আমার সমস্ত জুড়ে অবনত বারুদ…ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দ্য : দিব্যেন্দু পালিত

জন্মদিনে দিব্যেন্দু পালিত

“আজকের দিনটা খারাপ। সকালে দু'টো পাউরুটি আর গোটাতিনেক আধপচা পেয়ারা ভাগাভাগি করে খেয়েছে পাঁচজনে, এক প্রস্থ ভাঁড়ের চা খেয়েছে সে আর তার মা শকুন্তলা, দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে গেল। সকাল থেকে চল্লিশ পয়সার বেশি ভিক্ষে না জোটায় গুলেকে কাঁখে তুলে বাজারে তরকারি কুড়োতে গেছে মা। যাবার আগে লেকে চান করতে পাঠালো তাকে। বললো বিষ্টুদার দোকান ঘুরে যেতে৷ এ সব ধান্দা দিব্যি বোঝে পরী, শকুন্তলা তাকে রোজগারে পাঠালো। ফেরার আগে দু-পাঁচ টাকা হাতে পেয়ে গেলে ভালো হত৷ অন্তত চালটা ডালটা কেনা যেত তাতে। কিন্তু এই শুনশানের বাজারে দেবে কে টাকাটা?”

রী, শকুন্তলাদের বাজার চিরকাল এভাবে ‘শুনশান’ই থেকে যায়, আর সেকারণে চিরকালই তাদের ‘আওয়াজ’ হয়ে সমাজের কাছে এই অমোঘ প্রশ্ন তোলেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা। দিব্যেন্দু পালিতের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা ঘটেনি। ‘ভোট-ভোট’ কলরবের ভিতর তাঁর জন্মদিনে, তাঁর লেখা ছোটোগল্প ‘লোকসভা-বিধানসভা’র কথাই মনে পড়ল। সেখান থেকে আর একটু অংশ উল্লেখ করা যাক:

“ক’দিন আগে সিনেমার পোস্টার ছিঁড়তে ছিঁড়তে একটা ভোটের পোস্টারও ছিঁড়ে ফেলেছিল বাঁটুল, সঙ্গে সঙ্গে হইহই কাণ্ড, তিন-চারজন দৌড়ে এসে চড়চাপড় মারল বাঁটুলকে৷ সেই থেকে ভয়ে আর কোনও পোস্টারেই হাত দেয়নি ওরা৷ কাজকাম নেই, এখন ফুটপাথে ইটের টুকরো ছুঁড়ে ছুঁড়ে কংগ্রেস-বি জে পি- ছি পি এম-গঙ্গারাম-লোকসভা-বিধানসভা খেলে৷ তবে আজ বিকেল পাঁচটায় ভোট শেষ হয়ে যাবার পর আর কেউই পোস্টার, ঝোলানো কাগজের লম্বা দড়ি নিয়ে মাথা ঘামাবে না৷ কদিন খুব চিল্লাচিল্লি করেছে সব, মিছিল করেছে, মিটিং করেছে, ভোট ফিরি করেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে৷ রাতের দিকে বোমা-টোমাও ফাটিয়েছে দু-একটা৷ আজ সব ক্লান্ত, হাল-বেহাল, গা-ছাড়া হয়ে থাকবে৷ তখনই সুযোগ৷ বিষ্টুদা বলেছে আগে থেকেই ভোটের কাগজ কুড়নোর জন্যে তৈরি থাকতে, ইস্কুলবাড়িতে ভোটের গেট বন্ধ হলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে৷ বলেছে, ‘আশপাশের রাস্তায় যত যা আছে কুড়িয়ে বস্তা বোঝাই করবি৷ কাল নিয়ে আসবি এখানে, ওজন করে দাম দিয়ে দেব৷ লোকসভা বিধানসভা মিলিয়ে এবার তো এলাহি কাণ্ড রে! ভোটে তোদেরই বরাত খুলে গেল দেখছি!’”

কেন এই ছোটোগল্পটির কথা মনে পড়ল, তা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আর মনে পড়ল, একরাম আলিকে।

একরাম আলি দীর্ঘদিন ‘আজকাল’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বাংলা সাহিত্য-জগতের অন্যতম একজন। তাঁর সঙ্গে দিব্যেন্দু পালিতের শেষ দেখা ভূমেন্দ্র গুহ-র মেয়ের বিবাহ-অনুষ্ঠানে, প্রায় বছর দশেক আগের কথা। তাঁর কথায়, “ভূমেন্দ্র দা’র মেয়ের বিবাহ-অনুষ্ঠান হয়েছিল সল্টলেক যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের কাছে একটি হোটেলে। দিব্যেন্দুদাকে খুব কষ্ট করে সেখানে পৌঁছাতে হয়েছিল। তখন তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছে। ভা্লো করে কথা বলতে পারেন না, হাঁটতে পারেন না। দু’জনের সাহায্য নিয়ে তাঁকে লিফটে উঠতে হয়েছিল। আমিও ছিলাম সেই লিফটে। খুবই ‘প্যাথেটিক কন্ডিশন’। ভূমেন্দ্র গুহ’র সঙ্গে তাঁর লেখালেখিতে আসার প্রারম্ভিক পর্যায় থেকে আলাপ, একটা আত্মীয়তা ছিল তাঁদের মধ্যে, তাই ঐরকম শারীরিক পরিস্থিতিতেও তাঁর মেয়ের বিয়েতে এসেছিলেন।"

