১৩ জন শিল্পীর আঁকা ছবিতে উঠে এসেছে ভারতীয় ঘরানায় ফ্রিদার পোর্ট্রেট
ফ্রিদা কাহলো নিজেই একটি আত্ম-প্রতিকৃতির নাম। আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে ঘরের একটা কোণে শান্ত প্রকৃতির মেয়েটি অনায়াসে নিজেকে এঁকে ফেলতে পারতেন। ক্যানভাসই যেন তার আয়না। নিজের রূপ, বয়স যা যা তিনি হতে চেয়েছিলেন বা যা যা হতে পারতেন সবটার কোলাজ যেন ক্যানভাসে ধরা থাকত। মেক্সিকোর ছোট্ট শহর কোইয়াকানে জন্ম ফ্রিদার। বাড়ির নাম ‘লা আসা কাজুল’, যার বাংলা অর্থ নীল বাড়ি। বাড়িই যেন আস্ত একটা পেপার, তাতে নীল রঙের ছোঁয়ায় ক্রমশ নিজেকে নতুন ভাবে দেখতে চাইলেন ফ্রিদা। এই আত্ম-প্রতিকৃতির মাধ্যমে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন নারীর আপাত সৌন্দর্য অর্থাৎ আদর্শ ফেমিনিন বিউটি নিয়ে। নারীর সৌন্দর্য আসলে কী, এই ছিল তাঁর জীবনভর অনুসন্ধানের বিষয়। ট্র্যাজিডিতে ভরা জীবন। শৈশবে এক সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে আজীবন বিভিন্ন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন। এই অসুস্থতার কারণে আত্মীয়-পরিবার-বন্ধুমহল থেকে প্রায় দূরেই থাকতে পছন্দ করতেন। আর এসবের বেশ বড়সড় প্রভাব পড়েছে তাঁর কাজে।

স্বল্পায়ু জীবনে ফ্রিদা এঁকে ফেলেছেন ৬০টি আত্ম-প্রতিকৃতি। তবে তাঁর কোনও প্রতিকৃতিই নিজস্ব সৌন্দর্য প্রকাশের হাতিয়ার নয়। বরং প্রতিটি ছবিই হয়ে উঠেছিল নিজস্ব ফিজিক্যাল এবং সাইকোলজিক্যাল জীবনের ডাকবাক্স। এহেন ফ্রিদার জন্মদিনেই কলকাতায় সদ্য সদ্য তাঁকে শ্রদ্ধা জানালো ১৩ জন তরুণ। ফ্রিদা, শিল্পীদের চোখে ধরা দিয়ে অন্য মাত্রায় উঠে এসেছেন এই প্রদর্শনীতে। ভিতেশ নাইকের ছবিতে দেখা যাবে ফ্রিদা আয়নায় দেখছেন নিজের মুখ, চামড়ায় টান পড়েছে, আয়নার পিছনে নীল নীল বাড়ি, যেন তাঁরই সৌন্দর্য বহন করছে। আমাদের ভিতরের জীব-জন্তুগুলো শুধু উদ্দামতার কথাই ভাবে না। তারা যদি সুন্দর হয়? সত্য হয়? এই সুন্দর আর সত্যের সহজ ব্যাখ্যা মিলবে ফ্রিদার ছবিতে। অনেক ছবিতেই ফ্রিদার ঘাড়ে, কখনও হাতে বা মাথায় বিভিন্ন পশুপাখিরা থাকে। তাদের কারোর হাতে গোলাপ, কারোর হাতে গমের শিস। এভাবে সমাজের আপাত কুৎসিত ধারণাকে সজোরে আঘাত করতে পারতেন ফ্রিদা। যার জন্য তাঁর ছবিকে ম্যাজিক-রিয়ালিস্টিক বা জাদু-বাস্তবতা ধারার বলা যেতে পারে। ভাস্কর চিত্রকরের ছবিতে দেখা যাবে ফ্রিদার এক হাতে সিগারেট আরেক হাতে পাইপ, কাঁধে বসে থাকা এক কালো বিড়াল ফ্রিদার সৌন্দর্যে মুগ্ধ। এই প্রদর্শনীতে গেলে দেখা যাবে নারীবাদী চিন্তা চেতনার সম্পূর্ণ স্রোতের বাইরের কথা বলতে চেয়েছেন শিল্পীরা। শিল্পীদের অধিকাংশই বাঙালি। ফ্রিদাকে নিয়ে বাঙালির এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অতুলনীয়।
আরও পড়ুন
তুষারযুগের ছবি
ফ্রিদার আত্ম-প্রতিকৃতির মধ্যে ধরা পড়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানারকম ইস্যু। এই প্রদর্শনীতে দেখা যাবে ফ্রিদার আত্ম-প্রতিকৃতির অনুষঙ্গ হয়ে উঠছিল নানাধরনের ধর্মীয় সিম্বল, তাঁর নিজস্ব এথনিক আইডেন্টিটির নানা চিহ্ন, যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তোলা হচ্ছে শিল্পী হিসাবে বা প্রেমিকা কিংবা স্ত্রী হিসাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে। তাঁর বোল্ডনেস কিংবা সূক্ষ্ম গোঁফের রেখায় নিজেকে চিরাচরিত সমাজের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন। ফ্রিদার ১১১ তম জন্মদিনে বাংলার শহর কলকাতার এহেন প্রয়াস সত্যিই আকর্ষণীয়।

মহানির্বাণ রোডে আর্ট এক্সপোজার এবং রেঞ্জের আয়োজনে প্রদর্শিত ফ্রিদা কাহলোর আত্ম-প্রতিকৃতিকে নতুনভাবে দেখার প্রয়াস চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। কলকাতার আর্ট এক্সপোজার গ্যালারিতে।