৫৮ বছর ধরে সাফল্যের নজির সৃষ্টি করে এগিয়ে চলেছে দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ১৯

"….নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”

মদম কিশোর ভারতী হাই স্কুলে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রদের ক্লাসরুম একেবারে হাতে গোনা। এই সমস্যা যেমন আছে তেমনই এই স্কুলকে নিয়ে, স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে গর্ব করার কারণও আছে। আর সেটা বোঝাতেই কথায় কথায় রজনীকান্ত সেনের স্বাধীনতার ‘সুখ’ কবিতার এই পংক্তিটি আওড়ে নিলেন দমদম কিশোর ভারতী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিন্টু সরকার। এই বছর তাঁর স্কুলের দুই ছাত্র রুদ্রনীল ঘোষ এবং প্রত্যুষ চট্টোপাধ্যায় মাধ্যমিক পরীক্ষায় নবম ও দশম স্থান লাভ করেছে। তাই, স্কুলের প্রধান শিক্ষকের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করাটাই স্বাভাবিক।

“এই কৃতিত্ব রুদ্রনীল আর প্রত্যুষের। আমরা সহযোগিতা করেছি মাত্র।” কথাটা বলার সময় প্রধান শিক্ষকের গলায় আত্মবিশ্বাসের সুর ধরা পড়ছিল।

অন্যদিকে, রুদ্রনীল ও প্রত্যুষের গলায় ধরা পড়লো একই সুর, “আমাদের নামের পাশে ৬৮৪ ও ৬৮৩ নম্বর দুটো বসেছে মাত্র। এর সবটাই আমাদের দাদা, দিদিদের কৃতিত্ব। তাঁরা একাধারে আমাদের শিক্ষক, বন্ধু ও আত্মীয়। আমাদের সাফল্য যদি আমাদের স্কুলের প্রতি মানুষের দৃষ্টি নিক্ষেপের সহায়ক হয়, সেটাই আমাদের গর্ব। প্রাথমিক স্তর থেকেই এই স্কুলে পড়ছি। উচ্চমাধ্যমিকও আমরা এই স্কুল থেকেই দেবো।” 

রুদ্রনীল ঘোষ এবং প্রত্যুষ চট্টোপাধ্যায়

রুদ্রনীল এবার রাজ্যের মধ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষায় নবম হয়েছে আর প্রত্যুষ দশম। দুজনেই দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুলে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে বিজ্ঞান নিয়ে। ওদের দুজনেরই ইচ্ছে, পদার্থবিদ্যা বা রসায়নবিদ্যা নিয়ে উচ্চস্তরে গবেষণা করার। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চাইতে ওদের আগ্রহ শিক্ষকতায়। আর এই আগ্রহ জন্মেছে ওদের স্কুলের দাদা, দিদিদের দেখে। ওরাও চায় ভাবিষ্যতে স্কুল বা কলেজে শিক্ষকতা করে একই ভাবে অন্য ছাত্রছাত্রীদের দাদা, দিদি হয়ে উঠতে।

এতক্ষণ যেটা বলা হয়নি, আসলে দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুলের ছাত্ররা তাদের শিক্ষক, শিক্ষিকাদের দাদা, দিদি বলেই ডাকে, প্রথম থেকে স্কুলের রেওয়াজ এটাই।

 স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ

এই স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র, ১৯৮০ সালে এই স্কুলেরই শিক্ষক হয়ে চাকরিতে যোগদান এবং অবশেষে টিচার-ইন-চার্জ হয়ে ২০১৯ সালে অবসর নিয়েছেন পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই স্কুলের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। এখনও ১৬ জানুয়ারি, স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবসের দিন, বৃক্ষরোপণের দিন, স্কুলে আসার জন্য প্রাণ ছটফট করে তাঁর। সমস্ত অনুষ্ঠানে তাঁকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানায় স্কুলও। স্কুল সৃষ্টির ইতিহাস প্রসঙ্গে পঙ্কজবাবু ‘বঙ্গদর্শন.কম’-কে বলছিলেন, ”১৯৬৫ সালের ১৬ জানুয়ারি আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়। আজকের যে ভবন, সেটা তখন ছিল না। এখানে একটা টাইপ স্কুল সকালে চলত। সকাল ন’টায় টাইপ স্কুল শেষ হলে ওই ঘরেই স্কুল বসত। তারপর এই ঘরটা এক সময় ভাড়া নেওয়া হল। শেষ পর্যন্ত আট-এর দশকে ওই ঘরটা কিনে নেওয়া হল স্কুলের নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য। মিহির সেনগুপ্ত, শিবব্রত মুখেপাধ্যায়, তপন দেব সহ মোট ১৩ জন মিলে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০০ সালে স্কুলে উচ্চমাধ্যমিক চালু হল। ইতিমধ্যে ১৯৭৮ সালে স্কুলটি গভর্নমেন্ট এডেড স্কুলে পরিণত হয়। এখন স্কুলের দু’টো ভবন পাশাপাশি। একটি পাঁচতলা একটি চারতলা, তবে চতুর্থ তলাটি টিনের ছাদ দিয়ে ঢাকা।”

এছাড়াও স্কুলের সাম্প্রতিক সাফল্য প্র্সঙ্গে পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়  বলেন, “আমাদের স্কুলের ফল বরাবরই ভালো হয়। এমনও কিছু বছর গেছে যখন মাধ্যমিকে কেউ দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেনি। তবে মাধ্যমিকে নবম ও দশম হওয়ার এই বিরাট সাফল্য এবারই প্রথম। এর আগে ২০১৭ সালে আমাদের স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিকে সুপ্রকাশ পাল নামের এক ছাত্র সপ্তম হয়েছিল।”

