#গোভাইরালটুস্টপদ্যভাইরাস নামের একটি উদ্যোগ শুরু হয়েছে ফেসবুকে
করোনার থাবা হঠাৎ করেই প্রত্যেকের স্বাভাবিক জীবন পাল্টে দিয়েছে। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে থাকতে মানুষের সচেতনতা বেড়ে গেছে অনেকখানি। খুব ছোটখাটো কিছু জিনিস, যেগুলো নিয়ে কেউ ভাবিতই ছিলাম না, তা ভীষণভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত চাকরি যাবার ভয়, খাবার কীভাবে আসবে তার জন্য চিন্তা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে চাপা আতঙ্ক – সবকিছু যখন নেতিবাচক চিন্তার উদ্রেক করছে, ঠিক সেই সময় নানান আর্ট কলেজের শত শত তরুণ শিল্পী উঠে দাঁড়ালেন #গোভাইরালটুস্টপদ্যভাইরাস নামের একটি উদ্যোগ নিয়ে। সাময়িকভাবে এটি একটি লড়াই, যে লড়াইয়ে শিল্পীদের অস্ত্র আশ্চর্যভাবে এই জীবাণুরই একটি বিশেষ অংশ।
এই উদ্যোগের প্রধান কারিগর বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্মী উত্তরণ চৌধুরী। শুরুতে তাঁর কয়েকজন আর্ট ডিরেকটর সহকর্মী বন্ধুদের এই আকৃতি দিয়ে আশাব্যাঞ্জক কিছু শিল্প তৈরি করতে অনুরোধে করেন। #গোভাইরালটুস্টপদ্যভাইরাস – এই নামের একটি ফেসবুক পেজ তৈরি করা হয় এপ্রিলের ৮ তারিখ। একটি প্রেস বিবৃতিতে উত্তরণ জানিয়েছেন, “করোনা ছড়িয়ে পড়ার কিছুদিন পর থেকেই আমরা বাড়ি থেকে কাজ করা শুরু করি। কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই অফিস থেকে আমাকে জানানো হয়, যে সামনের মাসে মাইনে পাব কী পাব না, ঠিক নেই। চারিদিকে অসুস্থতা আর দুশ্চিন্তার মধ্যে এ খবর পেয়ে আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। তখনই একদিন এই উদ্যোগের কথা মাথায় আসে। মনে হয় কিছু একটা করা প্রয়োজন।”
শুরুতেই বলা হয়েছে, এই লড়াইয়ে শিল্পীদের অস্ত্র জীবাণুরই একটি অংশ। এই জীবাণুর আকৃতি একটি বৃত্তের মতো। চারপাশে নানান মাপের ছোটো বলয়। এই ক্ষুদ্র আকৃতির জীবাণু কীভাবে যেন ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। যার ফল মৃত্যু। সারাক্ষণ ভয়, আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটানো। এই আকৃতিকেই এবার ইতিবাচক রূপ দিয়ে দেখা হচ্ছে। এটিই এখনও অবধি একমাত্র উদ্যোগ, যার মধ্যে দিয়ে সেই আকৃতিকে ব্যবহার করেই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সমস্ত আশা, সৌন্দর্য, ভালোবাসা এবং মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ।
ভাইরাসের এহেন আকৃতি মানুষ ঘৃণার চোখেই দেখবে, স্বাভাবিক। এমন একটা আকৃতির ছবি আমাদের দেখানো হয়েছে, যা দেখে মানুষ ভয় পাবে। এখানেই #গোভাইরালটুস্টপদ্যভাইরাস-এর মজা। কারণ প্রত্যেক শিল্পীকেই এই আকৃতি দেখাতে হবে আশা বা আনন্দের চিহ্ন হিসাবে। উত্তরণ চৌধুরী প্রথমে নিজেই একটা কমিউনিকেশন তৈরি করেন। প্রথমে একটা বৃত্তের চারপাশে কাঁটা এবং চামচ লাগিয়ে দেখলেন কোভিড ১৯-এর আকৃতি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আর ঝলমলে লাল রঙের জন্য সেটাকে যে তেমন ভয়ংকর দেখাচ্ছে, তাও নয়। দেখে মনে হচ্ছে শিশুদের কোনও খেলনা। ছবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে উত্তরণ একটি বার্তা লেখেন। খাবার ভাগ করে নেওয়া এবার ভাইরাল হোক। চারজন করে নমিনেট করলেন। প্রথম প্রথম অনেকের কাছেই তা একঘেয়ে লাগল। অথচ একটু ভাবলেই দেখা যাবে এই আকৃতি দিয়ে তৈরি করা যাচ্ছে জ্যামিতি, পাখির বাসা, ফুলের পাপড়ি আরও কত কি। উত্তরণের বিজ্ঞাপনের শিল্পীবন্ধুদের মধ্যে বিশ্বরূপ নাথ, সিদ্ধার্থশংকর রায়, প্রসেনজিত বেরা, রঞ্জন সাউ এবং শুভ্রকান্তি মণ্ডল মিলে প্রথম এগিয়ে এসে এই আর্ট তৈরি শুরু করেন।
এরপর এই কাজ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শিল্পীমহলে। ললিত মাইতির মতো অভিজ্ঞ শিল্পী থেকে গৌরব জানার মতো তরুণ শিল্পীরা যুক্ত হয়েছেন এই উদ্যোগে। আকৃতিকে বিভিন্নরকমভাবে শিল্পের চেহারায় নিয়ে গেছেন হিরণ মিত্র, হর্ষমোহন চট্টরাজ, সৌরিশ মিত্র, পার্থ দাশগুপ্ত, উদয় দেব, উপল সেনগুপ্ত, চিরঞ্জিত সামন্ত, অনিকেত মিত্র প্রমুখ। এছাড়াও আছেন অগুনতি আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রী, বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্মী, আইটির উচ্চপদস্থ কর্মচারী, গ্রাফিক ডিজাইনার, লেখক, সাংবাদিক থেকে গৃহবধূ। শুধু ডিজিটাল আর্ট নয়, এই পোস্টারে কোভিডের প্রজিটিভ আকৃতি তৈরি হচ্ছে আঙুলের ছাপ দিয়ে, জল রঙে এমনকি এমব্রয়ডরি করেও। এই পোস্টার দিয়ে শিল্পীরা সাধারণ মানুষদের বলছেন এই লকডাউনের সময় অন্যকে সাহায্য করতে, গীটার বাজাতে, ছবি আঁকতে, এমনকি বাগানে পাখির গান উপভোগ করতেও।

গত পাঁচদিনেই প্রায় ২৫০-র উপর পোস্টার তৈরি হয়েছে। এর পরেও রোজ দিনে ২০ থেকে ৪০টি শৈল্পিক পোস্টার আপলোড হচ্ছে বন্যার মতন। উত্তরণ বলেন, প্রতিদিন তিনি ৩০ থেকে ৪০ জন শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের উৎসাহ অদম্য। এবার তাঁরা হাঙ্গেরি এবং নিউ ইউর্কের আর্ট স্কুলে উদ্যোগটা ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছেন। তার জন্য অনেক পোস্টার অনূদিত হচ্ছে নানান ভাষায়।

যা একদিন মৃত্যুর প্রতীকী চিহ্ন ছিল, তাই-ই শিল্পীদের কাছে বাঁচার রসদ হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে লকডাউনের একমাত্র সঙ্গী।
শৌভিক বসাকের কাজ