নব্বইয়ের বিশিষ্ট কবি পিনাকী ঠাকুরের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বাংলা সাহিত্য…
ফেসবুকের ‘ওল্ড মেমোরিজ’ মনে করিয়ে দিচ্ছে, বছর দুয়েক আগে ঠিক এমনই রোদ পড়েছিল চন্দ্রকেতুগড়ের ইটগুলোয়। এই দিনেই। আজ সেই রোদ ছুঁয়ে যাচ্ছে ওয়েলিংটনের উঁচু-উঁচু বাড়ির ছাদগুলো। চোখ পর্দা সরিয়ে উঁকি দেওয়া কোনো কিশোরীর দিকে। উঁহু, আজ নয়। সিগারেট পিষে ঢুকে যাচ্ছি অফিসে। কম্পিউটারের সামনে বসে লিখে ফেলছি খবর। ঘণ্টাখানেক আগের উপচানো চোখ কঠিন হয়ে এসেছে মেনে নেওয়ার পর।
কিন্তু মন? প্রিয় কবির মৃত্যুসংবাদ সামলাতে পেরেছে সে? যাঁর লাইন ধার করে অহংকারে মেতেছি – ‘এলুম গেলুম বাংলা যদি, আমার ভাষাও বঙ্গভাষা’, তিনি এখন শুয়ে আছেন নিথর। বন্ধু আর অনুজরা ঘিরে আছে তাঁকে। সেই স্থবিরতা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আমার কানে আলোড়িত হচ্ছে শান্ত, নিচু একটা স্বর – গলার সামান্য ওঠানামায় নাটকীয়তা বুঝিয়ে দেওয়া মানুষটি।
আমার ভয় করছে। শহরে ধাক্কা খেতে খেতে যা ঢুকে পড়ছে তোমার ভেতরেও। বলছ, ‘আমাকে গোঁসাইয়ের কাছে নিয়ে চলুন। কী জানি, যদি…’। থামিয়ে দিচ্ছি। ঠোঁটের ওপর রাখছি হাওয়ার আঙুল। বলতে নেই এসব। কিচ্ছু হবে না আর, দেখে নিও!
পিনাকী ঠাকুরের বেলাতেও তেমনই ভেবেছিলাম। তাঁর অসুস্থতার খবরে বিচলিত হলেও ভরসা ছিল – সেরে উঠবেনই। কীই বা এমন বয়স! আরও অনেক লেখা বাকি তাঁর। অনেক শেখা বাকি আমার। মাঝপথে থেমে যাওয়া তো অন্যায়! কিন্তু সেটাই হল। যাঁর কবিতা পড়তে পড়তে শিখেছি ছন্দের নিখুঁত ব্যবহার, অনুসরণ করে হাত পাকিয়েছি, ধাতস্থ হওয়ার সময়কালে তাঁর চলে যাওয়া কি উচিৎ হল? যে-ক’বার কবিতা পাঠ করেছি তাঁর সামনে, যে পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই-সেই পত্রিকায় যখন লিখেছি, তিনি খেয়াল করেছেন? তাঁর মিশে থাকা? মনে আছে তাঁর?
