পুতুলের মধ্যে বিকাশ ভট্টাচার্য দেখেছিলেন নকশাল আন্দোলনের সময়কার বাঙালি জীবনের ছবি
সেটা সত্তরের দশক। কলকাতায় নয়া দেওয়াল লিখন ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’। কলেজ স্ট্রিট পাড়ার বসন্ত কেবিনে দু’কাপ চায়ের সঙ্গে একটি খালিকাপ চাইতে গেলে নির্দেশের তারিকা ‘দু’কাপ চা আর একটা সিদ্ধার্থ দাও’। মনুমেন্ট ময়দানে চারু মজুমদার কিংবা কানু স্যানালদের রোজের রোজ বিদ্রোহ ঘোষণা। কলকাতার মানুষ বুঝেছিল এ এক নয়া অস্ত্র হাতে বিপ্লবের পন্থা। পূজোর সময় আনন্দবাজারে খবর হল বোমার আওয়াজে কুমোরটুলির শিল্পীর হাত কেঁপে গিয়েছে। সেটা কলকাতার এমনই এক দশক যখন বহু তরুণের বালিশের তলায় ঝমঝম করে উপস্থিত রয়েছে মাওয়ের ‘লাল বই।’ বহু তরুণ তখন চূড়ান্ত গোপনে চিলে কোঠায় বসে ধরতে চেষ্টা করে চীনা রেডিওর শব্দ তরঙ্গ।
এই রকমই একটা সময় আধুনিক বাংলার শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবিতে হঠাৎই একটি পুতুল হেঁটে চলে বেড়াতে লাগলো। তাঁর দু’চোখের মধ্যে অনেক কিছুর খোঁজ। উত্তর কলকাতার অন্ধকার রাস্তায় কি যেন খুঁজে বেড়ায় সে। কিংবা নিজের সঙ্গী সাথী জুটিয়ে নিয়ে পড়তে চেষ্টা করে লাল রং-য়ে লেখা মহাকরণ দখলের দেওয়াল লিখন। আবার এমনও দেখা যায়, যিশু খ্রিষ্টের মত দু’হাত তুলে কালো অন্ধকারে আটটা-নটার লাল সূর্যকে সাক্ষী রেখে চোরাবালির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে পুতুল। পুতুলের এমন নড়া-চড়া বাংলার ছবিতে বিরল। আমরা যুগে যুগেই দেখেছি শিল্পী যখন ছবির ভাষা খোঁজে তখন সে পুরাণ কাব্যের কাহিনির দিকে ফিরে তাকায়। ফিরে তাকায় নিজের চারপাশের সময় সীমার দিকে। আবার নিজের চারপাশের সময় সীমাকে নিজের অজান্তেই পর্যবেক্ষণ করে চলে শিল্পীর মানস চেতন। হঠাৎই সেই মানস চেতন কোনও একটি সূত্র পেয়ে বেরিয়ে আসতে চায় ছবির ভাষা হয়ে। সমকালের বাংলায় এমনই ঘটনা ঘটেছিল শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের জীবনে।
বাড়ির পাশের ছোট্ট মেয়ে হঠাৎই তার জীর্ণ পুতুল নিয়ে হাজির হল শিল্পীর কাছে। ছোট্ট মেয়ের আবদার পুতুলটিকে একটু রং করে মেরামত করে দিতে হবে। শিল্পী তার আবদার রেখেছিলেন। একটু সময় নিয়েছিলেন ছোট্ট মেয়েটির কাছ থেকে। তার পর ক্রমাগত পুতুলটি দেখতে দেখতে হঠাৎই তাঁর মনে হয়েছিল যে এই পুতুলটিই যেন কালের হাতে এক মানুষ, যে কখনও সুতোয় নাচে আবার অন্ধকারেও নিমজ্জিত হয়।
সেইদিন এই পুতুলের মধ্যে বিকাশ ভট্টাচার্য দেখেছিলেন নকশাল আন্দোলনের সময়কার বাঙালি জীবনের ছবি। পুতুল যেন বলতে চায় কী এক অজানা রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার চোরাবালিতে বাঙালি নিমজ্জিত হতে চলেছে। কখনও পুতুল নিজেই অন্ধকার রাস্তায় খুঁজে বেড়ায় বাঙালি মায়ের মত আপন সন্তানের লাশ।
আবার ইতিহাস ও রাজনীতির তত্ত্ব কথার বইয়ের টেবিলের যে ড্রয়ার সেটি খুলে পুতুল নিজেই যেন দেখতে চেষ্টা করছে তরুণের কাঙ্ক্ষিত আগ্নেয়াস্ত্রটি আছে কি নেই। এমন ভাবেই একটি পুতুলের মধ্যে বাংলার নকশাল আন্দোলনের সময়কার বাঙালি জীবনের নানাকথাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য। তৈরি হল ‘ডল সিরিজ’। পুতুল যেখানে অসহায় বাঙালির প্রতিচ্ছবি। পুতুল যেখানে অসহায় দর্শক।
ছবি সূত্র- ক্লোজ টু ইভেন্টস। মনসিজ মজুমদার। নিয়োগী বুকস।