
দীর্ঘ ৩০০ বছর ধরে চলা মুঘল শাসনের প্রভাবে বাংলা অভিধানে ঠাঁই পেয়েছে প্রচুর আরবি-উর্দু-ফার্সি শব্দ৷ এছাড়া কালের নিয়মে কিছু চিনা, জাপানি, পর্তুগিজ এবং ইংরেজি শব্দ মিশে গেছে বাংলার সঙ্গে৷ ঠিক যেভাবে পর্তুগিজদের হাত ধরে আসা টমেটো বাঙালির রান্নাঘরে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয়, চিনের চাউমিন জুড়ে গেছে বাঙালিয়ানায়। বাঙালি মায়েরা চাউমিনে হলুদ দিয়ে নিজস্ব সংস্করণ বানিয়ে নিয়েছেন। মুঘলদের হাত ধরে আসা নানান পদ হয়ে গেছে রোজকার অঙ্গ। যা ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালিই গ্রহণ করে থাকেন৷ এখন কেউ কি বলবেন, মুঘলরা মুসলমান ছিল তাই তাদের খানাপিনা শুধু মুসলমানের! সুতরাং মুঘলাই বিরিয়ানি, মুঘলাই পরোটা কিছুই খাবো না, এমন বলা কি জায়েজ হবে? তাহলে ভাষার ক্ষেত্রে রাতারাতি হিন্দু-মুসলমান পৃথকীকরণটাও হাস্যকর। কিন্তু এমনটাই করছেন বাংলা ভাষার নব্য ঠিকাদাররা। (ভাষার হিন্দু-মুসলমান)
সকাল সকাল রামরতনবাবু বাজারে গেলেন৷ এখানে ‘বাজার’ শব্দটি ফার্সি থেকে আগত৷ কিংবা ধরুন, জনৈকা সরকার মহোদয়া ‘কলম’ দিয়ে ‘কাগজে’ লিখতে বসেছেন৷ এখানে সরকার শব্দটি ফার্সি প্রভাবিত, কলম আরবি আবার কাগজ শব্দটিও ফার্সি৷ অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাঙালির নিত্যকার ব্যবহৃত শব্দগুলির একটা বড়ো অংশই আরবি-উর্দু-ফার্সির দান৷ যা হামেশাই ব্যবহার করা হয়৷ এখানে ‘হামেশাই’ শব্দটিও খাঁটি বাংলা নয়৷ সেটিও ফার্সিজাত৷ (ভাষার হিন্দু-মুসলমান)
যখন এই দেশ স্বাধীন হয়নি তার বহু আগে থেকেই থেকেই বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ঘরোয়া কিছু শব্দ ছিল৷ যা বংশ পরম্পরায় লালিত হয়েছে৷ এই শব্দগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তা আসলে আরবি-উর্দু-ফারসি থেকে আগত৷ উদাহরণ হিসেবে আইন, আদালত, রায়, দোয়াত, সড়ক ইত্যাদি শব্দগুলোর মতোই নাস্তা, গোসল, দাওয়াত ইত্যাদি একই গোত্রভুক্ত শব্দ৷ বাঙালি মুসলমান নাস্তা করে, একইভাবে টিফিনও করে৷ কেউ যদি বাড়িতে ‘গোসল’ বলেন, তবে স্থানভেদে ‘স্নান’ বলেন না এমনও নয়৷ আবার যে শিক্ষিত মুসলমান নিজ আত্মীয় পরিমণ্ডলে ‘দাওয়াত’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তিনি সহকর্মীদের বাড়িতে ডাকলে ‘নেমতন্ন’ বা ‘ইনভিটেশন’ শব্দের ব্যবহার করেন৷ (ভাষার হিন্দু-মুসলমান)
যখন এই দেশ স্বাধীন হয়নি তার বহু আগে থেকেই থেকেই বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ঘরোয়া কিছু শব্দ ছিল৷ যা বংশ পরম্পরায় লালিত হয়েছে৷ এই শব্দগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তা আসলে আরবি-উর্দু-ফারসি থেকে আগত৷ উদাহরণ হিসেবে আইন, আদালত, রায়, দোয়াত, সড়ক ইত্যাদি শব্দগুলোর মতোই নাস্তা, গোসল, দাওয়াত ইত্যাদি একই গোত্রভুক্ত শব্দ৷
