গানের ঝর্নাতলায় ৯

দিলীপকুমার রায়ের কণ্ঠে মীরার ভজন

আজ এমন একজনের কথা বলব, যাঁর মাধ্যমে প্রথম মীরার ভজন আমার কচি মনে সুরের সাম্পান ভাসিয়েছিল। তাঁকে প্রথম যখন দেখি তখন আমার বয়স সাড়ে পাঁচ। স্থান : পুণে শহর। তখন অবশ্য পুণা বলেই ডাকা হত। ওখানে আমার পিসেমশাই তখন কর্মসূত্রে পোস্টেড। আর্মির ডাক্তার। আমি গেছি বাবা মায়ের সঙ্গে। তার অল্প কয়েকমাস আগে আমার একমাত্র পিসতুতো দাদা সর্পদষ্ট হয়ে মারা গেছে মাত্রই সাড়ে এগারো বছর বয়সে। সে এক অসহনীয় পারিবারিক শোকের সময়।আমার পিসতুতো বোন আমার চেয়ে দেড় মাসের বড়। আমি টুকটুক, ও টুলটুল। আমরা দুটিতে থাকি জড়োসড়ো হয়ে। আমরা বুঝি, কষ্টটা, তীব্র শোকও..কিন্তু তাকে সেভাবে স্পর্শ করতে পারি না সারা বাড়ি নিঝুম হয়ে থাকে। দুপুরবেলা আমরা চলে যাই পেছনের বারান্দায়। দোলনায় বসি। বাগান পেরোলেই পাঁচিলের ওপাশে পুণের বিখ্যাত রেসকোর্স। দুপুর রোদ্দুরে ঘোড়া ছোটে না। কিন্তু আমরা প্লেটে করে শুকনো হরলিক্স চেটে চেটে খাই আর কল্পনায় শুনি ঘোড়ারা ছুটে যাচ্ছে, দেখি তাদের কেশর উড়ছে হাওয়ায়।

সন্ধে নামলে যাই রোজ এক অদ্ভুত জায়গায়। হরি কৃষ্ণ মন্দির। সে এক নন্দনকানন। বাগান ভরা নানান রঙের ১৭৮ রকমের গোলাপ, ছোট ছোট বাতিতে সারা বাগান আলোয় আলো হয়ে থাকে। সেখানে সন্ধেবেলা গান হয়, পুজো হয়। আমরা দুটি বালিকা পুজোআচ্চা বুঝি না। গান শুনতে ভালোবাসি। সেখানে যে "দাদাজি" আছেন! গেরুয়া বসনধারী মাথায় টুপি এক সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ, তিনি একটি ডিভানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে মন্দ্রমধুর গান গেয়ে যান একের পর এক। মীরার ভজন।আমি আর টুলটুল ভেতরে ঢুকেই ছুট্টে গিয়ে বসে পড়ি দাদাজির দুই পাশে,আমাদের ছোট্ট ছোট্ট হাতে দাদাজি তুলে দেন দুটি বিচিত্রদর্শন খঞ্জনী ধাঁচের বাদ্যযন্ত্র। বলেন, 'গানের সুরে ঠিকঠাক তালে বাজা"। আমরা এক দু'বার ভুল করি, তারপর ঠিক লয়ে ঠেকা দিতে শিখে যাই। তবলায় বসে এক সুদর্শন তরুণ। দিদিজির পুত্র। ওই হলঘরেই আছে বিগ্রহ। ওই গানই পুজো। দিদিজি আচমকা গানের মাঝেই এক একদিন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে আরতি করতে করতে দুলতে থাকেন বিগ্রহের সামনে। কথা বলেন, গুনগুন করেন মীরার ভজন। ঘরে আলপিন পড়ার শব্দ থাকে না। দিদিজির বন্ধ চোখের পাতা উপচে জল গড়িয়ে পড়ে ভিজিয়ে দেয় দুই গাল। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি "ভাবসমাধি "কাকে বলে !