‘প্যাথেটিক কন্ডিশন’ বা ‘স্ট্রাগল’-এর ভিতর দিয়েই ‘দিব্যেন্দু পালিত’ হয়ে উঠেছিলেন দিব্যেন্দু পালিত। বাংলার ভাগ-বাটোয়ারাতে ‘সাফার’ও করেছিলেন। বিহারের ভাগলপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ৫ মার্চ। তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। তিনি সেই বিষয়েই এমএ করেন। ১৯৫৮ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর কলকাতায় চলে আসেন। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। “অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই যুঝেছেন তিনি। দিব্যেন্দু পালিত তখন ছাত্র, সেইসময় ভূমেন্দ্র দা’রা ‘ময়ূখ’ নামে একটা পত্রিকা করছিলেন। তখনই দিব্যেন্দুদা লেখালেখি এবং জীবনানন্দ দাশের কাছে পৌঁছেছিলেন। কেননা জীবনানন্দ দাশের জীবদ্দশায় ‘ময়ূখ’ পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা হয়, যেটা এখনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওইটাই জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে প্রথম বিশেষ সংখ্যা। দিব্যেন্দুদা’র সঙ্গে বাংলা সাহিত্য ও সাহিত্য-জগতের সূত্রপাত সেখান থেকেই। দক্ষিণ কলকাতার ‘ক্যাফে’ নামক একটি ক্যাফেতে তখন শিল্প-সাহিত্যজগতের একটা আড্ডা বসত। সলিল চৌধুরি, জ্যোতি চৌধুরি (সলিলের প্রথমা স্ত্রী), শরৎ মুখোপাধ্যায়, শক্তি-সুনীল আরও অনেকেই আসতেন। দিব্যেন্দুদা’র সে সময় চা-টা খাবারও সঙ্গতি ছিল না, তবু সেই আড্ডায় আসতেন ভালোবাসতেন বলে। সেই আড্ডায় নিয়মিত যেতে যেতে একসময় কৃত্তিবাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন দিব্যেন্দুদা, খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল, তা নয়। উনি মূলত বিজ্ঞাপন জগতের লোক ছিলেন, আনন্দবাজারে উঁচু পদে চাকরি করতেন, ‘অ্যাড ম্যানেজার’ ছিলেন। তখন আনন্দবাজারে সুনীলও ছিলেন, ফলত যোগাযোগটা ছিলই। ওঁর লেখায় উঠে আসত প্রান্তিকদের কথা, মধ্যবিত্ত সমাজের কথা, পাওয়া-না পাওয়ার কথা। কিন্ত খুবই সাবলীল ভাষায়, সকলের পড়ার পক্ষে উপযোগী। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল ‘ডিরেক্ট’। দিব্যেন্দুদা ছিলেন অন্তর্মুখী, কোনও অহং ছিল না।"

দিব্যেন্দু পালিতের লেখা পড়লেই বুঝতে পারা যাবে একরাম আলির এই কথার পরিপ্রেক্ষিত। ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক, ‘বিজ্ঞাপনের লোক’, সম্পাদক— এ সব পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাংবাদিকও। সাহিত্যিক দিব্যেন্দুর লেখায় বারেবারেই উঠে এসেছে নগর সভ্যতার কথন। মনের জটিলতা, অসহায়ত্ব, নিরুপায়তাকে ধারণ করেই দিব্যেন্দু পালিত তাঁর লেখনী এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। সেই সব নাগরিক কথন ধরা রয়েছে তাঁর ‘ঘরবাড়ি’, ‘সোনালী জীবন’, ‘ঢেউ’, ‘সহযোদ্ধা’, ‘আমরা’, ‘অনুভব’-এ। পাশাপাশি তাঁর একাধিক ছোটোগল্প বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। যেমন— ‘জেটল্যাগ’, ‘গাভাসকার’, ‘হিন্দু’, ‘জাতীয় পতাকা’, ‘ত্রাতা’, ‘ব্রাজিল’ ইত্যাদি। তিনি চলে গিয়েছেন ৩ জানুয়ারি, ২০১৯-এ। দিব্যেন্দু পালিত নিজেই নিজের হয়ে কিছু কথা লিখে রেখে গিয়েছেন, তাঁর লেখায়, একটি কবিতায়… ‘অবনত বারুদ’-এ।

"অবনত বারুদের ধাক্কা এখন আমাকে প্রতিহত করে।

নিজের মধ্যে আমি দেখতে পাই

নিজের আদল। আর পারম্পর্য রেখে

স্বস্তিহীন ঘুরতে ঘুরতে

ঘুরতে ঘুরতে

এক-একদিন চমকে উঠি।

 

এক-একদিন ঘুমের মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য

মা আমার

সদ্য চাল-ধোয়া হেসেলের হাতে

চোখের জল মুছিয়ে দেন।

 

এক-দিন স্বপ্নের মধ্যে

আমার দুই জাগরুক হাত

ক্ষিপ্র প্রতিবেশীর মত আমার কাঁধ ধরে

ঝাঁকুনি দেয়।" 

 

নিজের মধ্যে আমি দেখতে পাই

নিজের আদল। আর স্থবিরতা থেকে

ঝলসানো বিদ্যুতের মত

উঠতে-উঠতে টের পাই—

আমার সমস্ত জুড়ে অবনত বারুদ;

নিশ্বাসে দগ্ধ কার্তুজের গন্ধ, আর

ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দ্য!"

Developed by DXDasia