
লেখা থেকে ছবি, ছবি থেকে লেখা। দুর্লভ সব গপ্পের মোহর এতে জড়ানো…
রবীন্দ্রনাথের একই কবিতায় ছবি আঁকলেন দুজন—প্রথমে অবনীন্দ্রনাথ, পরে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। রীতিমতো অর্ডার দিয়ে আঁকানোর পরেও নন্দলালের অনেক ছবি দেখে মন ভরল না কবির। আবার, কখনো নন্দলালের আঁকা দেখে মুগ্ধ হয়েই লিখে ফেললেন একের পর এক ছড়া। লেখার সঙ্গে ছবি। আবার কখনো ছবির সঙ্গেই লেখা। ছবি কখনো রেখায়, কখনো তুলিতে। নিজের লেখার সচিত্রকরণ, বলা ভালো অলংকরণ নিয়ে বড়ো সচেতন ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের লেখার সঙ্গে জড়িয়েও আছে বিখ্যাত শিল্পীদের অনবদ্য সব কাজ। তার অনেকগুলিই আজ লোকচক্ষুর আড়ালে। তারই সঙ্গে হারাতে বসেছে ছবিগুলিতে লেপ্টে থাকা গল্পরাও।
'রাজর্ষি'-র অলংকরণ– হরিশচন্দ্র হালদার
জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত ‘বালক’-এর প্রথম সংখ্যার প্রথম পাতাতেই ছিল রবীন্দ্রনাথে ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’। এই কবিতার সঙ্গেই ছবি এঁকেছিলেন হ-চ-হ ওরফে হরিশচন্দ্র হালদার। পরে, ‘রাজর্ষি’-র ছবিও এঁকেছেন তিনি। রবীন্দ্র-রচনার প্রথম শিল্পী হরিশচন্দ্রই। তবে, রবীন্দ্রনাথের গোটা বইয়ের জন্য ছবি আঁকার ভার প্রথম বর্তেছিল ভাইপো অবনীন্দ্রনাথের কাঁধে। অবনীন্দ্রনাথ তখন একুশ বছরের যুবক। মিঃ গিলার্ডির কাছে আঁকা শেখার পাঠ তখনো শেষ হয়নি। রবীন্দ্রনাথ হুকুম করলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’ নাট্যকাব্যের জন্য ছবি এঁকে দিতে হবে। ১৮৯০তে এই বইয়ের জন্য বত্রিশটি স্কেচ করে দিলেন অবনীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের বইয়ের প্রথম ইলাস্ট্রেটর। অবনীন্দ্রনাথ নিজে এই অলংকরণের গপ্প বলতে গিয়ে লিখছেন: ‘চিত্রাঙ্গদা তখন সবে লেখা হয়েছে। রবি’কা বললেন ছবি দিতে হবে। আমার তখন একটু সাহসও হয়েছে, বললুম রাজী আছি। সেই সময় চিত্রাঙ্গদার সমস্ত ছবি নিজের হাতে এঁকেছি, ট্রেস করেছি। চিত্রাঙ্গদা প্রকাশিত হলো। এখন অবশ্য সেসব ছবি দেখলে হাসি পায়।’
'চিত্রাঙ্গদা'-র অলংকরণ– অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এরই ছ’বছর পরে একটি আশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন অবনীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের ‘নদী’ কবিতাটি তখন বই হিসেবে বেরিয়েছে। এই কবিতার জন্য আলাদা করে ছবি আঁকেননি অবনীন্দ্রনাথ। কিন্তু, বই ছেপে বেরনোর পর ছাপানো হরফের, লাইনের ফাঁকে ফাঁকেই সরু রেখার আঁচড়ে ফুটিয়ে তুললেন প্রত্যেকটি স্তবকের আলাদা আলাদা দৃশ্যরূপ। বাংলা গ্রন্থচিত্রনের ইতিহাসে এমন অভাবনীয় আর দুঃসাহসী কাজ অবনীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেই বা করতে পারতেন? যদিও, এই কাজ রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়েনি হয়তো। কারণ, এই কপিটার অস্তিত্বই লোকে ভুলতে বসেছিল। বহু বছর পরে অবনীন্দ্রনাথ অলংকৃত ‘নদী’-র কপিটি খুঁজে পান মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। ইতিমধ্যে ১৯০৮ সালে একই কবিতার জন্য ছবি এঁকেছেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীও। জলরঙের ব্যবহার সেইসব ছবিতে মুগ্ধ করে দেওয়ার মতো। কিছু আঁকায় আবার চমৎকার ডিটেলিং। কিন্তু, অবনীন্দ্রনাথের মতো ছক-ভাঙা নয় সে কাজ। একই কবিতায় দুই শিল্পীর কাজ এক তুলনামূলক পাঠের জানলা খুলে দেয় আমাদের সামনে।