এই স্কুলের অন্য একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ১৬ জানুযারি স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবসে, স্কুলের উদ্যোগেই রক্তদান শিবির করা। এই বছর রক্তদান শিবির ৫০ বছরে পা রাখল বলে জানালেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিন্টু সরকার। তাঁর কথায় জানা গেল, প্রতি বছর কমপক্ষে ৪০ জন রক্তদান করে। এরা সবাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র এবং অভিভাবক। রক্তদানের জন্য বহু সংখ্যক প্রাক্তন ছাত্র, অভিভাবক নাম নথিভূক্ত করেন।

বিষয়টি উল্লেখ করে পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় গর্বিত ভাবে বললেন, “ভারতে কিশোর ভারতীই প্রথম স্কুল, যেখানে স্কুলের উদ্যোগে রক্তদান শিবির শুরু হয়। আর এই রক্তদান শিবিরে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা ও অভিভাবকরাই এখনও রক্ত দেয়। এক সময় পর্বত আরোহনেও আমাদের স্কুল সাফল্য পেয়েছে, সেটা ১৯৮৭ ও ১৯৮৯ সালে।”

রক্তদান শিবির

স্কুলের নামকরণ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ”আমাদের স্কুলের পাশে ‘শিশু ভারতী’ নামে একটা প্রাথমিক স্কুল ছিল। আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম মিহির সেনগুপ্ত, তিনি শিশু ভারতীতেই চাকরি করতেন। বন্ধু বিনায়ক চক্রবর্তীকে তিনিই  বলেছিলেন, শিশুর পরেই তো কিশোর, তাই স্কুলের নামটা কিশোর ভারতী হলে কেমন হয়? সবাই মেনে নিলেন।”

দমদম কিশোর ভারতী স্কুলে স্থানাভাব প্রথম থেকেই। তবে এখন ১২টা ক্লাসরুম। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস এখানেই হয়। এখন ছাত্র সংখ্যা ৮০০ অতিক্রম করেছে। বহু ছাত্রকে স্থানাভাবে ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয় না বলে জানান, প্রধান শিক্ষক। তবে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার কোনও ঘাটতি নেই। বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ভালো ও অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি আছে। আরও দু'টো ছোট ঘর আছে, ওই দু’টো ঘর সংস্কার করে ক্লাসরুমে পরিণত করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন পিণ্টুবাবু। “আমরা আমাদের মতো করে স্কুলটাকে সাজিয়ে নিয়েছি। জায়গা কম হলেও আমরা এই ভবনে ভালো আছি। আমাদের জন্যে এই স্কুল ভবনটি সৌভাগ্যের দ্যোতক বলতে পারেন।”

রুদ্রনীল ও প্রত্যুষের লক্ষ্য, উচ্চমাধ্যমিকেও তাঁরা প্রথম দশে থেকে স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করবে। রুদ্রনীল এবং প্রত্যুষের এই ইচ্ছে পূরণের জন্য স্কুলের দাদা, দিদিদের সহযোগিতা আছে এবং থাকবে বলে জানান স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পাশাপাশি রুদ্রনীলের বাবা ও মা অরুণাভ ঘোষ এবং শম্পা ঘোষ আর প্রত্যুষের বাবা ও মা প্রনব কুমার চট্টোপাধ্যায় ও দোলা চট্টোপাধ্যায়ও জানান, সন্তানদের ইচ্ছে বাস্তবায়নের পথে কোনও প্রতিবন্ধকতা যাতে না আসে, সেই চেষ্টা করবেন তাঁরা।

তবে, রুদ্রনীলের আক্ষেপ, খেলার জন্য ওদেরকে মতিঝিল কলেজের মাঠে যেতে হয়। ওই কলেজ কর্তৃপক্ষ অনুগ্রহ করে মাঠ দিলে তবেই খেলাধূলা হয়। ওর ইচ্ছে স্কুলের নিজস্ব একটা মাঠ থাকবে, পরবর্তীতে যা নিজেদের মাঠ হিসাবেই ব্যবহার করতে পারবে ছাত্ররা।

রুদ্রনীল ও প্রত্যুষ, দুজনেই এখন একাদশ শ্রেণির ছাত্র। কোভিডের আগের বছর স্কুলের এক্সকার্শনে নরেন্দ্রপুর চিন্তামনি কর অভায়ারণ্যে আসা, সেখানে দাদা, দিদি, বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ, অভয়ারণ্যের নানান গাছের বৈজ্ঞানিক নাম জানার স্মৃতি এখনও সজীব ওদের মনে। পড়াশোনার পাশাপাশি শৈল্পিক নানা বিষয়েও আগ্রহ আছে তাদের। রুদ্রনীল বলছিল, “স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ও নাটক করেছি।” প্রত্যুষ বলছিল, “আমি কয়েকবার গান করেছি।” ওরা চাইছে, দমদম তথা বাংলায় ওদের স্কুল যে উচ্চতায় পৌঁছেছে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে।

___________________________________________
তথ্যসূত্র : 
পিন্টু সরকার, প্রধান শিক্ষক, দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল
পঙ্কজ ভট্টাচার্য, প্রাক্তন টিচার-ইন-চার্জ, দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল
রুদ্রনীল ঘোষ, মাধ্যমিকে নবম স্থান প্রাপ্ত ছাত্র, দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল
প্রত্যুষ চট্টোপাধ্যায়,  মাধ্যমিকে দশম স্থান প্রাপ্ত ছাত্র, দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল

ছবি: পিন্টু সরকার, প্রধান শিক্ষক, দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল
রুদ্রনীল ঘোষ, মাধ্যমিকে নবম স্থান প্রাপ্ত ছাত্র, দমদম কিশোর ভারতী হাইস্কুল

*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।           

Developed by DXDasia