
সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে একটা ক্ষত-বিক্ষত হারমোনিয়ামের ছবি দেখে দুদিন আগে হঠাৎ থমকে গেলাম। তার আগে অবধি কিছুই জানতাম না। অন্যান্য ছবি ও পোস্ট দেখে তবে বুঝলাম কী ঘটনা। তারপর থেকে ঐ ক্ষত-বিক্ষত হারমোনিয়াম ও ভাঙা তবলার ছবিটা আরও অনেকের মতোই আমারও পিছু ছাড়ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের ছায়ানট ও উদীচীতে ঘটে যাওয়া হামলায় নষ্ট হয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের দেহাবশেষের প্রতীকী ভূত তাড়া করছে আমায়। এই আমি কে? হতে পারি আমি একজন বাঙালি। হতে পারি আমি একজন বাংলাদেশি। কিন্তু আমি সেই অখণ্ড বাঙালিয়ানার শরিক, একসময় যে জাতির ঘরে ঘরে আর কিছু থাকুক না থাকুক একখানা হারমোনিয়াম ও তবলার ঠিক জায়গা হয়ে যেত শত অভাবেও। কবে ক্রমে তাতে ধুলো পড়তে শুরু করলো, কেন— সে অন্য এক আলোচনার বিষয়। তবে তাতেও প্রাণ জুড়ালো না। এখন জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ ওই দুটি বাদ্যযন্ত্রকে ভেঙে দুমড়ে মুচড়েও দিতে হলো মৌলবাদী প্রণোদনায়? তবে কিনা ওদেশের বাউল-ফকির সমাজ এই লাঞ্ছনার শিকার হয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। এই লেখা যখন লিখছি তখনও বাউল আবুল সরকার ধর্ম অবমাননার দায়ে বন্দি আছেন জেলে, গণপ্রহারে অর্ধমৃত দীপু দাসকে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে জীবন্ত, ঐ একই দায়ে।

ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু পুরোনো হারমোনিয়াম
যে জাতির মাতৃভাষার মর্যাদারক্ষার লড়াইয়ের সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের উদযাপন, সেই জাতিই আজ নতুন পরিচিতির আচ্ছাদনের খোঁজে মরিয়া হয়েছে। মরিয়া হয়েছে তার পূর্ব-অর্জিত আত্মপরিচয়কে ত্যাগ করতে। যে পরিচয় মূলত সংস্কৃতি ও ভাষানির্ভর, আজকের মতো ধর্ম ও মৌলবাদ-নিয়ন্ত্রিত নয়।
অথচ গানবাজনা যে শরা-বিরোধী নয় তার স্বপক্ষে শাহ আলম ফকির লিখেছেন, ‘সুরেতে দেয় আজান/ সুরে পড়ে কুরআন/ সুরেতে করে বয়ান মুয়াজ্জিন।’ রশিদ সরকার লিখছেন, “বিজেপি আর জামাতিরা জাল পেতেছে বিশ্বজোড়া/ শোনো চেতন মানুষ যারা।” এদেশেই বৈষ্ণব পদ লিখেছেন সৈয়দ আলাওল, সেখ কবীর, সেখ ইয়াসিন, নসরুল্লাহ প্রমুখ। মহুয়া বা মলুয়া পালায় গীতিকা রচেছেন কত অনামা মানুষ। শিল্প ও কলার জাদুতে লুপ্ত হয়ে গেছে ধর্মের ভেদ। কী এক কালাজাদুর বশে এই সবকিছু অস্বীকারের পালা এসেছে এখন। এ যেন নিজের গলা নিজেই টিপে ধরা। যে জাতির আত্মপরিচয়ের লড়াই আজও গোটা বিশ্বের কাছে উদাহরণস্বরূপ, যে জাতির মাতৃভাষার মর্যাদারক্ষার লড়াইয়ের সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের উদযাপন, সেই জাতিই আজ নতুন পরিচিতির আচ্ছাদনের খোঁজে মরিয়া হয়েছে। মরিয়া হয়েছে তার পূর্ব-অর্জিত আত্মপরিচয়কে ত্যাগ করতে। যে পরিচয় মূলত সংস্কৃতি ও ভাষানির্ভর, আজকের মতো ধর্ম ও মৌলবাদ-নিয়ন্ত্রিত নয়। আর এ বিকৃতিও একদিনে ঘটেনি, শাহ আব্দুল করিম তো কবেই দুঃখ করে গেয়ে গেছেন, “গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান/ মিলিয়া বাউলা গান ভাটুগান গাইতাম।” আবার “বর্ষা যখন আইত গাজীর গাইন আইত/ রঙ্গে–ঢঙ্গে গাইত আনন্দ পাইতাম।” অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচর্চার এই উদার পরিসরে “হিন্দু বাড়িত যাত্রা হইত/ নিমন্ত্রণ দিত আমরাও যাইতাম।” কেননা তখন “মানুষ ছিল সরল, ছিল ধর্মবল।” আর এখন? “এখন সবাই পাগল বড়লোক হইতাম।”

