মেয়েরা ভাল করছে, খুব ভাল কথা, কিন্তু ছেলেগুলো সব যাচ্ছে কোথায়?

বাড়াবাড়ি না হলে আমাদের চোখ পড়ে না যে রোগের দিকে

পশ্চিমবঙ্গে এই বছর ক্লাস টেন এবং টুয়েলভ দুটোতেই রাজ্য সরকার পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেলেদের তুলনায় বেশি সংখ্যক মেয়ে পাশ করেছে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যায়ও ছেলেদের থেকে বেশি মেয়েরা ছিল আরও বেশি। শুধু এই বছর নয়, গত বছরও চিত্রটা ছিল মোটের উপর একই, শতাংশের হারে সামান্য উনিশ বিশ। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের মাধ্যমিক পরীক্ষায় এবার নথিভুক্ত পরীক্ষার্থী ছিল ১০ লক্ষ ৭২ হাজার মতো, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পরীক্ষার্থী প্রায় সাত লক্ষ ৭৪ হাজার। রাজ্যে অন্য দুটি সর্বভারতীয় সংস্থা সিবিএসই এবং সিআইএসসিই–র অধীনে বেশ কিছু নামজাদা ওজনদার স্কুল থাকলেও সংখ্যার বিচারে তারা অনেক পিছনে। মধ্যশিক্ষা পর্ষদ আর উচ্চ মাধ্মিক শিক্ষা সংসদের পরিসংখ্যানকে তাই রাজ্যের শিক্ষার প্রকৃত ছবি বলে ধরে নিলে ভুল হবে না। সেই ছবিরই একটা আলোকোজ্জ্বল দিক হল মেয়েদের বেশি সংখ্যায় পরীক্ষায় বসা এবং পাস করা। ২০১৩ সালে রাজ্যে কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু হওয়ার পর মেয়েদের শিক্ষায় যে বাড়তি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে তাকে এর অনুঘটক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। আশা করা যায় এ নিয়ে কোনও প্রামাণ্য গবেষণায় কোনও যোগ্য সংস্থা শিগগিরই হাত দেবে।

মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষায় মেয়েদের সাফল্যের ওই আলোকোজ্জ্বল দিকটা নিয়ে সমবেত আনন্দে অসঙ্গত কিছু নেই, শিক্ষায় এবং সাধারণভাবে সমাজের কল্যাণে আগ্রহী যে কোনও মানুষই এতে সামিল হবেন। তবে আমাদের আনন্দ প্রায়শই উল্লাসে পরিণত হয় এবং তখন একটা বড় ছবির আলোকোজ্জ্বল অংশটার বাইরে আমাদের আর চোখ পড়ে না। সেই আশঙ্কা থেকেই এই লেখায় শিক্ষার বড় ছবিটার একটা অন্ধকার অংশের দিকে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি। যে অন্ধকার থেকে উৎসারিত বার্তাটা এই লেখার শিরোনামেই দেওয়া আছে:‌ ছেলেগুলো সব যাচ্ছে কোথায়?

কোন ছেলেদের কথা বলা হচ্ছে? 
যে ছেলেগুলোর মাধ্যমিক এবং তার পরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দিচ্ছে না। মানে, নথিভুক্ত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের নাম থাকার কথা ছিল, কিন্তু পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে যারা ওই তালিকায় অনুপস্থিত। ১৬ থেকে ১৮/‌১৯ বছর বয়সী এই ছেলেরা বাস্তবে আমাদের সমাজে আছে, খাচ্ছে দাচ্ছে, ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে, আরও অনেক কিছু নিশ্চয় করছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে এই বয়সে যেটা করার কথা, সেই পড়াশোনাটা করছে না। যদি করত, তবে পরীক্ষার্থীর তালিকায় অন্তত তার নাম উঠত— পাস করুক বা না করুক।

এমন ছেলে তো নাও থাকতে পারে, কীভাবে নিশ্চিত হব যে এমন ছেলে সত্যিই আছে? 
আমাদের জনসংখ্যায় রাতারাতি মেয়েদের সংখ্যা বেড়ে যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যায় মেয়েদের অনুপাত দেশের অধিকাংশ বড় রাজ্যের চেয়ে ভাল। ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনা অনুসারে এরাজ্যে ১০০০ পুরুষ প্রতি নারীর সংখ্যা ৯৫০। এটা হল সব বয়সের সমস্ত নারী পুরুষ মিলিয়ে হিসেব। মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বয়স মোটামুটি ১৬ থেকে ২০ ধরা যায়। জনসমষ্টির শুধু এই অংশটা ধরলে পশ্চিমবঙ্গে তার মধ্যে নারী পুরুষের অনুপাতটা কী রকম, সেই পরিসংখ্যান হাতের কাছে নেই। তবে পুরুষের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বেশি হবে। আর একটা হিসেব পাওয়া যায় শিশুদের (‌শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী)‌ লিঙ্গ–অনুপাতের। ২০০১ সালে যার জন্ম তার এখন ১৬ বছর বয়স। তাই ওই বছরের আদমশুমারি থেকে পশ্চিমবঙ্গের চাইল্ড সেক্স রেশিও নিলে দেখছি ১০০০ শিশু ছেলে প্রতি শিশু মেয়ে হল ৯৫৬। তার মানে জনসংখ্যায় পুরুষের সংখ্যা অবশ্যই বেশি, কিন্তু পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় তারা কম। এখান থেকেই আমরা নিশ্চিত হচ্ছি যে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সে প্রচুর ছেলের লেখাপড়া করার কথা ছিল, কিন্ত করছে না। এদেরই আমরা বলছি শিক্ষার আওতা থেকে ‘‌হরিয়ে যাওয়া ছেলে’।

