বাঙালি সমাজে নাচকে নতুনভাবে বুনে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ
ছেলেদের নাচ তার বেশ কিছুদিন আগেই শুরু হয়ে গেছে আশ্রমে। ১৯১৯ সালের কথা। ঠিক একশো বছর আগের। শারদোৎসব নাটকের সেবার তৃতীয় অভিনয়। নাটকে বালকদের দলে যোগ দিয়েছেন শিশু শান্তিদেব ঘোষ। আর ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়’ আর ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’ গানে তাল ঠুকে নেচে বাহবা কুড়োচ্ছেন দর্শকদের। শান্তিনিকেতনে নৃত্যচর্চার সেটা প্রথম যুগ।
এর আগেও শারদোৎসব অভিনয়ের সময় দিনেন্দ্রনাথের পরিচালনায় বালকদল গানের সঙ্গে নাচ করেছিল। কিন্তু সে নাচ ধ্রুপদী ছিল না। গান চিত্রকলার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ নৃত্যচর্চাকেও রাখতে চেয়েছিলেন চিরকাল। কিন্তু প্রথমে নাচ শেখার বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি। অথচ, নাটকে বিভিন্ন গানে অভিনয়ের সময় নাচের প্রয়োজন পড়ত। নাচ হতও। তবে তা প্রথাগত নাচ নয়। রীতিমতো শিখে-পড়ে সে নাচ হত না। যেমন ‘অচলায়তন’, ‘ফাল্গুনী’, ‘ডাকঘর’ নাটকে নাচের প্রয়োজনে অভিনেতারা নিজেদের ইচ্ছেমতোই হাতপা নাড়িয়েই নাকি নাচ করেছিলেন। তারা প্রত্যেকেই বালক অথবা পুরুষ চরিত্র। ১৯১৪ সালে ‘ফাল্গুনী’ নাটকে অন্ধ বাউলের চরিত্রটি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে নাচতে হয়েছিল তাঁকেও। ১৯২০ সালে আগরতলা থেকে একজন নৃত্যশিক্ষককে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁর নাম ছিল বুদ্ধিমন্ত সিংহ। তিনি ছোটো ছেলেদের নাচের তালিম দিতেন। কিন্তু নাটকের ক্ষেত্রে নাচ ছিল মূলত, তাল বজায় রেখে স্বেচ্ছায় হাতপা সঞ্চালন।
এরপর, ১৯২৪ সালে বিশ্বভারতীতে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন বোম্বাই থেকে আসা একজন পার্সি। নাম- জাহাঙ্গির ভকিল। তাঁর স্ত্রীয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতা হয় প্রতিমাদেবীর। সেই আলাপচারিতাতেই বেরিয়ে আসে, ভকিল-পত্নী গুজরাটি গরবা নাচে পারদর্শী। প্রতিমাদেবী তখন তাঁকে অনুরোধ করেন, ছাত্রীদের গরবা শেখাতে। তাতে রাজিও হন তিনি। এই গরবা নাচের মধ্যে দিয়েই শান্তিনিকেতনে মেয়েদের নৃত্যশিক্ষার সূত্রপাত। প্রথম যুগের সেই ছাত্রীদের দলে ছিলেন নন্দলাল বসুর কন্যা গৌরী দেবী ও যমুনা দেবী, ক্ষিতিমোহন সেনের কন্যা অমিতা সেন, রবীন্দ্রনাথের নাতনি নন্দিতা দেবী এবং বিদ্যালয়ের আরেক ছাত্রী লতিকা রায়।
জোরকদমে চলতে থাকে গরবা নাচের শিক্ষা। আর তারপর ১৯২৫ সালে বর্ষামঙ্গল উৎসবে ঠিক হয়, ‘শেষবর্ষণ’ নাটক অভিনীত হবে। গানবহুল নাটক। ভকিল-পত্নীর পরিচালনায় নাটকটিতে রবীন্দ্রনাথের গানে দলবদ্ধভাবে ছাত্রীরা নাচতে থাকে। অভিনয়ধর্মী নাচ না হওয়া সত্ত্বেও সেই নৃত্য সকলের নজর কাড়ে। তারপরেই প্রতিমাদেবীর উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে এলেন মেয়েদের নৃত্যশিক্ষার গুরুমশাই। রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখলেন ত্রিপুরার মহারাজাকে। তিনি নবকুমার সিংহকে একজন মৃদঙ্গবাদকসহ পাঠিয়ে দিলেন শান্তিনিকেতনে। সেটা ১৯২৫ সাল। তারপরই নটীর পূজা রূপ পেল রবীন্দ্রনাথের কলমে। ১৯২৭ সালে জানুয়ারি মাসে কলকাতায় নৃত্যসহযোগে অভিনীত হল সেই নাটক। নাচল ছাত্রীরা।
ছাত্রীদের সেই নাচ শিল্পের জগতে এক নতুন দিশার জন্ম দিয়েছিল সেদিন। ঔপনিবেশিকতার নিগড়ে বাঁধা শিক্ষাব্যবস্থায় নাচের কোনো স্থান ছিল না। আর সমাজ তখন এমনি সংকুচিত যে, মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে মেয়েদের নাচকে ঘৃণার চোখেই দেখা হত। শিল্পের পর্যায়ে তো নৈব নৈব চ। অথচ সুপ্রাচীন কাল থেকে নাচ ভারতীয় জীবনের গভীরে প্রোথিত। বিভিন্ন সামাজিক উৎসবে দলবদ্ধভাবে মেয়েরা নাচত৷ ছেলেদেরও পৃথক নাচ ছিল। আধুনিক কালে অনাদৃত সেই শিল্পটিকে ফের ফিরিয়ে আনলেন রবীন্দ্রনাথ। তাকে নতুন আঙ্গিক দিলেন। স্বদেশ ভাবনার এও এক অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। শিক্ষাকে কীভাবে ঔপনিবেশিক বেড়াজালের বাইরে গিয়ে দেশীয় করে তোলা যায়, এ তারই গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ঋণ: ‘জীবনের ধ্রুবতারা’, শান্তিদেব ঘোষ