ভেঙে যাওয়া ফ্রেমবদ্ধ সনজীদা খাতুন
পৃথিবীতে নতুন কিছু নাই এ কথা জেনেও মানুষ অবাক হতে ভোলেনি। সে বিস্ময়ের উৎস যাই হোক না কেন, মানুষের মন চায় অবাক হতে। তাই আমরা অবাক হচ্ছি ছায়ানট, উদীচীতে ঘটে যাওয়া হামলা বিষয়ে জেনে। অথচ পৃথিবীর বহমান ইতিহাসের একমাত্র নিরপেক্ষ সাক্ষী যে সময়, সে অবাক হচ্ছে কি? মানুষ যে উদারতায় সুন্দরকে স্বাগত জানায়, সেই একই ক্ষমতার নির্বেদে সুন্দরকে ধ্বংসও সে করে দেয় এক নিমেষে। মানুষের এই ধ্বংসাত্মক চরিত্রের রোষ থেকে বাঁচতে পারেনি এমনকী নালন্দা, আলেকজান্দ্রিয়া, বামিয়ান বুদ্ধ। মানুষের এই ধ্বংসাত্মক প্রকৃতিরই ফলস্বরূপ ভারতবর্ষে জৈন ও বৌদ্ধ ভাস্কর্য-স্থাপত্যের অধিকাংশ লুপ্ত, লুপ্ত কত অমূল্য পুঁথি ও চিত্রকলা। বারবার ভাঙাগড়ার এই খেলাতেই এগিয়েছে সভ্যতার চাকা। কখনও সে ভাঙে, আবার গড়ে নেয় প্রয়োজন অনুসারে। শ্মশানবৈরাগ্যের এই দার্শনিকতা বাঙালি লোকমানসের গভীরে থাকা সত্ত্বেও ভাঙনে, বিচ্ছেদে, ধ্বংসে বারংবার কেঁপে ওঠে হৃদয়। চোখে জল আসে।
গত ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনা তাই আবার স্তম্ভিত করেছে আমাদের। তবে আগেই বলেছি, এর সূত্রপাত হয়েছে বহু আগেই। ২০১৩ সালে মুক্তমনা ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের উপর ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলার সময় থেকে যা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের পর থেকে একে একে চাপাতির ধারালো আঘাতের শিকার হন অভিজিৎ রায়, আহমেদ রাজীব হায়দার, শফিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাশেরা। ২০১৬-তে ঘটে হলি আর্টিজান বেকারীর কাণ্ড। এরপর ২০২৪ সালে ঋত্বিক ঘটকের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়, ২০২৫-এর জুন মাসে রবীন্দ্রনাথের পৈর্তৃক কাছারিবাড়িতে হামলা হয়, জুলাই মাসে শিশু অ্যাকাডেমি নির্মাণের অছিলায় ভাঙতে শুরু করা হয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির বাস্তুবাড়িটি। সনজিদা খাতুনদের ‘ছায়ানট’ কিংবা সত্যেন সেনদের ‘উদীচী’-র ওপর আক্রমণ সেইসব ঘটনারই ধারাবাহিকতা মাত্র। তবে ভাগ্যিস সনজিদা খাতুন জীবিত থাকাকালীন এ আক্রমণ হয়নি। যে আদ্যন্ত শিল্পপ্রাণ মানুষটি জাতপাতের পরিচয়ের রাজনীতির ক্ষুদ্রতা অতিক্রম করে তাঁর সারাটা জীবন সমর্পণ করেছিলেন সংগীত ও সাহিত্যের কাছে, আজ তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশি পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা যে ক’জন হাতে গোনা ‘বাঙালি’ রয়েছেন তাদের মুখ লুকাবার আরও কোনও জায়গা থাকত না।
মানুষ যে উদারতায় সুন্দরকে স্বাগত জানায়, সেই একই ক্ষমতার নির্বেদে সুন্দরকে ধ্বংসও সে করে দেয় এক নিমেষে। মানুষের এই ধ্বংসাত্মক চরিত্রের রোষ থেকে বাঁচতে পারেনি এমনকী নালন্দা, আলেকজান্দ্রিয়া, বামিয়ান বুদ্ধ।

