গানের ঝর্নাতলায়- ৬

যাই গো, ওই বাজায় বাঁশি

জ্ঞান হয়ে ইস্তক দেখতাম আমার ঠাম্মা আর দাদু রবিবার বিকেল হলেই পুজোবাড়ি যেতেন। আমিও শুনে শুনে "পুজোবাড়ি"ই বলতাম। প্রতি রবিবারেই এক রুটিন। ফিরতে ফিরতে রাত আটটা ন'টা বাজত। পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে? তাই আমিও বায়না করতাম সঙ্গে যাব বলে। গিয়ে যে খুব প্রাণের আহ্লাদ হত, তাও নয়। আমার বয়েসী বাচ্চাকাচ্চা প্রায় নেই কেউ, ফরাসের ওপর বসে গীতার ব্যাখ্যা, পুজোর বই খুলে সমস্বরে পাঠ.. সত্যি বলতে কি খুব কিছু লোভনীয় বিনোদন মোটেই ছিল না। শুধু গুটিকয় জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল। দাদু খুব ভালো করতাল বাজাতেন, রাতাবি সন্দেশের মতো দেখতে ওই চকচকে পিতলের দুটি পাতের ঠুনঠুন শব্দ আমায় বড় টানত। আর টানত পাঠের খাঁজে খাঁজে গুঁজে দেওয়া গুটিকয় গান। (আর অবশ্যই শেষ পাতে গুড়ের বড় বড় বাতাসা, মাঝেমধ্যে হালুয়া বা অন্য মিষ্টিও থাকত)

এই সব পাঠ আর গান, তাদের অর্থ সম্যক উপলব্ধি করার বয়স তখনও আমার না হলেও, একেবারে কণ্ঠস্থ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে একটি গান যখন পুজোর মাঝামাঝি হারমোনিয়ামে বেজে উঠত, আমার আজন্মের চেনা কোনো নারী যখন চোখ বুজে কল্কাপাড় সাদা জমিনের শাড়ির আঁচলটি গলায় জড়িয়ে প্রথম কলিটি গেয়ে উঠতেন, আমার চোখের কোণ দুটো কেমন জ্বালা করত, গলার ভেতরটা পাকিয়ে উঠত আর কী যে ভীষণ কষ্ট হত!

"যাই গো, ওই বাজায় বাঁশি, প্রাণ কেমন করে
  ও সে একলা কালা কদমতলায় দাঁড়িয়ে আছে আমার তরে…"

দাঁড়িয়ে আছে? কতক্ষণ? কার জন্য? আমার জন্য? যে গাইছে, তার জন্য? এত প্রশ্নের জবাব পেতাম না। অপেক্ষাটা গুঞ্জন তুলে ফিরত মনের আনাচে কানাচে। আর তারপরেই আমার খুব রাগ হত। সব ভেঙেচুরে ফেলে দিতে ইচ্ছে হত। আর চোখ দুটো উপচে উঠত জলে। 

সেই জলে ভেসে উঠত এই পুজোবাড়িতেই দেখা এক বয়স্কা নারীর মুখ। প্রতি সপ্তাহে এক এক বাড়িতে পুজোর আয়োজন হত তো! যিনি এমন একটি বাড়ির আশ্রিতা ছিলেন। ঠিক কেমন আত্মীয়তা, আজও জানি না। আমি যখন দেখেছি, যতদিন দেখেছি … থাকতেন অত বড় বাড়ির সিঁড়ির নীচে একটা তক্তাপোষে। সধবা, মস্ত বড় সিঁদুরের টিপ, পাকাচুল ধ্যাবড়া সিঁদুর, হাতে শাঁখা পলা (ব্রোঞ্জের চুড়িও ছিল কি দু-গাছা? মনে নেই!), হালকা ময়লাটে সাদা শাড়ি… বেশিরভাগ দিনই সবুজ পাড়ের। "সবুজ- মা"। "সবুজ- মা" কে আমি প্রণামও করতাম। বিজয়ার প্রণাম। কোনোদিন দেখিনি ওঁর স্বামীকে। সন্তান? ছিল না বলেই মনে হয়। সম্পন্ন পরিবারে অমন দু-পাঁচটা আশ্রিত থাকা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না সে সব দিনে। আদর নেই, অনাদরও নেই। সূক্ষ্ম উদাসীনতার পড়ন্ত রোদ্দুর আঁকা থাকত আশ্রয়দাতার মহত্ত্বের আকাশ জুড়ে। রান্নাঘরের থালা- ঘটি- বাটির মতোই গুছিয়ে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকা। অসুখবিসুখও দেখিনি হতে তেমন। বছরের পর বছর একই নিষ্পত্র গাছের মতো চেহারা।

শুধু ওই গানটা যেই শুরু হত, আমার বুকটা ধক করে উঠত। আমার খালি খালি মনে হত, কেউ দাঁড়িয়ে আছে, অপেক্ষা করছে সবুজ-মায়ের জন্য।

রবিবার ঘুরে যায়। ঘুরে যায় মাস ও বছর। আমি ঠাম্মাকে জিজ্ঞেস করে জেনে ফেলি, কালা আসলে কৃষ্ণঠাকুর। অপেক্ষা শ্রীরাধার জন্য। সবুজ- মা …শ্রীরাধা?

আমি একটু বড় হলাম। তারপর একদিন সবুজ- মা চলে গেলেন। মানে যেখানে গিয়ে আর কেউ ফেরে না। তক্তাপোষটা কিছুদিন কেমন ন্যাড়াবোঁচা হয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল, তারপর বাচ্চা ছেলের মতো অভিমান করে কোথায় চলে গেল। সিঁড়ির নীচটা ফিটফাট। আচ্ছা, সবুজ- মা বুঝেছিলেন, এতদিন অপেক্ষায় রাখা ঠিক নয় ?

"যত বাঁশরি বাজায়
 তত পথপানে চায় …
…আমি না গেলে সে কেঁদে কেঁদে চলে যাবে মান ভরে …"

তারপর থেকে এই আজ পর্যন্ত, এমনকি এই এক্ষুনি পর্যন্ত…গানটা গুনগুন করছি …চোখে জলও আসছে নিয়ম করে, কিন্তু…

সবুজ-মায়ের মুখটা যে ঠিক কেমন ছিল … জলের আয়নায় আর ভেসে ওঠেনি আর। কখনোই না।

 

Developed by DXDasia