গড়িয়াহাট ফুটপাথের নতুন সাজ : সৌন্দর্য বাড়ল, সচেতনতা বাড়ল কি?

প্লাস্টিকের পরিবর্তে এসেছে টিনের দীর্ঘমেয়াদি শেড, লোহার ঘেরাটোপ

ড়িয়াহাট — দক্ষিণ কলকাতার এই ব্যস্ততম এলাকাটি গত দেড়-দুই বছরে সেজে উঠছে নতুন রূপে। ফুটপাথে প্রায় কয়েক হাজার হকার পসরা সাজিয়ে বসে আছেন বহু বছর ধরে। সেই গড়িয়াহাটের এবার নতুন চেহারা। এতদিন ধরে প্রায় প্রত্যেকটি দোকান প্লাস্টিকের আচ্ছাদনে মোড়া থাকত। ফুটপাত দিয়ে হাঁটা কার্যত দায় হয়ে গিয়েছিল শহরবাসীর। পরপর দুইবার বড়ো অগ্নিকাণ্ডও ঘটে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সচেতন ছিলেন না অধিকাংশ হকার। বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছিলেন কলকাতা পুরসভার কর্মকর্তারা। অবশেষে গড়িয়াহাটের এই সাজ।

শহর কলকাতার সমস্ত বাজারগুলোতেই এক তৃতীয়াংশের বেশি ফুটপাথ যাতে হকাররা না দখল করেন, সেই দিকে কড়া নজরদারি রাখা হয়েছিল পুরসভার তরফে। তার ফলস্বরূপ দেখা যাচ্ছে, গড়িয়াহাট ফুটপাথের সমস্ত দোকানে খুলে দেওয়া হয়েছে উপরে প্লাস্টিকের আচ্ছাদন। পরিবর্তে এসেছে টিনের দীর্ঘমেয়াদি শেড। চারপাশে ছোটো ছোটো বাড়ির মতো লোহার ঘেরাটোপ। এমনকি গোটা এলাকায় অগ্নি সুরক্ষার দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের মতো কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার ক্ষেত্রে যাতে দমকলের আধিকারিকদের কাজ করতে সুবিধা হয় তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা রেখে তৈরি করা হচ্ছে এই ছাউনি। টাউন ভেনডিং কমিটির তত্ত্বাবধানে সমস্ত হকাররাই যাতে এই ছাউনির মধ্যে দোকান করতে পারেন সেই দিকে নজর রাখছে পুরসভা। গড়িয়াহাট বাজারকে মডেল বানিয়ে পরে ধর্মতলাহাতিবাগানের মার্কেটেও এইরকম ছাউনি তৈরি করা হবে বলে জানা গিয়েছে।

শহর কলকাতার সমস্ত বাজারগুলোতেই এক তৃতীয়াংশের বেশি ফুটপাথ যাতে হকাররা না দখল করেন, সেই দিকে কড়া নজরদারি রাখা হয়েছিল পুরসভার তরফে।

লোহার খাঁচা, উপরে টিনের শেড

শহরে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সৌন্দর্যায়নের চেষ্টা কম হয়নি। সেই সৌন্দর্যায়ন রক্ষণাবেক্ষণের একটা দায় চলে আসে। কে বা কারা সেই দায়িত্ব পালন করবে! এখন ফুটপাথে সকলের জন্য সমান জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। এবং দেখা যাচ্ছে কিছু স্টলের পিছনে পুরোনো শাড়ি, গামছা, বিছানার চাদর লাগিয়ে ঘেরাটোপ তৈরি করছেন হকাররা। গড়িয়াহাট উড়ালপুলের নিচের রাস্তা দিয়ে গেলে যেকোনো পথচারীর চোখে পড়বে এ দৃশ্য। এই দৃশ্যদূষণের হাত থেকে শহরকে বাঁচাতে কলকাতা আর্কিটেকচার ফাউন্ডেশন থেকে একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছিল কলকাতা পুরসভার কাছে। তার জন্য দুটি প্রতিরূপ নকশাও বানানো হয়, যা এখন হিন্দুস্তান পার্কের রাস্তায় পড়ে আছে। সেই প্রস্তাবে বলা ছিল, প্রত্যেকটি দোকানের বক্সের মধ্যে কিছু আর্টওয়ার্ক থাকবে। এছাড়াও গড়িয়াহাটে যে সমস্ত বড়ো দোকান আছে, যাদের ল্যান্ডমার্ক বলে চিহ্নিত করা হয়, সেই দোকানগুলো ফুটপাথের অতিরিক্ত স্টলের কারণে প্রধান রাস্তা থেকে দেখা যায় না। ফলে নতুন ক্রেতারা অনেকসময় দোকানগুলি খুঁজে পান না। তাই সেই সমস্ত বড়ো দোকানগুলিকে চিহ্নিত করতে ফুটপাথের পিছনে বড়ো কাটআউট দেওয়া হবে, যাতে প্রধান রাস্তা থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় এবং গড়িয়াহাটের মানচিত্রও তুলনামূলক ভাবে সহজ হয়ে যায়। পাশাপাশি সেই দেওয়ালে গ্রাফিতি করা যেতে পারে, থাকতে পারে সরকারি বিজ্ঞাপন। এই প্রস্তাব কলকাতা পুরসভার কাছে পাঠানো হয়, কিন্তু তা সম্ভবত গৃহীত হয়নি। বর্তমানে শুধুমাত্র রাজ্যের তরফে সরকারি বিজ্ঞাপন গড়িয়াহাট ফুটপাথের একাংশে দেওয়া হয়েছে।

