বিদায় নে মা ভগবতী

ভৈরবীর তার সপ্তকে আগুনের ছেঁকা লাগে বধূর হৃদে। পোড়ে আর জ্বালা ধরে। তাই নীলকণ্ঠ ডানায় ঝাঁপোট দেয়

‘নবমী’ দৌড়ে দৌড়ে আসে। তার তর সয় না। বারো মাসে কেবল চারটে দিন এমন কথায় তার সায় নেই। সে বোঝে কেবল শিব-সোহাগীরে জটাধারীর ঘরে নিয়ে যাওয়ার ভেঁপু বাজানোর কথা। সে আসে নিশি ধরে। নবমী নিশি মানে তাই মায়ের চক্ষু বয়ে যায় আর মেয়ের চোখে তো লঙ্কা বাঁটা। দশমী আসে ঝুপ করে। মেয়ে আমার এলো আবার গেলও গিয়ে। এলো ঘর আলো করে আর গেল- আঁধার নামিয়ে। চাঁদ কপালি সাধে বলে। দেখ না- চালচিত্তিরের দশা। বউয়ের জন্য কপাল পোড়ে আর তানপুরো নিয়ে কেবল ভৈরবী গায়। আর সেই ভৈরবীর তার সপ্তকে আগুনের ছেঁকা লাগে বধূর হৃদে। পোড়ে আর জ্বালা ধরে। তাই নীলকণ্ঠ ডানায় ঝাঁপোট দেয়।

শিব তানপুরোয় ভৈরবীর তান তুলেছে, চালচিত্তিরের পট

রিক্তাদাসী বলেছিলো ‘জামাই পাগল মেয়েও পাগল, শশুড় পাগল শাশুড়িও পাগল, এখন বাকি আছে পাড়ার লোকের ধরতে পাগলে, শেষ কালে এক পাগলা জামাই জুটলো কপালে।’ সে কথা  মিছে নয়। দক্ষকন্যার আদরে যাতে পান থেকে চুন না খসে তার পাগল করা আয়োজন।  দেউরিতে আলো পড়েছে। খসা পলেস্তোরায় পড়েছে চুন রঙের পোঁচ। দেওয়াল গিরির গেল দিনের কালি মাখা মিঠে কাঁচ চকচকে হয়েছে। মেকাবী ক্লকে দম দিয়েছে ঘড়িবাবু।

ভোলানাথ লয়ে যায় বউ সঙ্গে করে

ওদিকে চণ্ডীমণ্ডপে এক মেটে দো মেটে শেষ করে তবে উমার চোখ দিয়েছে পাল মশাই। উমা বাপের ঘর দেখেছে। আর বাপের বাড়ির চৌহুদ্দিতে উমার ভরা সংসারে আম আঁটির ভেঁপুর জয় গান। তাঁর পর নবমীর নিশি। বড়কর্তা বন্দুকের নলে তেল করে। বিদায় ক্ষণে গার্ড অব্‌ অনার দিতে হবে তো। এই ক’দিন আগেও ওপাড়ার টগর বৌষ্টমী রাধা-কৃষ্ণ এর কের্ত্তন করত। শুক-সারি নিয়েই ছিল তাঁর যত কারবার। আজ হঠাৎ দেখ না ওঁর অন্ধ দোসর নিমাই বৈরাগী ভাঙা হারমোনিয়ামে হাঁপর দিয়ে গাইছে ‘নবমী নিশি গো তুমি আর যেন পোহায়েও না’ …। মণ্ডপের ঢাকির হাতের শিরা ফুলেছে। দু’কাঠি বলছে ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ। পঞ্জিকা গণনা দিয়েছে বটে কিন্তু বাপের হাতের কড়ি গোনায় বড়ই কষ্ট। ঘণ্টার হিসেব এক থেকে দুয়ে ওঠে না।

বিদায় নে মা ভগবতী

যতক্ষণ পারি মনে ধরি আগল দিয়ে। তাই বরণ ডালা তেলসিঁদুর খেলা খেলা মোয়া নাড়ুর মুখ ছোঁয়া শুরু হল। অসুরের মুখেও পড়লো সন্দেশের ঢেলা। ‘মিষ্টি পান গালে বুলিয়ে দিই মাগো। আর একটু সবুর কর। সব ভুলবি সিদ্ধি দেব। পান-সুপুরি রাখি প্রাণের আকুতি টুকু দিয়ে।’ বড় ঘরে খিল আঁটা। মেনকার বুক ভাঙা কান্না গঙ্গা হয়ে যায়। ইংরেজি বাজনা শব্দ তুলেছে ‘মাগো তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ভরে’। কাপ্তেন মাস্টার গাল ফুলিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিল। মনে মনে সে বুঝতে পারে গড্‌ স্যেভ্‌ দ্য কুইন বাজানোর দম ফুরিয়ে যায়নি তাঁর। বাড়ির ঝি-বউরা চোখ বড় বড় করে দেখে দর্পণে শরৎ শশী। দূরে চড়ক ঢাঙায় সানাই বাজে। বুক খাঁ খাঁ করে বুড়ো হোসেন মিয়াঁ বাজিয়ে চলে ‘বিদায় নে মা ভগবতী’।

মেয়ে চলে গেল ঘরে আঁধার নামিয়ে

ছবি সূত্র- জোড়াসাঁকো রামচন্দ্র ভবন, হাটখোলা দত্ত বাড়ি, দ্বারিকা ভবন,
কলুটোলা ধর বাড়ি, ঠন ঠনে চন্দ্রবাড়ি

Post Tags
Developed by DXDasia