রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত শতাব্দীপ্রাচীন ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’ বন্ধ করে দিচ্ছে কেন্দ্র!

কত ইতিহাস এই ‘হেরিটেজ প্রেস’-কে ঘিরে

৮ জানুয়ারি, ১৯১৭। আমেরিকার লিঙ্কন শহরে অলিভার থিয়েটারে ছিল রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা। বিষয়- ‘ন্যাশনালিজ়ম’। ওই দিনই লিঙ্কনের বাসিন্দারা রবীন্দ্রনাথকে উপহার দিলেন একটি মুদ্রণযন্ত্র। না, রবীন্দ্রনাথের জন্য নয়, উপহারটি আদতে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের জন্য। যান্ত্রটির গায়ে খোদাই করা ছিল–প্রেজ়েন্টেড টু দ্য বয়েজ় অব শান্তিনিকেতন। যন্ত্রটির নাম- লিঙ্কন প্রেস।

শান্তিনিকেতনের পড়ুয়াদের স্বার্থে টাকা জোগাড়ের জন্যই রবীন্দ্রনাথ তখন বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেক টাকার ঋণ মাথার ওপরে। বক্তৃতামালার বিষয় ‘জাতীয়তাবাদ’। সেই সময়েই বক্তৃতা দিয়ে পাওয়া ডলারের পাশাপাশি প্রাপ্তি এই মুদ্রণযন্ত্র। রবীন্দ্রনাথ যন্ত্রটিকে নিয়ে এলেন শান্তিনিকেতনে। স্থাপিত হল ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হল শান্তিনিকেতন প্রেসে মুদ্রিত প্রথম বই– রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি-সহ সঙ্কলন গীত-পঞ্চাশিকা। স্বরলিপি সংকলন ও প্রকাশনার দায়িত্বে ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

‘শান্তিনিকেতন প্রেস’ পথচলা শুরুর আগে বারবার হানা দিয়েছে ব্রিটিশদের সেন্সরের বাধা। তারপরেও প্রেস চালু হয়েছে। এবং শুরু থেকেই বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসগুলির তুলনায় একদম ভিন্ন পথে হাঁটা শুরু করেছে সে। বিশ্বে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনাই হয়তো নেই, যার প্রথম মুদ্রিত বই একটি নাটক। বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়ের (পরে বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ) প্রথম বই রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’। এই বইও ছাপা হয়েছিল শান্তিনিকেতন প্রেস থেকেই। 

কত স্মৃতি এই প্রেসের সঙ্গে জড়িয়ে। বই তৈরির ক্ষেত্রে একটা নিজস্ব চরিত্র বুনতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই কারণেই বইয়ের মলাট আড়ম্বরহীন, অতখানি ফাঁকা স্পেস ছড়ানো। দুটি লাইনের মাঝেও স্পেস পর্যাপ্ত। এই স্পেসের ব্যবহার যেন রবীন্দ্রভাবনাকেই প্রকাশ করেছে। 

গত বছর শতবর্ষ পেরিয়ে গেল এই বুড়ো প্রেসের। একগুচ্ছ ইতিহাস আর গল্পকে জড়িয়েই। আর, এই বছরই নাকি মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা হয়ে গেছে তার। খাতায়-কলমে সে চালু। যদিও, বেশ কয়েক মাস কোনো ছাপা বই বেরোয়নি এই প্রেস থেকে। আর, এবারে রীতিমতো নোটিস দিয়ে নাকি ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’ বন্ধ করতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। 

কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক চিঠি মারফত প্রেস বন্ধের কথা জানিয়েছে বিশ্বভারতীকে। শুধু বিশ্বভারতী নয় অবশ্য, আরো ৬টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসকেও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইতিমধ্যেই ছাপাখানার কাজ বন্ধ করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রেসের কর্মচারীদের। শোনা যাচ্ছে, শান্তিনিকেতন প্রেসের যন্ত্রগুলিও হয়তো নিলাম করে দেওয়া হবে। ছাপাখানার বাড়িটির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলছে। 

‘শান্তিনিকেতন প্রেস’-এর জন্ম স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের হাতে। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রেস নিজেই একটি আস্ত ইতিহাস। কত ঐতিহাসিক বই বেরিয়েছে এই প্রেসের গর্ভ থেকে। একটা হেরিটেজ প্রেসকে কি এইভাবে বন্ধ করে দেওয়া যায়? যার ঐতিহাসিক মূল্য এতখানি, তাকে তো সংরক্ষণ করা উচিত। সামান্য লাভ-ক্ষতির অঙ্কে কি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও মাপা যায়? প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। উত্তর যদিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এখনো।

Developed by DXDasia