
তন্ময় ভট্টাচার্য সম্পাদিত এই সংকলনটি ১৯৪৭ থেকে ২০২১, দীর্ঘ একটা সময়কে একত্র করেছে
‘ধুত্তর! খালি দেশ আর দেশ…আর ভাগাভাগি।’ কারা এভাবে নিজেদের ভাবমূর্তি ব্যক্ত করে থাকেন জানি না, তবে দেশভাগ সংক্রান্ত কোনোকিছুই কখনও যে ‘থোড় বড়ি খাড়া’-র পর্যায়ে পড়ে না, এই বোধ তাঁদের নেই বললেই চলে। তন্ময় ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘দেশভাগ এবং …’ বইটিও তাঁদের জন্য নয়। এই বই দেশভাগ সম্পর্কিত গান ও কবিতার সংকলন। শুধু সংকলন বললে ঠিক বলা হয় না, যেমনটা আমি শিরোনামে লিখেছি—‘এক ঐতিহাসিক সংকলন’। এই বইতে সংকলিত হয়েছে তিন শতাধিক কবির পাঁচ শতাধিক কবিতার সঙ্গে চল্লিশটিরও বেশি গান, সাত দশক পরেও যা প্রকাশ্যে আনে কাঁটাতারের মর্মাঘাত। এই আঘাত চিরজীবী, তাতে প্রলেপ পড়েনি আজও। সুবিধাবাদীরা ইচ্ছানুযায়ী এই প্রলেপহীন ক্ষতে পরিমাণ মতো সোডিয়াম ক্লোরাইড ঢেলে তা জাগ্রত করে রেখেছে।
এই অমর যন্ত্রণাই জন্ম দিয়েছে সংস্কৃতির মণি-মুক্ত-জহরত। সে দিন যাঁরা ভিটেমাটি ছেড়ে এ পারে চলে এসেছিলেন, শুধুমাত্র তাঁরাই আজীবন কষ্টচারা বুকের গভীরে পুঁতে রাখেননি, সেই চারা ডালপালা ছড়িয়েছে উত্তর প্রজন্মেও। ভাঙা দেশ, ভগ্নহৃদয়ের উত্তরাধিকার তাঁদের মধ্যেও। সাত দশক পরেও সেই একই কাঁটাতারের জ্বালা। যে জ্বালায় প্রাণ পেয়েছে শচীনকর্তার গান, হেমাঙ্গসংগীত, ঋত্বিকের ছবি, জীবনানন্দের কবিতা, ফুটবল, লোকগল্প, প্রবচন-উচ্চারণ। এইসব মিলেমিশে যে বাঙালি সত্তার নির্মাণ, তার খাঁজে-ভাঁজে ১৯৪৭। স্বাধীনতার, দেশভাগেরও।
আরও পড়ুন: দেশ অথবা মনভাগের একটি আখ্যান
১৯৪৭ থেকে ২০২১। দীর্ঘ একটা সময় – পঁচাত্তর বছর। প্রসারিত এই সময়ের ভিতর আজও স্থির হয়ে আছে ভাগাভাগির দিনগুলি। কারো শরীরে, কারোর স্মৃতিতে, কারোর চেতনে, কারো অবচেতনে। সেইসব দিনগুলি একটি অদ্রবীভূত কঠিন অশ্রুবিন্দু হয়ে বছরের পর বছর জমে থাকে, যা বাঁধ ভাঙে অনুভূতিসাগরে – কখনও তা গান, কখনও কবিতা, কখনও অন্য কিছু হয়ে প্রবাহিত হয়ে চলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ভিতর, উত্তরাধিকারে। সেই প্রক্রিয়াই যতটা সম্ভব ‘দেশভাগ এবং…’-এ নথিবদ্ধ করেছেন তন্ময় এবং সেকারণেই বইটি ঐতিহাসিক, শুধুমাত্র দেশভাগ সম্বন্ধীয় কতগুলো কবিতা আর গানের অভিজ্ঞান নয়। বাংলাভাষায় এর আগেও দেশভাগ নিয়ে কবিতা বা গানের সংকলন হয়েছে তবে, এক্ষেত্রে ‘দেশভাগ এবং…’ আলাদা করে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে নিজ গুণে।
তন্ময় বলেন, “বলাই বাহুল্য, কবিতার মতো এই অংশেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে বহু গান। হয়তো কালের গর্ভে হারিয়েই গেছে। এই তো, এই সংকলনেও সেকালের বেশ-কিছু গান আছে, যেগুলো লোকসংগীতের অন্তর্গত। কোথাও-না-কোথাও সংকলিত হয়ে বেঁচে আছে বলেই উদ্ধার করতে পেরেছি আমরা।”
এই বই খণ্ডন করে সেইসব তত্ত্বকে, যেখানে বিশ্বাস করা হয়, যাঁরা দেশভাগের প্রত্যক্ষ সাক্ষী নন, তাঁদের কবিতাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনাই উচিত নয়। কেন-না, তাঁরা সেই সময় ও তার যন্ত্রনা অনুভব করেননি। পরোক্ষ স্মৃতি দিয়ে আর-যাই হোক, কবিতা হয় না। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে যাঁদের জন্ম বা দেশভাগের সঙ্গে বংশানুক্রমিক বা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, তাঁরা এই বিষয়ে কবিতা লেখার অধিকারী নন কিংবা দেশভাগ তাঁদের চেতনাকে প্রভাবিত করতে পারে না – এ-ধারণাকে অসম্পূর্ণ মেনেই এই সংকলন গড়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, প্রবীণ-প্রখ্যাতদের সঙ্গে এই সংকলনে রাখা হয়ে নবীন-তথাকথিত ‘অখ্যাত’দের কবিতা-গান। সংকলনের কবিতাগুলি সাজানো হয়েছে কবির জন্মসাল অনুযায়ী। তবে, এক্ষেত্রেও একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। তরুণতম কবি থেকে প্রবীণতমে— অর্থাৎ জন্মসালের বিপরীত ক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে কবিতাগুলি। এই বইতে স্পষ্টতই, তরুণ প্রজন্মকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন সম্পাদক। এই সংকলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘আমার মন কান্দেরে পদ্মার চরের লাইগ্যা’, অন্নদাশংকর রায়ের ‘এপার থেকে ওপার বহু দূর’, ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘বুকটা দুফালি করে’, মৃদুল দাশগুপ্তের ‘একজন ভারতীয় নিগ্রোর কবিতা’ পাশাপাশি পাওয়া যাবে তরুণ লেখক অরিত্র সান্যালের ‘অন্ধকাল’, শাশ্বতী সান্যালের ‘নামহীন’, সুমন সাধুর ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ গন্ধ’, ‘হঠাৎ ঝড়ের চিঠি’।