এছাড়া বাঙালি মুসলমানের রয়েছে কিছু সম্বোধনের শব্দ৷ তাঁরা জন্মদাতাকে বলেন আব্বা৷ ঠাকুমাকে বলেন দাদি৷ এই অভ্যাসের কারণে কেউ দাবি করতে পারেন, ‘এ কেমন বাংলা?’ ইদানীং কেউ কেউ এই শব্দগুলোকে ‘বাংলাদেশিদের বাংলা’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন৷ এখানে একটি সরল জিনিস বুঝতে হবে৷ ঠান্ডা মাথায় ভাবলে দেখা যাবে বাংলাদেশের যে মানুষটি আব্বা বলেন, আবার পশ্চিমবঙ্গে বসে যিনি আব্বা বলেন, এক্ষেত্রে মিল থাকলেও এই রীতি বা অভ্যাস বাংলাদেশ থেকে আসেনি৷ বরং দেশ-সীমার ঊর্ধ্বে এসব বাঙালি মুসলমানের এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রস্ফুটিত স্বাভাবিক বুলি৷ পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের জন্মের বহু আগে থেকেই বাঙালি মুসলমান ঘর-গেরস্তের সংস্কৃতি বজায় রেখেছেন৷ সেই সূত্র ধরেই খালা, ফুফু, নানি, ভাবী, আপা ইত্যাদি শব্দের ধারা চলে আসছে৷
এছাড়া কিছু শব্দে রয়েছে ধর্মীয় অনুসঙ্গ। ঢাকায় বসে যিনি ‘ফজর’, ‘মাগরিব’, ‘দোয়া’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করছেন, দেখা যাবে রামপুরহাটে কিংবা মেদিনীপুরে বসেও এপারের বাঙালি মুসলমান একই শব্দগুলি ব্যবহার করছেন৷ কারণ মাঝে সীমান্তরেখা থাকলেও উভয় দেশের মানুষের কাছে এগুলো ধর্মীয় শব্দ৷ যে মুসলমান সাধারণভাবে বলে, ‘আহা কী দারুণ ভোর’; সেই একই ব্যক্তি নামাজের সময় হলে বলে, ‘ওজু করে নিই, ফজরের নামাজ পড়তে হবে৷’ অর্থাৎ সে সাধারণভাবে ভোর শব্দটিকে ব্যবহার করছে, আবার ধর্মপালনের ক্ষেত্রে বলছে ‘ফজর’ শব্দটি৷ একইভাবে ‘সুন্নত’, ‘নফল’, ‘হালাল’-এর মতো শব্দগুলি মুসলমানের ধর্মাভ্যাসের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে৷ সেটা ওপারের বাঙালির জন্য যেমন সত্য, তেমনি এপারের বাঙালির জন্যও৷ এই ধর্মগত মিলের কারণে ‘এই শব্দগুলি বাংলাদেশ থেকে এসেছে’ দাবি করার অর্থ হয় অজ্ঞানতা, নইলে স্পষ্ট মিথ্যাচার৷
বাঙালি হিন্দুর যে অংশ বাঙালি মুসলমানকে কাঠগড়ায় তুলছেন, নির্দিষ্ট কিছু শব্দের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বোঝাতে চাইছেন ওই শব্দগুলি ব্যবহার করলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে প্রমাণিত হবেন৷ অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে থেকে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি তার বহুযুগের অভ্যাস ধারণ করলেও ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা জুটবে। অথচ নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে বাঙালি হিন্দুরাও একই গোত্রের শব্দ ব্যবহার করে চলেছেন– অবচেতনে, অথবা নিরুপায় হয়ে৷ কিন্তু সেই সত্য অস্বীকার করে এক শ্রেণির হিন্দু বাঙালি ভাষার সাম্প্রদায়িকতার অনুশীলন করছেন৷ উদাহরণ হিসেবে, বাঙালি হিন্দু সমাজে ‘বাবা’ শব্দের ব্যবহার হয়৷ এই বাবা শব্দটি তুর্কি শব্দ৷ তাহলে তুর্কি থেকে আগত বাবা বলতে যদি সমস্যা না হয়, তাহলে আরবি থেকে ‘আব্বা’ বলতে সমস্যা কোথায়? প্রথমটিতে সমস্যা না থেকে দ্বিতীয়টি সমস্যা হলে তা নিতান্তই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ফসল৷ বাদ দিলে সব বিদেশি শব্দ বাদ দিতে হবে, আর নইলে বহাল তবিয়তে থাকবে সবকিছু।
