
সুকদেব এবং সব্যসাচী একসঙ্গে থাকে বিগত চার বছর ধরে। এই শহরের বুকে দু-কামড়ার ফ্ল্যাটে দিব্যি গুছিয়ে নিয়েছে তাঁদের সোনার সংসার। বেশ চলে যাচ্ছে ধীর পায়ে। সুকদেব যখন সব্যসাচীকে প্রেম প্রস্তাব দিয়েছিল সে তখন ২৫ আর সুকদেব ৩৫। তখনও এই শহর সমপ্রেমের মানে বোঝে না, বোঝে না দুই পুরুষের ভালোবাসা। তবুও মফস্সলকে বিদায় জানিয়ে এই উত্তাল শহরের বুকে তাঁরা বেঁধেছিল ঘর। শর্ত ছিল একটাই, সম্পর্কটা গোপন রাখতে হবে। সহেলী এবং সোমদত্তা দুজনেই চাকরি করে। প্রায় একই সময়ে অফিসে যায়। একে অন্যের টিফিন গুছিয়ে দেয়। আগামীকাল কে কোন পোশাক পরবে তাও ঠিক করে দেয় একে অন্যকে। সেক্টর ফাইভে অফিস হওয়ার সুবাদে নিউটাউনে এক কামড়ার ফ্ল্যাট নিয়েছে তারা। মাসে ভাড়া বারো হাজার। বিদ্যুতের খরচ আলাদা। বাড়ি থেকে জানে একটি মেয়ের সঙ্গে রুম শেয়ার করে থাকে অন্য একটি মেয়ে। কিন্তু তাঁরা একে অন্যের বুকে মাথা রেখে শান্তি পায়। খুঁজে পায় এক টুকরো সুখ। কেউ জানে না ওদের প্রেমের গল্প। ওদের বাড়িওয়ালিও না। যাপন থাকলেও ওঁদের সম্পর্কে স্বীকৃতি নেই। পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটলেও কেউ ওঁদের যুগলের স্বীকৃতি দেয় না। এই শহরের বুকে একত্রবাস করলেও সমাজের কাছে সমপ্রেমের স্বীকৃতি নেই এখানে, এখানে নেই মজলিসি মৌতাতে মাখা নেশাতুর রাত। (কলকাতায় সমপ্রেমীদের লিভ-ইন)
সমপ্রেমী যুগলদের একত্রবাসে সামাজিক স্বীকৃতির অভাব এক গভীর মানসিক সংকট তৈরি করে, যা মনোবিজ্ঞানে ‘মাইনোরিটি স্ট্রেস’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
কলকাতার বুকে একটি পুরুষ এবং নারী বিয়ে না করে একত্রবাসের সিদ্ধান্ত নিলে তাঁদের সমস্যা হয় ঘরভাড়া পেতে। উপরন্তু পাড়া প্রতিবেশিদের হাজারও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আবার অন্যদিকে সমপ্রেমী সম্পর্কের ক্ষেত্রে এইসবের বালাই নেই। তাঁদের ঘর পেতে সুবিধা হয়। কিন্তু সম্পর্কের স্বীকৃতি থাকে না। কেউ তাঁদের যুগল বলে অভিহিত করে না। তাঁরা থেকে যান এক ছন্নছাড়া দ্বীপে। যা একটা সময় মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কলকাতায় সমপ্রেমী যুগলদের একত্রবাসে সামাজিক স্বীকৃতির অভাব এক গভীর মানসিক সংকট তৈরি করে, যা মনোবিজ্ঞানে ‘মাইনোরিটি স্ট্রেস’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘সোশ্যাল ভ্যালিডেশন’—নিজের সম্পর্ক, পরিচয় ও জীবনধারাকে সমাজ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া। বিপরীত লিঙ্গের যুগলদের ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি সহজেই আসে। তারা প্রকাশ্যে নিজেদের দম্পতি বা যুগল বলে পরিচয় দিতে পারে, আইন ও সামাজিক রীতিও তাদের পাশে থাকে। কিন্তু সমপ্রেমী যুগলদের ক্ষেত্রে সম্পর্ককে প্রায়শই ‘বন্ধুত্ব’ বা ‘সহবাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তাদের ভালোবাসাকে সামাজিক চোখে অদৃশ্য করে দেয়। এই অদৃশ্যতা থেকে জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেস, যা আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস ক্ষয় করে এবং একাকীত্ব বাড়িয়ে তোলে। তাছাড়া ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—যেমন আইনগত সুরক্ষা, উত্তরাধিকার, চিকিৎসা অনুমতি বা যৌথ সম্পত্তি—এক ধরনের অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার-এর মতো প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড়ো কথা, স্বীকৃতির অভাব শুধু বাইরের জগতে নয়, সম্পর্কের ভেতরেও সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে যেন প্রতিদিন ভালোবাসা প্রমাণ করার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অথচ সেই ভালোবাসাকে সমাজ এখনও পূর্ণ মর্যাদা দিতে প্রস্তুত নয়। (কলকাতায় সমপ্রেমীদের লিভ-ইন)
সমকামী যুগলদের ক্ষেত্রে সম্পর্ককে প্রায়শই ‘বন্ধুত্ব’ বা ‘সহবাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তাদের ভালোবাসাকে সামাজিক চোখে অদৃশ্য করে দেয়। এই অদৃশ্যতা থেকে জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেস, যা আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস ক্ষয় করে এবং একাকীত্ব বাড়িয়ে তোলে।
