ফিল্ডে আছেন দাদা

গ্যালারিতে বসে থাকা অজস্র দর্শকের করতালির মধ্যে একজনই তো সৌরভ

ঠিক যেন মঙ্গলকাব্য থেকে উঠে আসা একজন মানুষ। যাকে দেবতা রূপে পুজো করার কাহিনি কথিত থাকলেও, খুব সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের পরিবারের একজন হয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আবার তিনিই যেন পাশের বাড়ির সেই ছেলেটি, পাড়ার ম্যাচে রোববারের দুপুরবেলায় ছক্কা হাঁকিয়ে চেঁচাতে পারেন ‘গাঙ্গুলি গাঙ্গুলি…’। সৌরভ গাঙ্গুলি। নিছক কোনও নাম নয়। যাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখা যায়, বাঁ হাতে ক্রিকেট ছোঁয়া যায় আবার পাড়ার রকে বসে চায়ের কাপে তুফান তোলা যায় যে-কোনো তর্কে। সচিন নাকি সৌরভ? বাঙালির তর্কে গা না ভাসিয়ে যুগ যুগ ধরে বাংলার সম্পদ ও বাঙালির ঐতিহ্য একা কাঁধে তুলে নিয়েছেন। আবার যে ছেলেটি খেলা পাগল নয়, বিশ্বকাপ ছাড়া সাধারণ টেস্ট ম্যাচ জীবনেও দ্যাখেনি, তাকে দিয়ে দু-চার কথা লিখিয়েও নেন। আজও মনে পড়ে ভাইরাল হওয়া সেই ছবি। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি তখনও পেরোইনি। ম্যাচে জিতে ইন্ডিয়ান জার্সি ওড়াচ্ছেন সৌরভ, মুখে প্রকট হাসির রেখা। যুবক বেলায় এসেও সেই ছবি যিনি আজও ভোলাতে পারেননি, তিনি দেবতা ছাড়া আর কী! শৈশব, সাদা-কালো টিভি, বাড়িতে একদল ইন্ডিয়া সমর্থকের উপচে পড়া ভিড়, অক্ষরে অক্ষরে স্মরণে আছে। আজও অনায়াসে ফিরে যাওয়া যায় ছেলেবেলায়। বাবার মুখে “ইন্ডিয়ার ওই তো গাঙ্গুলি, উফফ কী ভালো খেলে ছেলেটা! পাগল করে দেয়।” আমার মতো বাবাও কি ভুলতে পেরেছে? স্মৃতি আসলে কখনও মোছে না, অভিজ্ঞতাও না। ‘দাদাগিরি’ দেখানোর সময় চলে যায়নি, যাওয়ার কথাও নয়। বাংলা টেলিভিশনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সৌরভ বলছেন, “আমি ফিল্ড থেকে সরিনি। আজও ফিল্ডেই আছি।”

হ্যাঁ, দাদা ফিল্ড থেকে সরেছেন বটে! তবে সে তো খেলার– প্রফেশনাল ফিল্ড। আর এতদিনের পরিশ্রম! ম্যাচ প্র্যাকটিস! তোলপাড় করা! নিজেকে সরিয়ে নেওয়া যায়? মনের মধ্যে একটু একটু করে আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের স্বপ্নের ওই ফিল্ডটা প্রৌঢ়ত্ব এসে গেলেও ছাড়তে পারি না। রোজ স্বপ্ন দেখি, নতুনদের মধ্যে। বেহালাবাসী এই বাঙালিই একদিন প্রতিটা ঘরের বিষয় হয়ে উঠলেন। গল্পের বিষয়। গল্পের নায়ক তিনি। ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশ্বের ফিল্ডে। আনমনে বলে উঠছেন “মাঠে দেখা হবে”। সৌরভ গাঙ্গুলিকে নিয়ে লিখতে বসে তথ্য ঘাঁটতে ঘাঁটতে এল কলকাতার ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের বার্ষিক সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যের কয়েক টুকরো। সৌরভ বলছেন, “আমার কাছে নেতৃত্ব মানে দলের সবার মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টি করা। তোমরা আগামী দিনে বড় বড় করপোরেশনের সিইও হবে, হয়তো রাজনীতিবিদ হবে বা অনেক বড় কিছু করবে। কিন্তু জীবনের যে ক্ষেত্রেই বলো না কেন, একজন ভালো নেতা হতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলে আস্থা। যাদের নিয়ে কাজ করবে, যাদের দিয়ে কাজ করাবে, তারা সবাই যাতে তোমার ওপর নির্দ্বিধায় আস্থা রাখতে পারে। তুমি মুখে অনেক কিছু বলতে পারো, অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজের সময় অন্য কিছু করার চেষ্টা করতে পারো। কিন্তু মনে রাখবে, এভাবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলতে পারে, কিন্তু সারা জীবন এভাবে তুমি কাউকে ভুলিয়ে রাখতে পারবে না। দিনের শেষে সবাই ঠিকই বুঝে যাবে, কী ঘটছে। মানুষকে বেশিদিন বোকা বানানো যায় না।”

অসম্ভব তিনি। এই বক্তৃতা শুধু ওই ছাত্রদের মনেই নয়, সারা বিশ্বে সঞ্চারিত হয়। ২০০০ সাল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতের অধিনায়ক হিসাবে ঘোষিত হবেন। তখন দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হয়েছিল। দলের জন্য সময়টা ভালো যাচ্ছিল না, অনেক গুজব ভাসছিল চারদিকে। সে অবস্থা থেকে ভারতীয় দলকে টেনে তুলে এনেছেন। তিনিই বলছেন, “দেখা যেত আমার বেশির ভাগ সময় চলে যাচ্ছে খেলোয়াড় আর কোচের মধ্যে ঝামেলা মেটাতে আর দলের সবার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে। এমনকি তাদের ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সংকটের সময়েও আমাকে গিয়ে পাশে দাঁড়াতে হয়েছে। এসব কিছু করার অবসরে আমি প্র্যাকটিস করার সুযোগ পেতাম। যত যা-ই হোক, খেলায় রান তো করতে হবে!”

ই একটি কথা—‘খেলায় রান তো করতে হবে।’ গোটা দেশ সেসময় যে আস্থা রেখেছিল, আজও তা অব্যাহত আছে। প্রাক্তনী হিসাবে নয়, টিমের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে একটা সৌরভ খেলাটাকে দেখেন দূর থেকে। গ্যালারিতে বসে থাকা অজস্র দর্শকের করতালির মধ্যে আছেন তিনি। ফিল্ডে আছেন। বাঁ হাতের ক্রিকেটে আছেন। উড়ন্ত জার্সিতেও। রোববারের শান্ত পাড়ার মধ্যেও কোনও এক গাঙ্গুলি ছক্কা মারছে, হেরে গেলে পরের দিনে ভালো খেলার স্বপ্ন দেখছে। ওই ছেলেগুলোর মধ্যেও তো সৌরভ আছেন। জন্মদিনের আগে, তাঁকে শ্রদ্ধা। 

Developed by DXDasia