প্রায়ই শোনা যায়, বাঙালি মুসলমান কেন খাঁটি বাংলাতে নাম রাখে না! এক্ষেত্রে মুসলিম সমাজের সঙ্গে একাত্ম হতে তবেই আসল কারণ অনুধাবন করা যাবে। বাঙালি মুসলমানের নামে থাকে ধর্মীয় প্রভাব৷ উদাহরণ হিসেবে ‘মহম্মদ’, ‘ফতেমা’ ইত্যাদি নামের ক্ষেত্রে ইসলামী যোগসূত্র স্পষ্ট৷ যেভাবে বাঙালি হিন্দু সন্তানের নাম রাখে ঠাকুর দেবতার নামে, একইভাবে মহম্মদ কিংবা ইসমাইল নামগুলিও মুসলমান রীতির আকার নিয়েছে৷ এসব কিন্তু বাংলাকে অস্বীকার কিংবা অবহেলা করার জন্য নয়৷ সেজন্যই সৈয়দ মুজতবা আলী নাম নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অমূল্য রত্নের সৃষ্টি করা গেছে, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলায় কাব্যসাধনার পাশাপাশি ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে লিখেছেন ঠাকুরদেবতা নিয়ে ভক্তিমূলক গান৷ অবদান রেখেছেন বাঙালির সংস্কৃতিতে।
বাঙালি হিন্দু সমাজে ‘বাবা’ শব্দের ব্যবহার হয়৷ এই বাবা শব্দটি তুর্কি শব্দ৷ তাহলে তুর্কি থেকে আগত বাবা বলতে যদি সমস্যা না হয়, তাহলে আরবি থেকে ‘আব্বা’ বলতে সমস্যা কোথায়? প্রথমটিতে সমস্যা না থেকে দ্বিতীয়টি সমস্যা হলে তা নিতান্তই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ফসল৷
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানের নামে আরবি-উর্দুর ব্যবহারের পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজিতে নাম রাখার অভ্যাস৷ বনেদি মুসলমান বাড়িতে সন্তানের নাম হয় মিল্টন, রাসেল, জেনিফার ইত্যাদি৷ গ্রামবাংলায় গেলে মুসলিম পরিবারেই ঝিলিক, নূপুর, পাখি, উজ্জ্বল, কাজল ইত্যাদি নামের দেখা মিলবে। বর্তমান সময়ে এই বাংলারই তরুণ গল্পকারের নাম সৌরভ হোসেন৷ বাঙালির নামকরণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সমাজে শুধু মুসলমানের নামেই আরবি-উর্দু-ফার্সি প্রভাব নেই, বাঙালি হিন্দুদের অনেকের নামে রয়েছে এই শব্দগুলির প্রভাব৷
বাঙালির পদবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে মোঘল যুগে সরকারি চাকরির সূত্রে বহু পদের সৃষ্টি হয়। সেগুলোই পরে জুড়ে যায় বাঙালি নামের সঙ্গে। উদাহরণ হিসেবে সরকার, তালুকদার, চাকলাদার, সমাজদার, তরফদার, মহলানবিশ, খাসনবিশ, বকশি, মুনশি, শিকদার, মুস্তাফি, পোদ্দার, ওয়াদ্দেদার, নস্কর, নায়েক ইত্যাদি অধিকাংশই আরবি-উর্দু-ফারসি শব্দ থেকে এসেছে৷ এবার কেউ যদি শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে মুসলমানের দিকে আঙুল তোলেন কেন তাঁদের নামে আরবি-ফার্সি-উর্দুর মতো তথাকথিত ‘ম্লেচ্ছ’ শব্দ আছে, তাহলে বাঙালি হিন্দু সমাজের এইসকল পদবী বহনকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন করতে হবে৷ কেউ কেউ এমনও আছেন যাঁরা জানেন না তাঁরা অজান্তেই নিজের নামে থাকা আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দ আর মুঘলদের দেওয়া পদবী কবে সেঁটে ঘুরছেন৷ সেক্ষেত্রে তাঁরা কি বাঙালি নন?
খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে মুসলিম সমাজে ব্যবহৃত ঘরোয়া শব্দ, এবং ভাষা ব্যবহারের ছবি অস্পষ্ট কেন? কেনই বা হঠাৎ করে মুসলিমের স্বাভাবিক বুলিকে ‘অনুপ্রবেশকারীর শব্দ’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অপপ্রচার সম্ভব হচ্ছে? এর প্রধাণ কারণ পড়শিকে না জানা, একইসঙ্গে সাহিত্যে-চলচ্চিত্রে বাঙালি মুসলমানের কথাবার্তা, চালচলনের প্রকৃত চিত্র উঠে না আসা৷ যতটুকু উঠে এসেছে সেটাও অধিকাংশই শহুরে চোখে৷ কখনও আবার ‘স্টিরিওটাইপ’ ধারণা দেখতে পাওয়া যায়৷ বাঙালি মুসলমান মানে চোস্তা-পাঞ্জাবি পরে সারাক্ষণ টুপি মাথায় থাকবে, কথায় কথায় ‘আল্লা হু আকবর’ বলবে, চোখে সুর্মা দেবে ইত্যাদি৷ এই যদি বাঙালি মুসলমানের প্রকাশিত আদর্শ রূপ হয়, তাহলে কীভাবে জানা যাবে যে খালা, ফুফু, নানি, দুলাভাই শব্দগুলো বাঙালি মুসলমানের কত আপন৷ এই শব্দগুলির মায়া কীভাবে জুড়ে রেখেছে মুসলমানের কত স্মৃতিকে। এগুলো রাতারাতি আকাশ থেকে পড়েনি, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা এগুলো ব্যবহার করে চলেছেন৷ কখনও দাদি-নানির বলা গল্প কথায় উঠে এসেছে। যা আজও সসম্মানে লালিত হয়।
বাঙালি মুসলমান মানে যে শার্ট-প্যান্ট, জিন্সের সঙ্গে পাঞ্জাবি, এমনকি মুসলমানরা একসময় ধুতিও পরতেন৷ তাঁরাও সলিল, শ্যামল গুনগুনিয়ে ওঠেন, পূজাবার্ষিকীর অপেক্ষা করেন৷ কৈশোরের আবেগ থেকে কাঁচা হাতে বাংলায় কবিতা লেখেন৷ এসব নিয়ে যে বিস্তর অজ্ঞানতার আস্ফালন, এর দায় কার? এই অজ্ঞানতার নানান রূপ উঠে আসে৷ ‘ওই খানে তোর দাদির কবর, ডালিম গাছের তলে’ পড়ে নম্বর পাওয়া ব্যক্তির যদি ‘দাদি’ শব্দটিকে হঠাৎ করেই অচেনা এবং ক্ষতিকর মনে হয়, তবে নিশ্চিতভাবে তার নেপথ্যে রয়েছে অন্য সমীকরণ।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু নির্দিষ্ট শব্দ রয়েছে৷ যেমন ‘আজাইরা’ শব্দটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। এটিও ফার্সি থেকে আগত শব্দ, ঠিক যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ব্যবহৃত ‘সবুজ’ শব্দটিও ফার্সি থেকে এসেছে৷ মুসলমানের ‘পানি’ এসেছে সংস্কৃত থেকে, সে জন্যই হিন্দিভাষীরাও পানি বলেন।
‘ওই খানে তোর দাদির কবর, ডালিম গাছের তলে’ পড়ে নম্বর পাওয়া ব্যক্তির যদি ‘দাদি’ শব্দটিকে হঠাৎ করেই অচেনা এবং ক্ষতিকর মনে হয়, তবে নিশ্চিতভাবে তার নেপথ্যে রয়েছে অন্য সমীকরণ।