ভারতে সমকামিতা এখন আর অপরাধ নয়। ২০১৮ সালের ‘Navtej Singh Johar’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিতে হওয়া সমলিঙ্গের সম্পর্ককে অপরাধমুক্ত ঘোষণা করে। এর ফলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতির পথ এখনও সুগম হয়নি। বর্তমানে সমলিঙ্গ যুগলরা কলকাতায় বা ভারতের অন্যত্র লিভ-ইন সম্পর্কে থাকতে পারেন এবং কিছু উচ্চ আদালত তাঁদের এই অধিকারকে সংবিধানের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবুও, সমলিঙ্গের বিবাহ, যৌথ দত্তক, উত্তরাধিকার, চিকিৎসা অনুমতি কিংবা ভিসা-সংক্রান্ত সুবিধা এসব ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে বিবাহ সমতা আনার কাজ সংসদের দায়িত্ব, আদালতের নয়, ফলে এই বিষয়ে আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত যুগলদের সম্পর্ক সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতির বাইরে থেকে যাবে। কলকাতার প্রেক্ষাপটে দেখা যায় কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সহায়তা ও আইনি পরামর্শ দিয়ে সমপ্রেমী যুগলদের শক্তি জোগাচ্ছে। তবুও পরিবারের চাপ, বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে গোপনীয়তার অভাব এবং চিকিৎসা বা জরুরি সিদ্ধান্তে সঙ্গীর অধিকার না পাওয়া—এসব কারণে সমপ্রেমী যুগলরা প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছেন। (কলকাতায় সমপ্রেমীদের লিভ-ইন)
কলকাতায় সমপ্রেমী যুগলদের একত্রবাসের বিষয়টি কেবল বাসস্থান ভাগাভাগি করার ব্যাপার নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সমপ্রেমী যুগলরা প্রায়শই পারিবারিক অস্বীকৃতি, সামাজিক কটূক্তি, এবং আইনি সুরক্ষার অভাবে ভুগে থাকেন। গবেষণায় দেখা যায়, এই সম্প্রদায়ের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপে থাকেন—উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি তাঁদের মধ্যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। ভারতে সমকামী ও অন্যান্য যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘুদের মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট আজও গভীর ও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সমকামী পুরুষদের প্রায় ৪৫ শতাংশ জীবনের কোনো এক সময়ে আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন এবং অন্তত ১৫ শতাংশ বাস্তবে চেষ্টা করেছেন যা সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বহু গুণ বেশি। একইভাবে, এই সম্প্রদায়ের প্রায় ২৯ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগেন, আর উদ্বেগের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। ট্রান্সজেন্ডার নারীদের ক্ষেত্রে এই অবস্থা আরও প্রকট, যেখানে বিষণ্ণতার হার ৪৩ থেকে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কেরালায় পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, LGBTQIA+ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৪.৩ শতাংশ গুরুতর বা অতিগুরুতর বিষণ্ণতায় এবং ৪১.৫ শতাংশ গুরুতর উদ্বেগে আক্রান্ত। অপর এক গবেষণায় পুরুষে-পুরুষে যৌন সম্পর্ক (MSM) থাকা ব্যক্তিদের ৫৩.৬ শতাংশ অন্তত একবার আত্মহত্যার চিন্তা করেছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সম্প্রদায়ের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ অন্তত একটি মানসিক বা সামাজিক সমস্যায় ভুগছেন—যেমন বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, মাদকাসক্তি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক অস্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষার অভাব মানসিক চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।
২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে বিবাহ সমতা আনার কাজ সংসদের দায়িত্ব, আদালতের নয়, ফলে এই বিষয়ে আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত যুগলদের সম্পর্ক সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতির বাইরে থেকে যাবে।
এই বাস্তবতাকে গভীর ও সংবেদনশীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’ সিনেমাটি। ছবিতে অর্ণবের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর মা কলকাতায় এসে গিয়ে আবিষ্কার করেন, তাঁর ছেলে রবি নামে এক পুরুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে যুক্ত ছিল এবং তারা একত্রবাস করত। প্রথমে মা এই সত্য মেনে নিতে অক্ষম হন। রাগ, বিস্ময় ও হতাশা তাঁর আচরণে স্পষ্ট হয়। কিন্তু রবির সঙ্গে ক্রমাগত আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, তাঁর ছেলের জীবন ও সম্পর্ক কতটা গভীর ভালোবাসা, যত্ন ও আবেগে ভরপুর ছিল। এই মানসিক যাত্রা—অস্বীকৃতি থেকে বোঝাপড়া এবং শেষমেশ গ্রহণযোগ্যতা—শুধু একটি মায়ের ব্যক্তিগত পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এটি সমাজের চোখে সমপ্রেমী ভালোবাসার স্বীকৃতি পাওয়ার এক প্রতীকী পথচিত্র। ফলে, বাস্তব কলকাতার সমপ্রেমী যুগলদের একত্রবাসের সংগ্রামের সঙ্গে ছবির প্রেক্ষাপটের মিল স্পষ্ট, যেখানে সম্পর্ক কেবল আবেগের নয়, বরং মর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষারও প্রতিফলন।
________________________
লেখায় ব্যবহৃত নামগুলি কাল্পনিক। ব্যক্তিগত কারণে তাঁদের আসল নাম ব্যবহার করা হল না। ছবি সৌজন্যে: nationalheraldindia.com

