চনা’ বানান পাল্টে গিয়ে ‘অর্চনা’ হয়।

প্রথম সম্পাদক ছিলেন জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। কৃষ্ণদাস চন্দ্র, উমাচরণ ধর, সরসিবালা দেবী, নগেন্দ্রনাথ সোম, নলিনী ঘোষ, ফণীন্দ্রনাথ রায়, ধরিত্রী দেবী, কেশবচন্দ্র গুপ্ত, জীবনেন্দ্র কুমার দত্ত, ব্রজসুন্দর সান্যাল, ফকিরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকরা নিয়মিত লিখতেন এই পত্রিকায়। গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, সমালোচনায় ভরা এই মাসিক পত্রিকা আবির্ভাবেই সাড়া ফেলে দিয়েছিল। শুরু থেকেই তারিণীচরণের বাড়িতেই ছিল পত্রিকার কার্যালয়। বাড়ির এক দিকে বসত ‘অর্চ্চনা পরিষদ’-এর আড্ডা। বিভিন্ন সময়ে সেখানে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গিরিশ ঘোষ, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, অন্নদাশঙ্কর রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র, বিপিনচন্দ্র পাল-সহ বহু দিকপাল ব্যক্তিত্ব।প্রথমে বাইরে থেকে ছাপা হলেও ১৯৪৮ সালে প্রায় ২২০০ টাকা খরচে যন্ত্র কিনে নিজেদের বাড়িতেই শুরু হয় অর্চনা প্রিন্টিং ওয়ার্কস এবং পাবলিশার্স। তখন পত্রিকার বার্ষিক গ্রাহকমূল্য ছিল ১ টাকা ২৫ পয়সা। টাটা স্টিল, বামার লরি, বসন্ত মালতী, জিসি লাহার বিজ্ঞাপন বুঝিয়ে দেয় পত্রিকার জনপ্রিয়তা। সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার কপিও ছাপা হয়। সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল পত্রিকার গ্রাহক। এ জন্য ভরসা ছিল ডাক যোগাযোগ। বাদ সাধল সেখানেই। ডাকঘরে তখন কাজের চাপ খুব। অতি ব্যস্ত বড়বাজার ডাকঘর তাই এই মাসিক পত্রিকা বিতরণে হাত তুলে নেয়।পরিস্থিতি বুঝে কৃষ্ণদাস একটি উপ ডাকঘরের জন্য আবেদন জানালেন স্টেটসম্যান পত্রিকায় চিঠি দিয়ে। কাজ না হওয়ায় চিঠি লিখলেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনকে। আবেদন মঞ্জুর হয়। সাব পোস্ট অফিসটি তৈরি হয় ১৯০৬ সালে, ১৮ পার্বতী ঘোষ লেনে। ১৯১৭ সালে ৫১ টাকা ২৫ পয়সায় কৃষ্ণদাসের বন্ধু যুগলকিশোর মুখোপাধ্যায়ের ১০ নম্বর পার্বতী ঘোষ লেনের বাড়ির ঠিকানায় উঠে আসে সাব পোস্ট অফিস। তখন শুধুমাত্র পত্রিকা বিতরণের কাজই হত এখান থেকে। কৃষ্ণদাসের মৃত্যুর পরে তাঁর দুই ছেলে রণজিৎ এবং বাসুদেব পত্রিকার দায়িত্ব নেন। ১৯৬০ সালে পত্রিকা বন্ধ হওয়ার জন্য শেষ সম্পাদক প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র সিনেমার ম্যাগাজিনের দাপটে রুচির বদলকেই দায়ি করেছিলেন।

সেই পত্রিকা আজ ইতিহাস। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, বিডন স্ট্রিটের চৈতন্য গ্রন্থাগার-সহ দু’তিনটি পাঠাগারে রাখা আছে অর্চনার কপি। ওইটুকুই। একটি সাহিত্যপত্রিকা বিতরণের কাজে একটা ডাকঘরের প্রতিষ্ঠা ইতিহাসে বিরল ঘটনা, একথাই এক্ষেত্রে সমীচীন। তবু, এর ‘হেরিটেজ’ তকমা নেই। এমনকি কোথাও কোনও বোর্ড নেই, যাতে লেখা এর ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য। শুধু সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে, দু-তিনজন কর্মী নিয়ে ধুকধুক করছে পত্রিকার নামাঙ্কিত জরাজীর্ণ ‘অর্চনা ভবন’।

Post Tags
Developed by DXDasia