দৃশ্যদূষণের হাত থেকে শহরকে বাঁচাতে কলকাতা আর্কিটেকচার ফাউন্ডেশন থেকে একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছিল কলকাতা পুরসভার কাছে। সেই প্রস্তাবে বলা ছিল, প্রত্যেকটি দোকানের বক্সের মধ্যে কিছু আর্টওয়ার্ক থাকবে।

প্রশস্ত হয়েছে ফুটপাথ

গত দেড় বছর ধরে গড়িয়াহাটের ফুটপাথগুলিকে আরও পরিষ্কার এবং চওড়া দেখাচ্ছে। পথচারীদের যাতায়াতের সুবিধাও হচ্ছে। স্টলগুলি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তাঁরা একটি সীমাবদ্ধ রেখার বাইরে চলে না যান। ফুটপাথ আর আগের মতো স্যাঁতসেঁতেও নেই, সূর্যের আলো পড়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। অনেক হকার মনে করছেন, এই সাজ স্থায়ী হলেই ভালো। অনেকেই আবার প্লাস্টিক বর্জন করতে পারছেন না। তাঁদের বক্তব্য, প্লাস্টিকের বিকল্প কী, তা জানা নেই।

কলকাতা পুরসভা থেকে ২০২৩ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল, গড়িয়াহাটের ফুটপাথে পসরা নিয়ে বসতে হলে বেশ কিছু নিয়ম মানতে হবে হকারদের। যেমন, কোনও ভাবেই ফুটপাথের দখল নেওয়া যাবে না। ফুটপাথের দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা অবশ্যই পথচারীদের জন্য ছেড়ে রাখতে হবে। ফুটপাথের কোনও দোকানের মুখ রাস্তার দিকে থাকবে না। ফুটপাথে বসে রাস্তার অংশ দখল করে রাখা চলবে না। 

২০১৫ সালে শহরে নথিভুক্ত হকারের সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার। পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে কলকাতায় হকারির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ। এত জনকে পুনর্বাসন দেওয়ার মতো জায়গা নেই শহরে। হকার সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক দেবাশিস দাসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, টাউন ভেন্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হচ্ছে। তাঁরা চান পুরসভার এই চেষ্টা সাফল্য পাক। ধীরে ধীরে শহরের ফুটপাথ দখলমুক্ত করার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।

রাস্তা থেকে দোকানগুলির পিছনের অংশ, লোকে বলছে দৃশ্যদূষণ

এ প্রসঙ্গে কথা বললাম পুরোনো এক গয়নাবিক্রেতার সঙ্গে। গড়িয়াহাটের পাঁচ মাথার মোড়ে প্রায় তিরিশ বছর ধরে আছেন তিনি এবং তাঁর বড়ো দোকান। তিনি জানান, “এত বছর ধরে গড়িয়াহাটের এই প্রশস্ত ফুটপাথ দেখিনি। নতুন গ্রাহকরা প্রায়শই অভিযোগ জানাতেন, দোকানটি সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই সৌন্দর্যায়নের ফলে এখন আমার দোকানের সাইনবোর্ড রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে।” হকার ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানা গিয়েছে এই মুহূর্তে গড়িয়াহাটের চারপাশে ১,২০০ জনের বেশি হকার রয়েছেন। বড়ো দোকান এবং ফুটপাথের স্টল ছাড়াও বহু আবাসনে অনেক মানুষ বসবাস করেন। সূর্যের আলো ও যথেষ্ট পরিমাণে বায়ু চলাচল করত না, দিনেরবেলাতেও ফুটপাথের রাস্তায় অন্ধকার নেমে আসত। এখন খোলা জায়গা হওয়ায় বহুতলের বাসিন্দারাও খুশি। পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা, হকার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটিকে প্রোটেকশন অফ লিভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অফ স্ট্রিট ভেন্ডিং আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

হকার ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানা গিয়েছে এই মুহূর্তে গড়িয়াহাটের চারপাশে ১,২০০ জনের বেশি হকার রয়েছেন।

কলকাতা আর্কিটেকচার ফাউন্ডেশনের সদস্য সোহমদীপ সিনহা রায় বলছেন, “কলকাতা পুরসভা নানান ধরনের গ্রাফিটি, গ্রাফিক্স, অন্যান্য বিজ্ঞাপন প্রদর্শন নিয়ে ভাবতে পারে। এতে সৌন্দর্য বাড়বে।”

অনেকের মত, দোকান ছোটো হয়ে যাওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে দ্রব্যাদি রাখা যাচ্ছে না

দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততম এলাকা গড়িয়াহাট। সরকারি দিক থেকে সৌন্দর্যায়নের সমস্ত দিক খুলে দিলেও বহু মানুষের অযত্ন, অবহেলা, সর্বোপরি সচেতন না হওয়ার কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে সৌন্দর্য। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, গড়িয়াহাটের এহেন পরিবর্তনে ইতিবাচক সায় দিয়েছেন অধিকাংশ হকার। দূর দূরান্ত থেকে ব্যবসা করতে আসেন তাঁরা। বছরের পর বছর এক জায়গায় থাকতে থাকতে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে অন্যান্য হকারের সঙ্গেও। তাঁদের এই যৌথতা বেশ উপভোগ করার মতোই।

_____

ছবি : সুমন সাধু

Developed by DXDasia