গ্রিসের মহান দার্শনিক সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের কারণ ও অন্যান্য
আবদুল্লাহ্ আল মেহেদী
এথেন্সের তিনজন খ্যাতিমান পুরুষ সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। অভিযোগকারীরা ছিলেন মেলেটাস, লাইকন ও এনিটাস। মেলেটাস ছিলেন মধ্যম শ্রেণির কবি, লাইকন ছিলেন বক্তা ও এনিটাস একজন গণতান্ত্রিক নেতা। এনিটাসকে সক্রেটিস একসময় বলেছিলেন, তিনি যেন তার ছেলেকে তখনই সৈনিকবৃত্তিতে নিয়োগ না করিয়ে আরও কিছু লেখাপড়া শেখান। কিন্তু এনিটাস তা শোনেননি। ফলে কিছু দিন পর যখন ছেলেটা মাতাল এবং দুশ্চরিত্র হয়ে যায়, তখন তিনি সক্রেটিসের ওপরই আরও চটে যান।
সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযোগ আনা হয়। তবে তার মধ্যে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনটি। সেগুলো হলো দেশের প্রচলিত দেবতাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন। নতুন নতুন দেবতার প্রবর্তন করার চেষ্টা ও যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে তাদের বিপথে চালিত করছেন।
সক্রেটিস অধার্মিক বা নাস্তিক ছিলেন না তা খুবই স্পষ্ট। এথেন্সের প্রচলিত দেবদেবীকে তিনি কেন, এথেন্সের কোনো শিক্ষিত ব্যক্তিই পৌরাণিক দেবদেবীর গল্প বিশ্বাস করতেন বলে মনে হয় না। নতুন দেবদেবী প্রবর্তনের অভিযোগটাও ফাঁকা। কারণ এই অভিযোগ যখন উঠতে পারত তখন তা ওঠেনি। সক্রেটিসের বিচারের বাইশ বছর আগে এ্যারিস্টোফেনিস তার দক্লাউডসদ (ঈষড়ঁফং) ব্যাঙ্গাত্মক নাটকে দেখিয়েছেন যে, সক্রেটিস ঘোষণা করছেন দেবতা জিউস সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন। তার জায়গায় ‘ঘূর্ণিবার্তা’ এসেছেন। সক্রেটিসের এইরকম চরিত্র আঁকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
আর তরুণদের তিনি শিক্ষা দিয়ে বিপথে নিচ্ছেন। এটিও ভিত্তিহীন অভিযোগ। বোঝাই যায় সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, তার একটিরও কোনো ভিত্তি ছিল না। সেগুলোর একটিও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বার্নেটের মতে, ‘অভিযোগগুলির মানে যে কি তা কেউ জানতো না। এমন কি অভিযোগকারীরা নিজেরাও জানতো বলে মনে হয় না।’
আসলে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছাড়া আর কিছু নয়। সক্রেটিসের বেশ কিছু শিষ্য ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ পরবর্তীকালে অভিজাত দল নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। সন্দেহ নেই যে, তার শিষ্যদের কর্মকাণ্ডের জন্য সক্রেটিস মোটেও দায়ী ছিলেন না। তবে তিনি সে সময়ের এথেনীয় গণতন্ত্রের একজন কড়া সমালোচক ছিলেন। তার তীব্র সমালোচনা থেকে এথেনীয় নেতা পেরিক্লিস থেকে শুরু করে কেউ রেহাই পাননি।
তিনি যেহেতু নিজেকে অপরাধী মনে করতেন না, তাই তার আচরণ ছিল স্বভাবসুলভ অনমনীয়। তিনি শাস্তির পরিবর্তে পুরস্কারের প্রস্তাব করেন! উদ্বেগহীন সক্রেটিস প্রস্তাব করলেন, প্রাইটেনিয়াম হলে (পাবলিক হল) তাকে নিয়ে যেন বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়, প্রথাগতভাবে যা করা হতো গ্রিসের বীরদের জন্য। তাতে জুরিরা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁরা মনে করলেন, সক্রেটিস এই বিচারকে প্রহসন মনে করছে ও তাদের উপস্থিতির সম্মান দিচ্ছে না। ফলে উচ্চারিত হলো, মৃত্যুদণ্ড! প্রথমে তার বিরুদ্ধে জুরি ছিলেন ২৮০ জন ও স্বপক্ষে ছিলেন ২২০ জন। তার ওই উত্তর শুনে বিরুদ্ধে হয়ে গেল ৩৩০ জন।
মৃত্যুদণ্ড বা শাস্তি নিয়ে সক্রেটিসের উদাসীনতার এখানেই শেষ নয়। শিষ্য আর বন্ধুরা চেয়েছিলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ডের আগ পর্যন্ত জেলে আটকে না রেখে জামিনে যেন মুক্তি দেওয়া হয়। তখন এ প্রথাও ছিল। সক্রেটিস জামিন হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন এক দিনা (রৌপ্যমুদ্রা)। তাঁর বন্ধুরা তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত দায়িত্বে তিরিশ দিনা দিতে চাইলেন। কিন্তু সে প্রার্থনাও নামঞ্জুর হয়েছিল। বিচারের প্রায় এক মাস পর মৃত্যু হয় সক্রেটিসের, এ–সময় তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন।