এদের সংখ্যা কত?‌ কোনও হিসেব আছে কী? 
নিখুঁত হিসেব নেই, থাকা সম্ভব কিনা, সেটাও একটা বিচার্য। তবে হাতের কাছে থাকা পরিসংখ্যান থেকে একটা যুক্তিসঙ্গত অনুমান করাই যায়। তবে সাধারণত ২০১১ আদমশুমারি তথ্যে যে হাজার পুরুষ প্রতি নারীর হিসেব করা হয়, সেই মাপকাঠিটাকে আমরা এখানে উল্টে দিচ্ছি। অর্থাৎ আমরা নারীকে ভিত্তি ধরে হাজার নারী প্রতি পুরুষের মাপকাঠি ব্যবহার করব।

কেন?‌ তার সুবিধা কী? 
অনেক সুবিধা। প্রথমত, ওটাই আমরা জানতে চাইছি, মেয়েদের স্ট্যান্ডার্ড ধরে সেই তুলনায় ছেলেদের সংখ্যা কতটা কম?‌ দ্বিতীয়ত, জৈবিকভাবে নারীই হচ্ছে জনসমষ্টি সংক্রান্ত আলোচনার স্বাভাবিক একক— কারণ তার থেকেই জনের সৃষ্টি হয়। এবং তৃতীয়ত, সাধারণভাবে আধুনিক আন্তর্জাতিক স্তরে হাজার নারী প্রতি পুরুষ ধরেই আলোচনা হয়ে থাকে।

তাহলে ওই হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের সংখ্যাটা হিসেব করে কত আসছে? 
জনগণনা অনুসারে (‌২০১১)‌ হাজার নারী প্রতি পুরুষ থাকার কথা ১০৫২। এই বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হাজার মেয়ে পিছু ছেলে ছিল ৮৩৮। মানে হারিয়ে যাওয়া ছেলে হল ১০৫২ বিয়োগ ৮৩৮ =‌ ২১৪। গত বছরের হিসেবটা নিলে দেখব সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ১৮৩। খুব মোটা দাগের একটা হিসেবে প্রতি হাজারে প্রায় দুশো, মানে পাঁচজনের মধ্যে একজন। যে পাঁচটা ছেলের মাধ্যমিক দেওয়ার কথা ছিল, তার মধ্যে একজন দিচ্ছে না। এটা অবশ্য শুধু মেয়েদের তুলনায়, ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে যে স্কুলছুটের সমস্যা আছে, তার কথা এখানে বলা হচ্ছে না। মেয়েদের সঙ্গে তুলনার পরিসংখ্যানে না গিয়ে মোট সংখ্যা হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে আরও এক লক্ষ ১৩ হাজার ছেলের এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু খাতায় তাদের নাম নেই। 

উচ্চ মাধ্যমিকের ছবিটা কেমন? 
উচ্চ মাধ্যমিকে ছেলেদের চেয়ে বেশি সংখ্যক মেয়ে পরীক্ষায় বসেছে প্রথম ২০১৬ সালে, তার পর এই বছরও। এই বছর মেয়েদের আনুপাতিক হার গত বছরের থেকে বেড়ে হয়েছে ৫২%‌। আগের ওই মাধ্যমিকের ফর্মুলা অনুরণ করে হিসেব করে দেখা যাচ্ছে প্রতি হাজার মেয়ে পিছু এবার হারিয়ে যাওয়া ছেলে পরীক্ষার্থী হল ১২৯। গত বছর যেটা ছিল ৯৩। মানে হল সংখ্যাটা মাধ্যমিকের চেয়ে কম, কিন্তু তবুও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, দুটি স্তরেই দেখা যাচ্ছে হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের সংখ্যাটা বাড়ছে। 

তার মানে ছেলেরা লেখাপড়া কম করছে, এই তো?
না। শুধু তাই নয়, আসল প্রশ্নটা হল, লেখাপড়া না করা ছেলেরা কী করছে?‌ যে বয়সে লেখাপড়া করার কথা যে বয়সে ছেলেমেয়েরা তা না করলে সমাজের চিন্তার কথা। পর্ষদ বা সংসদের খাতায় নাম না ওঠা দু–একজন আগামী দিনে হয়তো রবীন্দ্রনাথ হবেন, কিন্তু বাকিরা? দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ড, ঘরের কাছে কামদুনি— ভুলে যাওয়া কঠিন।

ওই সব ভয়ঙ্কর, বিরলের মধ্যে বিরলতম অপরাধের সঙ্গে পরীক্ষা না দেওয়ার সম্পর্ক টানাটা অত্যন্ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?
অবশ্যই বাড়াবাড়ি। যারা লেখাপড়া করছে না, তার সবাই ধর্ষক হচ্ছে না সেটা পরিসংখ্যান থেকেই পরিষ্কার। কিন্তু ওই দুটো ক্ষেত্রেই অপরাধের শিকার স্নাতক স্তরে লেখাপড়া করা মেয়ে, অপরাধী বেশির ভাগই টেনেটুনে ক্লাস এইট অবধি পৌঁছনো পুরুষ। লেখাপড়া মানে সমাজে এগিয়ে যাওয়া। মেয়েরা এগিয়ে যাচ্ছে খুব ভাল, কিন্তু এগোনোর পথ থেকে পাঁচভাগের একভাগ পুরুষ পিছলে পড়ে বাইরে ছিটকে যাচ্ছে। এটা মোটেও ভাল কথা নয়। এই সত্যটার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই শেষে এসে একটু বাড়াবাড়ি করা। বাড়াবাড়ি না হলে আমাদের চোখ পড়ে না যে রোগের দিকে।

Developed by DXDasia