মন্দারের স্টুডিয়োর শিল্পী গণেশ

এমনকি, ওয়াল্ট ডিজনির সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন মন্দার মল্লিক

বাঙালির উদ্যোগ চিরকালই ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে অতলে হারিয়ে গিয়েও। সেইসব উদ্যোগপতিদের সকলের কথা আমাদের সমান ভাবে জানা রয়েছে এমন নয়। হাতে গোনা দুয়েক জনের কথা আমাদের কালে ভদ্রে মনে পড়ে। এমনই একজন ইতিহাসের বাঙালি উদ্যোগপতি হলেন মন্দার মল্লিক। বহরমপুরের অভিজাত মল্লিক বাড়ির জমিদার সন্তান। সহসাই মাথায় চাপল ঘরোয়া দেশী যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করেই তৈরি করবেন অ্যানিমেশন ফিল্ম। নিজে নিয়মিত দেখতে ভালোবাসেন কার্টুন চিত্র। সেসব দেখেই মনে ইচ্ছে হয়েছে নতুন কিছু করার। সেই মতোই নিজের জিম্মাতে থাকা জার্মান ওয়েরলিকন ক্যামেরাকে কাজে লাগাবেন বলে ঠিক করে ফেললেন। কিন্তু তখন অ্যানিমেশন বলতেই তো লোকে ওয়াল্ট ডিজনি বোঝে। তাই তরিজুত করে যোগাযোগও করে ফেললেন তাঁর সঙ্গে।

থেমে থাকার পাত্র নন মন্দার মল্লিক। কলকাতায় কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের স্টুডিয়োতে কাজ শুরু করে দিলেন। গোড়ার সময় কাল থেকেই বহু নাম করা কমার্শিয়াল আর্টিস্ট ওঁর স্টুডিয়োতে কাজে যোগ দিয়েছিলেন। আর মল্লিক নিজেই করতেন ক্যামেরাম্যান আর পরিচালকের কাজ। এই ভাবেই এক সময় বানিয়ে ফেললেন কুইন অ্যানোফিলিস নামের একটি অ্যানিমেশন ফিল্ম। এটির সহায়তা দিয়েছিল সেই সময়ের কলকাতা কর্পোরেশন। এরপর বানালেন অমর লিপি। এই ছবি টলস্তয়ের গল্পকে নির্ভর করে তৈরি হলেও এটি মূলত তৈরি হয়েছিল পি এম বাকচির কালির বিজ্ঞাপন হিসেবে। এই ভাবেই মল্লিকের হাত ধরে অ্যানিমেশন ফিল্মের জগতে ভারত তথা কলকাতা নতুন দিকে এগিয়ে গেলেও মল্লিক তাঁর নয়া উদ্যোগে সফল হতে পারেননি। এরকমই এক বিধ্বস্ত উদ্যোগপুরুষ মল্লিকের সাথে গণেশ পাইনের যখন দেখা হয় তখন গণেশ পাইনের বয়স হাতে গুণে চব্বিশ পঁচিশ বছর। গণেশ পাইন যোগ দিলেন মন্দার মল্লিকের কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের স্টুডিয়োতে। সেখানে নীরবে উন্মোচিত হয়েছিলেন অ্যানিমেটর শিল্পী গণেশ পাইন।

 

কলকাতার বিখ্যাত আকারপ্রকার আর্ট গ্যালারিতে দেখা গিয়েছে সেই গণেশ পাইনের একগুচ্ছ ছবি। যে ছবিগুলি দেখানোর আয়োজন করে আকারপ্রকার কলকাতার শিল্প রসিকদের কৃতজ্ঞ ভাজন হয়েছে। এমন উদ্যোগ বারে বারেই হওয়া দরকার। সেই তরুণ গণেশ পাইন ততদিনে অনেক কিছু দেখেছেন। দাঙ্গা, দেশভাগ, শরিকী লাঠালাঠি বাবা কাকার সবই দেখেছেন দু’চোখ দিয়ে। এবার গণেশ পাইন যখন ষাটের দশকে মন্দার মল্লিকের স্টুডিয়োতে কাজ করতে এলেন ততদিনে অবশ্য মন্দার মল্লিকের বিপর্যয় দশা। তবু কাজের হাল তখনও ধরে রেখেছেন। সেখানে বসেই পঞ্চতন্ত্রের গল্পের অ্যানিমেশনের জন্যে কত কত ছবি আঁকলেন গণেশ পাইন। ফ্রেমের পর ফ্রেম। অহঙ্কারি সিংহ, ধুর্ত শেয়াল, প্রত্যেকের মধ্যেই যেন নিখুত ভাবে উন্মোচিত হল মানুষের বিবিধ চরিত্রগুণ। সেই সঙ্গে শরীর রেখার তীব্র ভাঙচুর আর ন্যাকেড আই রিয়ালিজম থেকে বেড়িয়ে আসার দুরন্ত উদাহরণ তৈরি করে নিজের এক অন্য পরিচয় গড়ে তুললেন গণেশ পাইন। দিগন্ত প্রসারিতর দৃশ্যাবলী, প্রকৃতি সব কিছুতেই মিশিয়ে দিলেন নিজের পর্যবেক্ষণ আর সঙ্গে ভাঙচুরের প্রতিনিয়ত অভিনবত্ব। এসব নিয়েই আলো ছায়া, গতি, ভঙ্গী, ক্যারেক্টর তৈরির এক অন্য মানের শিল্পী হিসেবে ধীরে ধীরে নিজেকে হাজির করছিলেন গণেশ পাইন। ডিজনির থেকেও গ্রহণ করেছেন নিজের মতো করে। তবে তা ভারতীয় পঞ্চতন্ত্রের চরিত্রকে ক্ষুণ্ণ করেনি এক মুহূর্তের জন্যেও। উজ্জল রঙের মতোই উজ্জল গণেশ পাইনের মন্দার স্টুডিয়োর দিনগুলি। এ যেন এক উদ্যগপতির সঙ্গে এক শিল্পীর বিরল যুগলবন্দি।

 

Developed by DXDasia