তাহলে দেখা যাচ্ছে মুসলমানের ধর্মপালন এবং ঘরোয়া সম্বোধনের কয়েকটি শব্দ বাদ দিলে ভাষার হিন্দু-মুসলমান বলে কিছু হয় না৷ কোনও ভাষা ধর্মের উপর নির্ভরশীল নয়৷ এই প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল কাফি লিখেছেন, “আব্বা আর বাবা আসলে একই লোক এবং বাবা একটি ফার্সি-তুর্কি শব্দ, বাংলাও৷ …প্রকাশ ছাড়া শব্দের আর অন্য ধর্ম নেই৷”
লালন ফকিরের গানে উঠে এসেছে একই সমন্বয়ের সুর, “জলের উপর পানি না পানির উপর জল?/ বল খোদা বল খোদা বল?/ আলীর উপর কালী,/ না কালীর উপর আলী?” এখানে একটা জিনিস বুঝতে হবে, কালী এবং আলি যেভাবে বাঙালি সমাজে নিজ নিজ বিশ্বাসে স্বমহিমায় রয়েছেন৷ তেমনি জল আর পানিও পাশাপাশি থেকেছে যুগ যুগ ধরে৷ ঈশ্বর-আল্লাহ যেমন একই জিনিসের ভিন্ন নাম, তেমনটা জল বা পানির ক্ষেত্রেও৷
সুস্থ আলোচনার মধ্যে এক অদৃশ্য কোলাহল। সেখানে কেউ যেন নির্দেশ দিচ্ছে, একটা ছাঁচ গড়ে দিয়ে বলা হচ্ছে, ‘বৈচিত্র্যের ধারণা ভুলে তোমাকে আমাদের মতো করে চলতে হবে। নইলে…।’ অথচ এই অংশের কাছে গ্রাম্য মুসলমানের রোজকার ভাষা তো দূর, বাংলার বিভিন্ন জেলার মানুষের আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। এই প্রসঙ্গে কবি পিনাকী ঠাকুর লিখেছিলেন, “এলুম গেলুম বাংলা যদি, আমার ভাষাও বাংলা ভাষা।”
বাংলার ধূ-ধূ প্রান্তর পেরিয়ে কোনও শস্যশ্যামল গ্রাম৷ খুব সাধারণ ছাপা শাড়িতে আবৃত মা, হাতে কাচের চুড়ি। গ্রাম্য টানে যে সন্তানকে ডেকেছে এতকাল, যে দাদি নাতিকে ঘুম পাড়িয়েছে গীত গেয়ে, কিংবা যে সন্তান প্রথমবার ‘আব্বা’ বলে ডেকেছে৷ এসব বাংলারই চেনা রূপ৷ কেউ তা ধরতে পেরেছেন, কেউ পারেননি৷ কেউ সেই সরল জীবনযাপনকে বুঝতে চাননি। আমরা-ওরার গেরোয় অবহেলা করেছেন, কেউ ‘ওসব আবার বাংলা হল নাকি’ বলে ‘এলিটসুলভ’ তাচ্ছিল্য নিয়ে নাক সিঁটিয়েছেন৷ বাঙালি মুসলিম সমাজ থেকে যারা সাহিত্যে, স্মৃতিচারণায় নিজের সমাজের কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন, হয় তাঁদের লেখা মূলস্রোতে আসেনি, কিংবা বাজারের নির্দেশমতো প্রমিত বাংলায় লিখতে বাধ্য হয়েছেন। সবকিছুর পরেও এত যুগের বেঁচে থাকা, শব্দের অভ্যাস, আন্তরিক সম্বোধন তা তো মিথ্যে নয়৷ সহস্র মিথ্যের জাল বুনলেও সত্যি অবিচল থাকে সময়ের স্রোতে।
কবি লিখেছিলেন, “মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি, এক সুরে গাই গান/ চিনতে নেরে আঁধার রাতে করি মোরা হানাহানি,/ সকাল হলে হবে রে ভাই ভায়ে ভায়ে জানাজানি।” সেই কবিতা যেন আজও প্রাসঙ্গিক। বাঙালি জাতির একটি ধর্মের মানুষের বুলি চিনতে না পেরে অপর পক্ষের কিছুজন অস্বীকার করছে, হানাহানি চাইছে। হয়তো এই আঁধার কেটে যাবে, আবার ভাইয়ে ভাইয়ে জানাজানি করে হাতে হাতে ধরে হয়ে উঠবে এক জাতি, এক প্রাণ।
________________
মতামত লেখকের নিজস্ব