এই সংকলনে কবিতার তুলনায় গানের সংখ্যা অনেকটাই কম। তার কারণ দেশভাগের পরবর্তী ৭৫ বছর ধরে বিভিন্ন অনুষঙ্গে কবিতা যেমন ঘুরেফিরে জন্ম নিয়েছে, গানের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। মোটামুটি এক দশকের মধ্যেই কমে আসে গানের পরিমাণ। সাধারণত এই ধরনের গান, যা বাস্তব ঘটনার প্রতিফলন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতেই জন্ম নেয়। তারপর, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় বিষয়ান্তরে। ফলে, দেশভাগের এক দশকের মধ্যে কমে এসেছিল গানের পরিমাণ। অবশ্য তার পরেও জন্ম নেওয়া বেশ-কিছু গান, সংকলিত হয়েছে এই বইতে। তন্ময় বলেন, “বলাই বাহুল্য, কবিতার মতো এই অংশেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে বহু গান। হয়তো কালের গর্ভে হারিয়েই গেছে। এই তো, এই সংকলনেও সেকালের বেশ-কিছু গান আছে, যেগুলো লোকসংগীতের অন্তর্গত। কোথাও-না-কোথাও সংকলিত হয়ে বেঁচে আছে বলেই উদ্ধার করতে পেরেছি আমরা। না-জানি কত লোকসংগীতের হদিশই পাওয়া যায় না আর। সেই আফশোস কহতব্য নয়। …এই অংশে, গানের প্রথম পঙক্তি দিয়েই সাজানো হয়েছে সূচিপত্র। কেননা, অনেক গানেরই গীতিকারের হদিশ পাওয়া যায় না। ফলে নাম দিয়ে সাজানো সম্ভব ছিল না। তারপরেও, পশ্চিমবাংলার পাঠকদের কাছে গানের বিভাগটি নতুন এক অভিজ্ঞতা তো বটেই!” আমার মতে তন্ময়ের শেষের কথাটি তাঁর সমগ্র কাজটির প্রতিনিধিত্ব করছে। এই বইয়ের আরও একটি আকর্ষণ হল ‘দেশভাগের অব্যবহিত পরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাবলি’ বিভাগটি। সম্পাদনা করতে গিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর খামতি অথবা প্রাপ্তি সবটাই বইয়ের শুরুতে সুবিন্যস্ত বয়ানে প্রকাশ করেছেন সম্পাদক।
এত বড়ো মাপের একটা কাজ, কিছু অসম্পূর্ণতা তো থেকেই যায় তা বলে, সম্পাদক এবং এই কাজের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকেই সংকলনটির নেপথ্যে যে শ্রম দিয়েছেন তা মিথ্যে হয়ে যায় না বরং প্রতিভাত হয় নতুন চিন্তনে কাজ করার আগ্রহ।

এত বড়ো মাপের একটা কাজ, কিছু অসম্পূর্ণতা তো থেকেই যায় তা বলে, সম্পাদক এবং এই কাজের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকেই সংকলনটির নেপথ্যে যে শ্রম দিয়েছেন তা মিথ্যে হয়ে যায় না বরং প্রতিভাত হয় নতুন চিন্তনে কাজ করার আগ্রহ। ‘দেশভাগ এবং…’ সংকলনের একটি চমৎকার মুখবন্ধ লিখে দিয়েছেন সব্যসাচী দেব। আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়ার পরিশেষে ধরে রাখলাম তাঁর যথাযথ বিশ্লেষণটি। মুখবন্ধের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, “দেশভাগের কবিতা নয়, এ আসলে দেশ হারানোর কবিতা, বিচ্ছিন্নতার বেদনার কবিতা, সেই সঙ্গে স্মৃতি খুঁড়ে দেশ খুঁজে বার করারও কবিতা। গানের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। ভূগোল পালটায়, ইতিহাসও, কিন্তু স্মৃতির ভিতরে আঁকা মানচিত্র পালটাবে কে যে! সেই মানচিত্রই বারবার এঁকে যায় কবিতা, গান। এই সংকলনে ধরা রইল তেমনই অসংখ্য নজির। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছ যে অনুভূতি। কখনও সরাসরি, কখনো-বা ইঙ্গিতে। সামগ্রিকতার মধ্যেও সেই বেদনারই খোঁজ। সময় পালটায়, অনুভূতি ফিকে হয়, হারায় না কোনওদিন…”।
__________________
‘দেশভাগ এবং…’
সংকলন ও সম্পাদনা – তন্ময় ভট্টাচার্য
প্রকাশক – সৃষ্টিসুখ
প্রকাশের তারিখ – ২৩ জুলাই, ২০২২
প্রচ্ছদ – আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
