এমনটাই অভিজ্ঞতা বীরভূমের শিল্পীদের
বাউল শিল্পীরা তাঁদের সঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করেন। রাজ্যের বীরভূম জেলার কাঁথা স্টিচ শিল্পীরা সেই বাউল শিল্পীদের কথা স্মরণ করে পোশাকেও নিয়ে আসছেন তার ছোঁয়া। তাঁদের হাতে তৈরি বাউল শাড়ি, বাউল চাদর, কামিজ, কুর্তি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাউল শিল্পীরা বাদে অন্য সাধারণ মানুষও বাউলের পোশাক গ্রহণ করছেন। দুশো টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে সেগুলি। বীরভূম জেলার নানুর থেকে আসা কাঁথা স্টিচ শিল্পীরা অন্তত তেমন কথাই জানাচ্ছেন।

শিলিগুড়ি বিশ্ব বাংলা শিল্পী হাটে চলছে হস্তশিল্পীদের হাট। সেখানেই এসেছেন বীরভূম জেলার নানুরের কাঁথা স্টিচ শিল্পীরা। তাঁরাই জানালেন, কাঁথা স্টিচের বিভিন্ন কাজ তাঁরা করে আসছেন বছরের পর বছর ধরে। এই হাতের কাজ তাঁদের ঐতিহ্য। আর তার সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে বাউলের কাজ। বাউল শিল্পীরা ঐ এলাকায় আছেন। সেখানকার বাউল বিখ্যাত। সেখানে বাউলের হাটও বসে। বাউল শিল্পীরা যেসব পোশাক পরেন, তা অনুসরণ করে ‘বাউল পোশাক’ নাম দিয়েই কাঁথা স্টিচের কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। কাঁথা স্টিচ শিল্পী আনোয়ারা বেগম এবং তাঁর স্বামী শেখ ইজাই-এর কথায়, উত্তরবঙ্গে এসেও তাঁরা দেখলেন বাউলের পোশাকের কদর বেশ ভালো। মানুষ এই ধরনের হাতের কাজ ভালোই নিচ্ছেন।
আরও পড়ুন
আবেদ চিত্রকর-দের আজকাল

আসলে তাঁরা ধরে রেখেছেন বীরভূম জেলার ঐতিহ্যময় কাঁথা স্টিচ শিল্প। আনোয়ারার অধীনেই ১৮০ জন মহিলা নানুরের গ্রামে কাঁথা স্টিচের কাজ শিখে আজ স্বনির্ভর হচ্ছেন। এভাবে ঐ এলাকার গোটা গ্রামে দুই হাজারেরও বেশি মহিলা এই হাতের কাজ করছেন। থান কাপড় বা ঐ জাতীয় কাপড় কিনে এনে তার ওপর বিশেষ পদ্ধতিতে সুঁচের সাহায্যে সেলাই করছেন। প্রথমে কাগজে বিভিন্ন ডিজাইন করা হয়। তারপর সুঁচ সুতো দিয়ে মেশিনের সাহায্যে বিভিন্ন ছবি ফুটিয়ে তোলা। ছবি বা ডিজাইনে আছে পাখি, জবা ফুল, পদ্ম, সূর্যমুখী ফুল। শাড়ি থেকে শুরু করে বেডশিট, স্টুল, চুড়িদার সহ আরও অনেক কাজ আছে কাঁথা স্টিচের। সেগুলোর দাম একশ টাকা থেকে শুরু করে সাত-আট হাজার পর্যন্ত রয়েছে। আনোয়ারা দেবী জানালেন, তাঁদের গ্রামে অনেক পরিবারেরই দশ পনের বছর আগে দুই বেলা খাবার জুটত না। এখন তাঁরা ভালো আছেন। বিয়ের পর তাঁদের গ্রামে অনেক মহিলা শ্বশুরবাড়ি গিয়ে পণের টাকা দিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন একসময়। এখন কাঁথা স্টিচের কাজ তাঁদের ঘরে সুখ নিয়ে এসেছে। বহু মহিলা সংসারের কাজ সামলে কাঁথা স্টিচের কাজের মাধ্যমে অর্থ সঞ্চয় অনেক মা তাঁর মেয়ের বিয়ের টাকা যোগাড় করে ফেলছেন শুধু এই হস্তশিল্পের মাধ্যমে।

কাঁথা স্টিচ একধরনের এমব্রয়ডারি। এর মধ্যে নকশি কাঁথা, পদ্ম কাঁথা, উল্টো কাঁথা প্রভৃতি রয়েছে। বীরভূম জেলার বিশেষ কাঁথা স্টিচের সুনাম রয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেই এর কাজ হয়। তবে বীরভূমের আলাদা নাম রয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়া দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই বীরভূমের কাঁথা স্টিচের চাহিদা বাড়ছে। তার সঙ্গে বাউলের পোশাক তো আছেই। তাই শিলিগুড়ি শিল্পী হাটে এর চাহিদা অন্যরকম। শিল্পী হাটের ম্যানেজার সুদীপব্রত মজুমদার জানালেন, তাঁদের হাট ১৯ মার্চ সোমবার শেষ হচ্ছে। এরপর আবার ২২ মার্চ থেকে আরেকটি হাট শুরু হবে। তা চলবে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত। তারপর পঞ্চায়েত ভোট ও বর্ষার কারণে এই হাট বন্ধ থাকার কথা। এরপর পুজোর ঠিক আগে আবার তা শুরু হবে। তবে এই হাটে সব হস্তশিল্পের চাহিদাই ভালো। বীরভূমের কাঁথা স্টিচের চাহিদাও সেখানে একটি বাড়তি জায়গা করে নিয়েছে।