ফকিরডাঙার লিয়াকত আলি

হেরা গুহায় নাজেল কোরান উহার সন্ধান করলি না রে /সাত অক্ষরে নাজেল কোরান, হাদিসে তার ঠিকানা রে

পশ্চিমবঙ্গে ফকিরি সাধনার একটি প্রধান জায়গা বীরভূম। এখন অবশ্য আরমান, গোলাম ও মনসুর ফকিরদের মিডিয়াজনিত খ্যাতির কারণে নদিয়ার গোরভাঙার নাম সকলে জেনেছে। কলকাতা থেকে ফকির দেখতে অনেকে এখানেই ছুটে আসে। ফকিরি উৎসব হয় এখানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে। ফকির চলে যান বিদেশে গাইতে। আগে যেখানে গান গাওয়ার ছিল কেবল বাউলের এক্তিয়ার। নদিয়ার বিশেষত গোরভাঙার ফকিরদের এই রংদারি দুনিয়ার ভেতরে নিয়ে আসার পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি অমিতাভ ভট্টাচার্য। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুদানের সঙ্গে অমিতাভদের কলকাতাস্থ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি গোরভাঙাতে অনেকদিন ধরে কাজ করছে। তারা এখানকার দরিদ্র পঞ্চাশ ঘর ফকিরদের খোল, দোতারা, ঢোল, খমক, জুরি, হারমোনিয়াম সব কিনে দিয়েছে। গোরভাঙার বাইরে যাঁরা বেরোতেন না তাঁরাই আজ মুম্বই, দিল্লি, গোয়া, রাজস্থান সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গান গাইতে যান দুটো পয়সার আশায়। আরমানরা গৌতম ঘোষের মনের মানুষ সিনেমার কল্যাণে বাউলের মতো বিশ্বের দরবারে এখন।

এতে অবশ্য দোষের কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। মারফতি গান শুধু সীমানার ভেতরে আবদ্ধ থাকবেই বা কেন? আর মারফতি সাধক কেবল পেটে গামছা বেঁধেই বা সাধনা করবেন কেন? গোরভাঙা থেকে চাপড়া, করিমপুর – অভিতাভরা ম্যাজিক গোয়িং গ্লোবাল প্রকল্পের আর্থিক অনুদানের ভেতর নদিয়ার ফকিরদের আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। তাই নাগরিক সমাজ এখন ফকিরি শুনতে গোরভাঙাতে ভিড় করেন। অথচ নদিয়া পেরিয়ে মুর্শিদাবাদ, যেখানে এখনও আত্মমগ্ন ফকিরদের আখড়া, সেখানে একদম ভিড়টির হয় না। ভিড় এখন নদিয়ায় আর ভিড় বীরভূমের পাথরচাপড়ি, ফকিরদের মক্কা দাতাবাবার কিংবদন্তির কারণে। বীরভূমে ফকিরডাঙায় রয়েছে মুর্শিদাবাদের মতো আত্মমগ্ন ফকিরদের বাস। সেখানে যাওয়ার আগে আমি উঠেছিলাম দুবরাজপুরের সাতকেন্দুরি। ওখানে থাকেন লিয়াকত আলি। লিয়াকত ফকির নন। শিক্ষিত। কবিতা লিখতেন। অচিন পাখি বলে একটা গানের দল ছিল ওঁর।

আমি যখন যাই গান ও কবিতার নেশা সেইভাবে নেই আর ওঁর। তিনি তখন গাঁজা টানেন, সংসার করেন আর ফকিরদের মতোই আকাশপাতাল ভাবেন। গড়গড় করে বলে দিতে পারেন ফকিরি তত্ত্ব। লিয়াকত আলির স্ত্রী ফকিরবাড়ির মেয়ে। সাতকেন্দুরি থেকে বীরভূমের ফকিরডাঙার দূরত্ব বেশি তো নয়। লিয়াকত পায়ে হেঁটে যেতেন সেখানে। গান শুনতেন মুর্শেদের। জালাল শাহের বায়েত না হয়েও একসময় তিনি ওঁর প্রধান বায়েত। জালাল শাহের পিতা দায়েম শাহ বীরভূমের মান্য ফকির। ওঁর সমাধি রয়েছে বাড়িতেই। সেখানে জালাল শাহরা থাকেন। সাধনা করেন। পিতার বায়েতদের নজরানা পান আর ফকিরি গান করে তাঁদের কোনও রকমে দিন গুজরান হয়।

এই একই ছবি ছিল গোরভাঙাতে। এখনকার শ্রী বছর পনেরো আগে আমার গোরভাঙা যাওয়ার সময় তো ছিলই না। ফকিরডাঙায় জালাল শাহের আস্তানাতে আসতে আসতেই লিয়াকত আলির ফকির জালাল শাহের ছোট মেয়ের সঙ্গে প্রেম ও বিবাহ। আমরা যাঁরা ফকিরি সাধনার ধারা নিয়ে কাজ করতে বীরভূম গেছি এতদিন তাঁরা সকলেই আগে যেতাম লিয়াকত আলির কাছে। সেখান থেকে তাঁরই তত্ত্বাবধানে শাসপুর, শোনপুর, পুরম্ব, কানাইপুর, কামতপুর, হেতিয়া – সবই লিয়াকত ভাই নিয়ে গেছেন। ওঁর ইঁট বেরোনো ঘরে চিলাকোঠায় কত সব তত্ত্ব ও তরিকা চা খেতে খেতে। আশ্চর্য এই মানুষটা অনুসন্ধিৎসুদের শুধু সাহায্য করলেন, সেইভাবে লিখলেন না কিছু। কতবার বলেছি। বলেছেন, লেখা আমার নয়। সাজিয়ে গুছিয়ে তুমি যেটা ভালো পারো সেগুলো আমি কী আর পারি রে ভাই। তবে যতটা পারি সবসময়ই সহযোগিতা করব। মারফতি পথ যাঁরা জানতে চান তুলে ধরতে চান, তাঁদের জন্য আমি আছি সবসময়ই।

এই ডিসেম্বরে যাওয়ার কথা ছিল আবার। কিছু গান জোগাড় করে দেবেন বলেছিলেন এবার। কত কত আস্তানায় যাওয়ার কথা হল আবার। বলতেন, চুপ চুপ আসবে। একা। মারফতি সাধক সকলের সামনে কিছু বলতে যে চায় না। একা এলে দেল খোলে। দেল কোরান জানা কী কত সোজা। একা তো যাব আবার ডিসেম্বরে। কিন্তু লিয়াকতহীন একা যেতে হবে এবার বীরভূম, ফকিরডাঙায়। ফকির বেহেস্ত বিশ্বাস করেন না। ফানায় বিশ্বাসী ওঁরা। ভাবতে ভালো লাগে লিয়াকত ভাই ফকিরডাঙায় সাধন তরিকায় ফানায় রয়েছেন এখন। অথচ বাস্তবে এটা সত্য তিনি প্রয়াত হয়েছেন। না কি সত্যি ফানায় বসেছেন লিয়াকত – হেরা গুহায় নাজেল কোরান উহার সন্ধান করলি না রে /সাত অক্ষরে নাজেল কোরান, হাদিসে তার ঠিকানা রে।

Developed by DXDasia