
উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ছিল তাঁর নাড়ির টান
দেবেশ রায়কে বলা হয় ‘লেখকদের লেখক’। বাংলা গদ্যকে ভেঙেচুরে পাশ্চাত্য রীতির থেকে মুক্তি খুঁজেছেন তিনি। আধুনিক বাংলা গদ্যের সূত্রপাত হয়েছিল পাশ্চাত্যের প্রভাবে। পরবর্তীকালের সাহিত্যিকরাও সেই পশ্চিমি ধাঁচের গদ্য নিয়েই কাজ করে চলেছেন। দেবেশ রায় ছিলেন অন্য পথের পথিক। তিনি চেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের নিজস্ব দেশীয় ধারাকে শক্তিশালী করতে। তাঁর লেখায় তাই প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রভাব খুব বেশি।
এখনকার বাংলাদেশের পাবনা জেলার বাগমারা গ্রামে দেবেশ রায়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৩৬ সালে। ৭ বছর বয়সে তিনি পরিবারের সঙ্গে জলপাইগুড়ি চলে আসেন। সেখানেই স্কুল এবং কলেজ জীবন কেটেছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। অল্প বয়সেই মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়েছিলেন দেবেশ রায়। কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে গ্রেপ্তার হন ১৯৫০ সালে, মাত্র ১৪ বছর বয়সে। জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়। সক্রিয় ছিলেন ট্রেড ইউনিয়নেও।
ছোটোবেলা থেকেই দেবেশ রায় লেখালিখি করতেন। কলেজে পড়ার সময়ে তাঁর লেখা ‘হাড়কাটা’ গল্প প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকায়। তখন থেকেই জাত সাহিত্যিককে চিনে নিয়েছিল পাঠকমহল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘যযাতি’। ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’, ‘মফস্বলী বৃত্তান্ত’ ‘মানুষ খুন করে কেন’, ‘সময় অসময়ের বৃত্তান্ত’ প্রভৃতি উপন্যাস পাঠকের সামনে এক নতুন জগতের দরজা খুলে দিয়েছিল। বেশ কিছু কালজয়ী ছোটোগল্পও তিনি লিখেছেন। তাঁর সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রাম। ‘উত্তরবাংলা’, ‘উত্তরদেশ’, ‘পরিচয়’, ‘পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্ট’(ইংরেজি) ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব সামলেছেন। ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসটির জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন ১৯৯০ সালে। প্রবন্ধ সাহিত্যেও তিনি ভিন্নতার ছাপ রেখেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক সাহিত্যে কলকাতামুখী একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তার উল্টো পথে হাঁটার সাহস দেখিয়েছিলেন দেবেশ রায়। উত্তরবঙ্গের স্বরকে তিনি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে’ উপন্যাসে আমরা দেখি জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ কাটাপুকুর-বেলাকোবা অঞ্চলের জীবনযাত্রা। ‘মফস্বলী বৃত্তান্ত’-এ উঠে এসেছে জলপাইগুড়ির দ্বারিকামারী গ্রামের প্রসঙ্গ। ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ কিংবা ‘তিস্তাপুরাণ’-এও তিনি বলেছেন উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি এবং মানুষের কথা। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি অলিগলি তিনি চিনতেন। কলকাতার শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও বঙ্গভূমির উত্তর অংশেই ছিল তাঁর নাড়ির টান।
বৃহস্পতিবার রাতে অন্য ভুবনে যাত্রা করলেন দেবেশ রায়। তাঁর প্রয়াণে বাংলা গদ্য সাহিত্যের একটা অধ্যায় সমাপ্ত হল।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার – অভীক মজুমদার, কর্ণ দাস।