মৃত্যুর দিন সন্ধ্যাবেলায় সক্রেটিস তার শিশুপুত্র মিনেজেনাসকে বলেন, ‘তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।’ অত্যন্ত হাসিখুশি ও শান্ত দেখাচ্ছিল সক্রেটিসকে। তাঁকে ঘিরে বসে আছেন তাঁর ভক্ত, শিষ্য ও বন্ধুরা। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই তাঁদের গুরুকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। সাক্ষী হতে হবে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর। শিষ্যরা সবাই হতাশা আর আসন্ন বিচ্ছেদের বেদনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তবে সক্রেটিসের মধ্যে সে বিকার নেই। তিনি নিজের মৃত্যুর পরের পোশাক গোছানো নিয়ে ব্যস্ত। তিনি পরে নিচ্ছেন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পোশাক, কারণ তিনি চান না মৃত্যুর পর কেউ তাঁর গায়ে হাত দিক। শিষ্য আর বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু সময় আলাদা হয়ে পরিবারের সবার সাথে কথা বলে নেন তিনি।
আরও পড়ুন
রমা রঁল্যা-র ৬টি অবিস্মরণীয় উক্তি
জেল কর্মকর্তা খানিক আগে বিদায় জানিয়ে গেলেন। তাঁর দুই চোখ ছিল অশ্রুতে পূর্ণ। তিনি বলে যান, সক্রেটিস ছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতায় শ্রেষ্ঠ আসামী। সবচেয়ে ভদ্র আর অসম্ভব সাহসী। কিছুক্ষণ পরই হেমলকের রসে পূর্ণ পাত্র নিয়ে প্রবেশ করে জল্লাদ। তীব্র বিষ এই হেমলক হৃৎপিণ্ডে গিয়ে পৌঁছে নিমেষেই শরীরকে অসাড় করে দেয়। জল্লাদ নিরাবেগ কণ্ঠে বলল, ‘এই পাত্রের এক ফোঁটা হেমলকও যেন বাইরে না পড়ে! সবটুকু পান করতে হবে!’ সক্রেটিস জল্লাদকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললেন, ‘একটি ফোঁটাও নষ্ট হবে না।’ তারপর তিনি কিছুক্ষণ প্রার্থনা করলেন। রুদ্ধ নিঃশ্বাসে সবাই তাকিয়ে আছে সক্রেটিসের উদ্বেগহীন শান্ত মুখটির দিকে। মানসিকভাবে সবাই অস্থির, একমাত্র সক্রেটিস ছাড়া।
প্রার্থনা শেষ করে বিষের পাত্র তুলে নিলেন সত্তর বছরের সক্রেটিস। এক নিঃশ্বাসে পান করলেন সবটুকু হেমলক রস। বিকৃত মুখভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়, কেউ বিষ পান করছে। কিন্তু সক্রেটিসকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। তাঁর মুখ বিন্দুমাত্র বিকৃত হয়নি। জলপানের মতো পান করেছিলেন তিক্ত বিষ। উপস্থিত সবাই উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে লাগলেন। একজন শিষ্য মৃগীরোগীর মতো কাতরাচ্ছিলেন।
পাষণ্ড জল্লাদ এবার দিল তার নিষ্ঠুরতম নির্দেশটি। বিষপানের পর এবার সক্রেটিসকে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করার নির্দেশ দেন জল্লাদ। এতে বিষটুকু ভালোভাবে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। শিউরে ওঠে শিষ্যরা না না ধ্বনিতে মুখর করে তুলল জেলকক্ষটি। ভাবলেশহীন সক্রেটিস তা–ই করলেন। নিজের জীবনের বিনিময়েও তিনি জল্লাদের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা দিতে চান। তিনি উঠে পায়চারি করতে লাগলেন। এক সময় নিস্তেজ হয়ে এলো তার পা দুটি।
যে লোকটি সক্রেটিসের হাতে বিষ তুলে দিয়েছিল, সে তাঁর পায়ের পাতায় চিমটি কাটে। সক্রেটিস সে চিমটি অনুভব করতে পারেননি। তাঁর দেহ বেয়ে অবশতা নেমে আসে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। নিজের হাতেই মুখ ঢেকে শুয়ে পড়লেন তিনি। এবার সবাই শান্ত, একটি শব্দও নেই কারও মুখে। কিছুক্ষণ সবই নিশ্চুপ, শান্ত ।
মৃত্যুর পূর্বে তাঁর বলা শেষ বাক্য ছিল, ‘ক্রিটো, অ্যাসক্লেপিয়াস আমাদের কাছে একটি মোরগ পায়, তার ঋণ পরিশোধ করতে ভুলো না যেন।’ অ্যাসক্লেপিয়াস হচ্ছে গ্রিকদের আরোগ্য লাভের দেবতা। সক্রেটিসের শেষ কথা থেকে বোঝা যায়, তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন মৃত্যু হলো আরোগ্য ও দেহ থেকে আত্মার মুক্তি। তিনি মৃত্যুর আগে একটি কথা বলেছিলেন, তারা আমার দেহকে হত্যা করতে পারবে কিন্তু আমার আত্মাকে নয়।
(ঋণ – ‘সমালোচক’ ব্লগজিন)