আমরা দু'টি শিশু বসে থাকি…দু'ঘন্টা, তিন ঘন্টা, নিশ্চুপে। ছটফট করি না, কথা বলি না। শুধু গান আর গান| আমাদের মনেই হয় না…ভক্তিরসের প্রাবল্যে অস্থির হয়ে ওই কচিবয়সে উশখুশ করার কথা। আমরা দেখি আর শুনি দাদাজি কী ভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন শ্রোতাদের। আমরা কিছু বুঝে কিছু না বুঝে ভেসেই যাই সুরের জাহ্নবীজলে।

একদিন, দু'দিন নয়..এমন দেখেছি অনেক দিনই। সেবার আমরা ছিলাম দু'মাস। দাদাজি বলতেন,“টুকটুক আর টুলটুল। আজ থেকে আমার নাম পিকপিক। " গান শিখিনি আমরা দাদাজির কাছ থেকে। আমাদের সে পরিণত বোধবুদ্ধি ছিল না। এখন ভাবি, কেন বলিনি.."একটা গান শিখিয়ে দাও ", যাঁর কাছে তালিম নিয়েছিলেন উমা বসু বা এম.এস. শুভলক্ষ্মী! দাদাজি..যিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতে তালিম নেন জার্মানিতে আর স্বদেশে যাঁর শিক্ষাগুরুরা ছিলেন আব্দুল করিম, ফৈয়াজ খান, চন্দন চৌবে, পণ্ডিত ভাতখণ্ডে, গৌরীশংকর মিশ্র, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, হাফিজ আলী খান প্রমুখ।

তখন স্পুলে তুলে আনা হয়েছিল অনেক গান। দাদাজির কন্ঠে। অজস্র মীরার ভজন ও অন্যান্য গান। লচক লচক বিজলি ঝলক মনমোহন আওয়ে,কুঞ্জন বনচারী হে মাধো কহাঁ যাও গুণধাম,বসসো মোরে নয়না নোমে নন্দলালা, কা তব কান্তা, সুন্দরী রাধে আওয়ে বনি..ইত্যাদি। পরে, অনেক পরে স্পুল থেকে আমি আর টুলটুল সেগুলি অন্যত্র তুলে রাখি। কারণ স্পুল খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। এখনও এই সব গান আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে।

পরে অনেকবার দাদাজি কলকাতায় এসেছেন। "জাহাজ বাড়ি''তে বসেছে গানবাজনার আসর।আমি গেছি। "জাহাজ বাড়ি'টি ছিল দক্ষিণ কলকাতা অঞ্চলে। সেই ঐন্দ্রজালিক উপস্থিতি, সেই সম্মোহনী মায়া, সেই ভক্তির আর্তিতে উদ্বেল গান। তখন তিনি বৃদ্ধ। তবু যুবজনোচিত সাঙ্গীতিক তৎপরতা। বয়স হয়ত কন্ঠে কিছু প্রতিবন্ধকতা এনেছিল ; তবু প্রায় নিভু নিভু প্রদীপও তো কিছু কম আলো ছড়ায়নি!

সেই শিশুবেলায় বুঝিনি, কী অত্যাশ্চর্য পরম সম্পদ আমরা অক্লেশে লাভ করেছিলাম। একদিনের জন্য নয়, দিনের পর দিন। এখন অনুভব করি। হারিয়ে যাওয়া দিনই মনে করিয়ে দেয়..তা কতই দ্যুতিময় ছিল।

এই লেখার শেষে এসে এতক্ষণে খেয়াল হলো..দাদাজির কথা বলেই চলেছি। নাম তো বলা হয়নি। আগে দিদিজির নামটি উল্লেখ করি। দিদিজি.. শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী।

দাদাজি… দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র সংগীতজ্ঞ ও সাধক শ্রী দিলীপকুমার রায়।

 

Developed by DXDasia