সাক্ষাতে কখনও জিজ্ঞেস করিনি। ভালোলাগা ছাড়া কিছুই জানাতে পারিনি সাক্ষাতে। প্রিয় কবির সামনে দাঁড়িয়ে যেন বোবায় পেত আমায়। লক্ষ্য করতাম শুধু তাঁর কথা, কবিতাপাঠ, আর চোখে ভাসত ছাপার অক্ষরে একের পর এক পঙক্তি।
মনে পড়ছে বছর পাঁচেক আগের এক সন্ধে। কলেজ স্ট্রিট থেকে হেঁটে ফিরছি শিয়ালদায়। বিদ্যাপতি সেতুর মুখে, হাওড়াগামী এক বাস। আর, সেই বাসে দ্রুত পা চালিয়ে উঠে গেলেন নীল চেকশার্ট আর কাঁধে ঝোলাব্যাগ হাতে একজন। বসার জায়গাও পেয়ে গেলেন। কী নির্লিপ্ত মুখ তাঁর। বাস চলে গেল। আমার তখন হতচকিত দশা। সেটা এমনই একটা বয়স, যখন কবিদের সর্বশক্তিমান ভাবতাম। ভাবতাম, যিনি কবিতা লেখেন, তিনি এই পৃথিবীর রাজা। সাহিত্যজগতেও যে ক্ষমতা ও পেশির লড়াই-ই কথা বলে, তা খেয়াল করার মন বা বয়স কোনোটাই হয়নি তখন। আমি অবাক হয়ে সেই সন্ধেয় ভাবছিলাম, পিনাকী ঠাকুরের মতো একজন কবি এত সাধারণভাবে বাসে উঠে চলে গেলেন, এত লোকের সামনে দিয়ে, কেউ চিনতে পারল না! চারপাশের প্রতি ধিক্কার জেগেছিল সেদিন।
তারপর, ডুবে-ভেসে-ডুবে-ভেসে-ডুবে এটুকু বুঝেছি, চিনতে পারা বা না-পারা দিয়ে কবিতার বিচার হয় না। কবিতা শুধুমাত্র সেই পাঠকের জন্য, যে পড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে যে। পিনাকী ঠাকুর তাঁদের কবি। হ্যাঁ, উনি অনেকের তুলনায় জনপ্রিয়। কিন্তু অসম্ভব একাকীও তিনি। যে একাকিত্ব তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য। চশমার আড়ালে ঈষৎ-ঘোলা ওই চোখদুটোকে জানতে চাইছি আমি। একই সঙ্গে রেকর্ড ও এডিট করত যে-চোখ, কবিতার রূপ দিত তারপর।
তাঁর কবিতাকে কোনোদিনই গম্ভীর মনে হয়নি আমার। হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছন্দের চলন দায়ী। এবং বিষয়-নির্বাচনও। কঠিনকেও কেমন লঘু ও তাজা করে দিতে পারতেন শব্দে-শব্দে। চারপাশের মুখভারী কবিতাগুচ্ছের মধ্যে একঝলক মিচকি হাসি যেন পিনাকী ঠাকুরের কবিতা। যেখানে বিষণ্নতা আছে, বিষাদ নেই। দুঃখ আনে না, বরং উদাস করে দেয় মন। সে-উদাসীনতার মধ্যেও কিন্তু স্মৃতির ভার নেই, ছুঁয়ে যাওয়া আছে। নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো খানিক। মনে পড়ে যাওয়া সদ্য-যৌবনের পাগলামি। একমুঠো মফঃস্বলীয় খুনসুটি ছুঁড়ে দেওয়া। ভেতরে-ভেতরে এমনই ছটফটে কবি ছিলেন কি তিনি? স্বভাবে নয়, ছন্দে প্রকাশ করতেন সেই ছটফটানি? ব্যক্তিগত ও সামাজিক অনেক প্রতিকূলতার পরেও, এই যে চার-পাঁচ-ছয় মাত্রার পর্বে লিখে গেছেন অসংখ্য কবিতা, এটাই কি তাঁর মুক্তির জানলা? শরীর তো আগুনকে দিয়েই দিয়েছেন, কবিতায় নিশ্চয়ই উত্তর পাব, পিনাকীদা?
নইলে বলবেন। আমার থেকে যার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম আপনার নেশা, কখনও জিজ্ঞেস করলে, আপনার মতোই পালিয়ে যাব কিনা!
“ঝগড়া ব্যাপক, মুখ দেখা নেই, বন্ধ কথা, বিদ্যুৎ ও জল
বন্ধ করে, ঝুলিয়ে রাখে সদর কোর্টে মামলা ভারী!
সাবান কাচার রোদ ওঠে না, হপ্তাভোর এক নাগাড় বৃষ্টি,
আমার সবুজ ছিটের জামা হা-কুচ ময়লা, শিশির নিচে
দু’চার ফোঁটা সেন্ট রয়েছে, ঢালব নাকি উপুড় ক’রে?
তুমি আমায় ঘেন্না করলে রোদ ওঠে না, বর্ষা থামাও–
না হয় আদুর গায়েই যাব তোমার কাছে, সূর্যমুখী!”