উত্তরবঙ্গে শীত-পোশাকের চাহিদা তুঙ্গে

মেশিনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়াইয়ে নেমেছে হাতে-বোনা সোয়েটারও

জাঁকিয়ে শীত পড়েছে উত্তরবঙ্গে। আর এই সময় উত্তরবঙ্গের প্রধান শহর শিলিগুড়িতে শীতবস্ত্রের জন্য চলছে ভুটিয়া মার্কেট। দার্জিলিং পাহাড় ছাড়া পাহাড়ের বিভিন্ন স্থান এমনকি ভুটান থেকেও শীতবস্ত্র নিয়ে সোয়েটার শিল্পীরা শিলিগুড়ি এসেছেন। শিলিগুড়ি হাকিমপাড়ায় তাঁদের আলাদা মার্কেট বসেছে। এবারে তাঁরা ডিসেম্বরে বসেছেন। মার্চে চলে যাবেন। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে সেভাবে শীত না থাকায় তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার ৩ জানুয়ারি থেকে শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গে শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ভুটিয়া মার্কেটে ভিড় বাড়ছে।

শিলিগুড়িতে প্রতি বছর নভেম্বর মাস থেকে পাহাড়ের এই অতিথিরা চলে আসেন। তাঁরা শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘর ভাড়া নেন। তিন চার মাস শহরে ঐ ভুটিয়া মার্কেটের জন্য সময় কাটিয়ে আবার পাহাড় চলে যান। কিন্তু শিলিগুড়িতে গরম পোশাকের মেলা ভেঙে পাহাড়ে গিয়েও তাঁদের কাজ থামে না। সারা বছর ধরেই তাঁদের কাজ চলতে থাকে শিলিগুড়ি ভুটিয়া মার্কেটের জন্য।

কবে থেকে শিলিগুড়িতে এই মার্কেট শুরু হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস কেউ বলতে পারেন না। তবে এখনকার শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ লাগোয়া এলাকায় তাঁরা বসছেন ত্রিশ বছর ধরে। তার আগে তাঁরা বসতেন শিলিগুড়ি হাসপাতালের পাশে। তার আগে এই বাজার বসত শিলিগুড়ি বিধান মার্কেটে। যেহেতু পাহাড়ের মধ্যে থেকে শীতের দেশের অধিবাসীরা এই গরম সোয়েটার নিয়ে আসেন তাই সমতলে পর্যটক সহ অন্যদের কাছে এর বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। তবে আগে এই মার্কেটে উল দিয়ে হাতে তৈরি সোয়েটারই বেশি পাওয়া যেত। কালের নিয়মে অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের সোয়েটার চলে আসে। আর সেই আধুনিক মেশিনে তৈরি সোয়েটারের সঙ্গে হাতে তৈরি সোয়েটার নিয়ে লড়তে হচ্ছে পাহাড়ের এই শীত শিল্পীদের। দার্জিলিং-এর ম্যালের নিচে রয়েছে তুংসুং নামে এক গ্রাম। সেই গ্রামে ত্রিশটিরও বেশি পরিবার বহু বছর ধরে সারা বছর শীত পোশাক তৈরি করে। দুই বোন, সরিতা থামি ও রেবিকা থামি জানালেন, হাতে উলকাঁটার সাহায্যে তাঁরা তৈরি করেন উলের ফ্রক, জেন্টস ও লেডিস সোয়েটার, বেবি সেট, স্টুল, পঞ্চু, হাফ সোয়েটার, সকস্‌। ছোটবেলায় মা শোভা থামি-র কাছ থেকে হাতে কীভাবে উলের সোয়েটার বানাতে হয় তা শেখেন সরিতা। এখন মা ও অন্য বোনদের সঙ্গে তিনিও তা তৈরি করেন। দাম শুরু ২০০ টাকা থেকে। তারপর সাইজ অনুযায়ী বিভিন্ন রকমের দাম।

দার্জিলিং-এর তুংসুং থেকে আসা ছিরিং শেরপা জানালেন, তাঁর স্ত্রী, মা, বোন সকলে সারা বছর ধরে হাতে সোয়েটার তৈরি করেন। তারপর শিলিগুড়ির ভুটিয়া মার্কেটে চলে আসেন বিক্রির জন্য। তবে দার্জিলিং ম্যালের ধারেও কিছু সোয়েটার বিক্রি করেন তাঁরা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকরা দার্জিলিং এলে অনেকেই স্থানীয় শীতশিল্পীদের হাতে তৈরি উলের গরম পোশাক কিনে নিয়ে যান। এখন এই শীতশিল্পীরা মেশিনের তৈরি আধুনিক ডিজাইনের সোয়েটারের সঙ্গে লড়াই করছেন। তাঁরা মেশিনে তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের সোয়েটার খুলে লক্ষ্য করেন, কোনটায় কত ঘর। সেই অনুযায়ী উলকাঁটায় তা বুনতে শুরু করেন। কোনওটা হাতে বুনতে পারেন, কোনওটা পারেন না। বলা যেতে পারে, মেশিনের তৈরি গরম পোশাকের সঙ্গে তাঁদের হাত আর উলকাঁটার লড়াই চলতে থাকে সবসময়। এভাবে তাঁরা হাতেই উলের সাহায্যে অনেক ডিজাইনের সোয়েটার তৈরি করছেন। শিলিগুড়ি ভুটিয়া মার্কেটে তাঁদের ব্যবসা শেষ হলে আবার নতুন করে উল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। শীত থাকুক আর না থাকুক, কখনও শীতের সঙ্গে, কখনও মেশিনের সঙ্গে তাঁদের লড়াই চলতে থাকে সারা বছর ধরে।

এক সময় সমতলেও বহু মহিলা শীতের রোদ পোহাতে পোহাতে উলকাঁটা আর উল নিয়ে বসে পড়তেন সোয়েটার বুনতে। এখন সমতলে সেই দৃশ্য প্রায় বিরল। কিন্তু পাহাড়ে ঐতিহ্যের কারণে বংশপরম্পরার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার কারণেই হোক বা রুটিরুজি বজায় রাখার কারণেই হোক, উলকাঁটা আর হাতের আঙুলের কারসাজির মাধ্যমে অনেক শিল্পীর সময় পার হয় সারা বছর ধরেই। আর তাঁদের হাত ধরেই দার্জিলিং পাহাড়ের গরম সোয়েটার ছড়িয়ে পড়ে দেশবিদেশে।

Developed by DXDasia