'নদী'-র অলংকরণ– অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
'নদী'র অলংকরণ– উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
এরপর, রবীন্দ্ররচনার সঙ্গে একাধিক ছবি এঁকেছেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা। এঁদের মধ্যে নন্দলাল বসুকে নিয়ে অনেক গল্প। ‘সহজপাঠ’-এর অলংকরণকে তো অমরত্ব দিয়েছে নন্দলালের কাজ। রানী চন্দ লিখছেন, ‘কলাভবনে তখন আমরা উডকাট লিনোকাট করি। নন্দদা সেই টেকনিকেই আঁকলেন সহজপাঠের ছবিগুলি। এক-একখানা আঁকেন আর আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি।’ ‘সহজপাঠ’ আঁকার অনেক আগে থেকেই অবশ্য রবীন্দ্রসাহিত্যে ছবি আঁকছেন নন্দলাল। অনেকেই জানেন না হয়তো, ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন সিস্টার নিবেদিতা। ১৯১২ সালে ‘দ্য মডার্ন রিভিয়ু’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই অনুবাদের সঙ্গে আঁকা ছবিটি ছিল নন্দলালেরই। ফ্রেমে স্পেসের ব্যবহারকে যে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তার অন্যতম দৃষ্টান্ত এই ছবি।
কাবুলিওয়ালা আর সহজপাঠ– নন্দলাল বসু
এহেন নন্দলালের আঁকা ছবিও কিন্তু একসময় এক্কেবারে পছন্দ হয়নি রবীন্দ্রনাথের। ১৯০৯ সালে ‘চয়নিকা’ কবিতার সংকলনটি বেরল এলাহাবাদ থেকে মুদ্রিত হয়ে। এই বইয়ের জন্য ছবি এঁকে দিতে নন্দলালকে অনুরোধ করলেন রবীন্দ্রনাথ। নন্দলাল লিখছেন- ‘কবিকে আমি বললুম, আমি আপনার বই পড়িনি বললেই হয়। পড়লেও মানে বুঝিনি। কবি বললেন, তাতে কি, তুমি পারবে ঠিক, এই আমি পড়ছি শোনো—বলে তিনি তাঁর চয়নিকার কবিতা পড়তে আরম্ভ করলেন—পরশপাথর, ঝুলন, মরণ মিলন—এই সব কবিতা। আর দেখ, তাঁর পড়বার ভঙ্গিতেই আমার মনে যেন নানা ছবি বসতে লাগল।’ রবীন্দ্রনাথকে মুখের ওপর একজন শিল্পী বলছেন—আপনার কবিতা পড়িনি, বুঝি না। তা শুনে রবীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ, বিমর্ষ বা অভিমানী হওয়ার বদলে নিজের মুখে তাঁকে পাঠ করে শোনাচ্ছেন কবিতা। অভাবনীয় সব দৃশ্যেরা হয়তো এভাবেই জন্ম নেয়। যাহোক, সাতটি ছবি আঁকলেন নন্দলাল। কিন্তু দেখে মন ভরল না রবীন্দ্রনাথের। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখলেন—‘ ছবি ভালো হয়নি সে কথা স্বীকার করতেই হবে।… নন্দলালের পটে যে রকম দেখেছিলুম বইয়ে তার অনুরূপ রস পেলুম না। বরঞ্চ একটু খারাপই লাগল।’
চয়নিকা– নন্দলাল বসু
