পদাবলী কীর্তনের সাধিকা

হৃদয়ে অঝোরে বৃষ্টি পড়েই যায়, পড়েই যায় ….

পুজোর গানের বই যখন বেরোতো প্রতি বছর আর নিয়ম করে সে গান বাজত অনুরোধের আসরে, সেখানে একজনের গান কিন্তু বাজত না কখনো ।তাঁর গান শোনা যেত আলাদা অনুষ্ঠানে। দেখতাম, সকলের সাজগোজ করা ছবি থেকে এই মানুষটির ছবি যেন একেবারে আলাদা। সমস্ত শরীর ঢাকা সাদা শাড়িতে, কপালে একটি চন্দনের টিপ আর পরের দিকের যে ছবিগুলো দেখেছি, তাতে বাড়তি গয়না বলতে একজোড়া ছিমছাম ফ্রেমের চশমা। তিনি যে বিশেষ ধারার গানে সিদ্ধা ছিলেন, ওই অল্প বয়সে আমার সে গান ভালো লাগার কথাই হয়ত নয়। কিন্তু লাগত, তার একটি কারণ হয়ত এই যে আমার ছোটবেলায় ভীষণভাবে প্রভাব ছিল দাদু -ঠাকুমার, যাঁরা দুজনেই কীর্তনের বড় অনুরক্ত ছিলেন ।

গীতশ্রী ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন জানি না, আমার সাধিকা বলে মনে হত। দুটি চোখে কী অদ্ভুত প্রশান্তি। আর কণ্ঠের মধুরিমা? আহা, পদাবলী কীর্তনের আখর কানে বাজত…"সখি, সাজায়ে রাখ লো পুষ্পবাসর, এমনই করিয়া তোরা, আহা কে জানে কখন আসিবে ফিরিয়া গোপিনীর মনচোরা…" কী জেদে, কী ঝোঁকে আমি গানটি রেডিওতে শুনে শুনে তুলে নিয়েছিলাম।

দাদু ঠাকুমা চিনতেন তাঁকে।কখনো কখনো একই ঠাকুরবাড়িতে দেখা হয়ে থাকবে হয়ত, সেই সূত্রে। দাদুর কাছে শুনেছিলাম, ওঁর ঠাকুরঘরটি ছিল মন্দিরের মতো। নিজে হাতে প্রতিমা গড়ে বন্দনা করতেন। সরস্বতী মূর্তি গড়েছিলেন নিজে। পরবর্তী কালে খবরের কাগজে সে ছবিও বেরিয়েছিল। তিনি গাইতেন তো অনেকই গান। রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, রামপ্রসাদী …সব। কিন্তু সে সব সেভাবে শুনেছি বলে মনে পড়ে না। সে শুনেছি অনেক পরে। ইউ টিউবের কল্যাণে। তাঁর কীর্তনেই আবিষ্ট ছিলাম আমি।শুনেছিলাম, রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড করেছিলেন নাকি শান্তিদেব ঘোষের তত্ত্বাবধানে, কিন্তু তা বিশ্বভারতীর অনুমোদন পায়নি ( অবশ্য সে আর নতুন কথা কী !)

জানি না, এখনকার প্রজন্মের ক'জন তাঁর কথা মনে রেখেছে। কিন্তু আমি ভাবি , কতখানি সম্মোহনী ক্ষমতা থাকলে একটি শিশু বা বালিকাকে কীর্তনে আকৃষ্ট করা যায়!

আজকাল যত বয়সের সূর্য ঢলে আসছে পশ্চিমে, পুরোনো কথা খুব বেশি করে মনে হয়। পুরোনো গান, পুরোনো লেখা, পুরোনো সাদা কালো ছবি। কোন অর্বাচীন বলে যে স্মৃতির রং ধূসর? আমি তো শুধু রামধনুর ছটাই দেখি, আর বিভোর হয়ে থাকি। কানে নূপুর বেজে যায় রিনরিন করে …যত পুরোনো গ্রামোফোন রেকর্ডে। হৃদয়ে অঝোরে বৃষ্টি পড়েই যায়, পড়েই যায় ….

 

Developed by DXDasia