তবে, এই খারাপ লাগাকেই ফের মুগ্ধতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নন্দলাল। রবীন্দ্রনাথ আলমোড়া গেলেন। সঙ্গে নন্দলালের আঁকা কতগুলো স্কেচ। সেই স্কেচগুলিকে ঘিরেই জন্ম নিল ‘ছড়ার ছবি’র ৩২টি ছড়া। আলমোড়া থেকেই চিঠিতে নন্দলালকে লিখলেন রবীন্দ্রনাথ—“… এর থেকে প্রমাণ হয় আর্টে সুন্দর হবার জন্য সুন্দর হবার কোনো দরকারই হয় না।’
ছবি দেখে কবিতার জন্ম অবশ্য আরো বেশ কয়েকবার দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সুনয়নী দেবীর আঁকা একটি ছবি দেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘দান’ কবিতা। আবার, প্রতিমা দেবীর আঁকা ছবি রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল ‘নীহারিকা’ কবিতাটি। ‘বিচিত্রিতা’য় এমন অনেক ছবি আর কবিতাই ধরা আছে।
'শেষের কবিতা'র অলংকরণ– দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী
প্রবাসীতে ‘শেষের কবিতা’ যখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পাওয়ার সময় দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী এঁকেছিলেন সাতটি ছবি। ছবিগুলি রবীন্দ্রনাথের অপছন্দ হয়নি বলেই মনে হয়। নাহলে প্রতি সংখ্যায় জলরঙের একই টেকনিকে অলংকরণ চালিয়ে যেতে পারতেন না দেবীপ্রসাদ। অসামান্য স্কেচে ‘মালঞ্চ’ উপন্যাসের নাট্যরূপের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করে দিয়েছিলেন বিনোদবিহারী। আর, ‘রক্তকরবী’র প্রচ্ছদ আর অলংকরণ তো ইতিহাস।
'বুড়ি' কবিতার অলংকরণ– সুকুমার রায়
তবে, রবীন্দ্রনাথের কবিতার অলংকরণকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন আরেক কবি। সুকুমার রায়। ‘সন্দেশ’ পত্রিকার ১৩২৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় ছাপা হল রবীন্দ্রনাথের ‘বুড়ি’ কবিতা। গোটা কবিতাটাকেই রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখায় ছাপলেন সুকুমার। আর, সঙ্গে জুড়ে দিলেন অসামান্য অলংকরণ। এক কবির কবিতাকে ঘিরে ছবিতে কবিতার ফ্রেম জুড়লেন আরেক কবি। অনেক পরে ‘সন্দেশ’ পত্রিকাতেই সত্যজিৎ রায় অলংকরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথের কৌতুকনাট্য ‘রাজা ও রাজদ্রোহী’র অনুবাদের। তখন রবীন্দ্রনাথ জীবিত নেই আর। কিন্তু, তাতে কী? রবীন্দ্রনাথের লেখার অলংকরণের সঙ্গে এভাবেই জুড়ে গেছেন বিখ্যাত তিন প্রজন্ম– উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার এবং সত্যজিৎ।
রবীন্দ্রসাহিত্যের অলংকরণের ইতিহাসে এমনই অসামান্য সব গল্পের জন্ম হয়েছে। প্রকাশনা-পদ্ধতি এত সহজ ছিল না তখন। রং হুবহু আনতে কালঘাম ছুটে যেত মুদ্রকদের। তবু, অলীক সব ছবি জন্ম নিয়েছে রবীন্দ্রসাহিত্যের গর্ভে। বহু ছবি, অলংকরণই পত্রিকায় মুদ্রিত। তাই, রবীন্দ্র রচনাবলীতে বা সংকলনে সেগুলিকে পরে দেখতে পাননি পাঠকরা। আর, এভাবেই কখন যেন অনেক দুর্লভ অলংকরণ হারিয়েও গেছে আমাদের স্মৃতির ইতিহাস থেকে। একে কী বলব বলুন তো? হতভাগ্য এক জাতির ট্রাজেডি?
প্রচ্ছদের ছবি: সত্যজিৎ রায়
তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথের লেখার ছবি, প্রতিক্ষণ, রবিজীবনী (১,২,৩), প্রশান্তকুমার পাল।