ভেঙে দেওয়া হয়েছে তবলা ও অন্যান্য সরঞ্জাম
এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলিকে ভেঙে যে বার্তা দিতে চাইছেন হামলাকারীরা তাতে শিল্পের হৃদয়ে সামান্য আঁচড়ও লাগবে না। কারণ শিল্পের মানুষকে প্রয়োজন কমই। মানুষকেই বারবার শিল্পাভিমুখী হতে হয়েছে নিজের প্রয়োজনেই। সিরিয়ায়, ইরাকে কখনও আইসিসের হাতে, কখনও মার্কিনি মিসাইলে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে মানব ইতিহাসের আদি যুগের কত কীর্তি। নিরাপদ দূরত্বে থাকায় তা আমাদের বাঙালি জীবনে বেশি প্রভাব ফেলেনি। আজ যখন দোরগোড়ায় দেখছি ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’, তখন আমরা চমকে উঠছি, ‘দেখতে যেমন ভুজঙ্গনা’।

প্রতিবাদী নয়, সন্ত্রাসবাদী
আজ আরও জরুরি বেঁধে বেঁধে থাকা, কথা বলা, মৌলবাদের স্বপক্ষের যুক্তিগুলিকে প্রেমের, ভক্তির আর যুক্তির ত্রিফলা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করা, আর সে কাজ করতে হবে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত।
দেশভাগের পরেও এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা মিলিয়ে সমগ্র বিশ্বে যে অখণ্ড ‘বাঙালি’ পরিচয় জীবিত ছিলো সেই পরিচিতি ভেঙে পড়ছে অবশেষে। আজকাল বাঙালি আর বাংলাদেশিকে আলাদা করে দেখার যে চর্চা শুরু হয়েছে সেই চর্চার প্রতিচ্ছবিই বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী। বাংলাদেশ হয়তো নিজের বাঙালি পরিচয়কে ত্যাগ করে ধর্মের ভিত্তিতে পেতে চাইছে নতুন কোনও পরিচয়। ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’? ওদিকে শরিয়তি ইসলাম, এদিকে উগ্র হিন্দু মৌলবাদের যে আগুনে পুড়ছে যৌথবাংলার সংস্কৃতি— সেই এক আগুনের গ্রাস থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাদ পড়েনি অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির প্রতীক ‘ছায়ানট’ ও ‘উদীচী’।

এক সময়ের আলো ঝলমলে ছায়ানট
তবে এ সময় কেবল বিলাপের নয়, বরং পূর্ব নারী ও পুরুষের সহস্রাধিক বছরের অর্জনকে বুক দিয়ে আগলে রাখার সময়। যারা মনে করছি সামাজিক মাধ্যমে হা-হুতাশ করা মাত্র দায় সারা হলো, তারা বুঝতে পারছি না যে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সন্দেহ ছড়ানোর মেশিনারিগুলো অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী, বিশেষত এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাশাসিত তথ্যপ্রযুক্তির দিনে। তাই আজ আরও জরুরি বেঁধে বেঁধে থাকা, কথা বলা, মৌলবাদের স্বপক্ষের যুক্তিগুলিকে প্রেমের, ভক্তির আর যুক্তির ত্রিফলা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করা, আর সে কাজ করতে হবে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। ঘরে-বাইরে, সর্বত্র। আব্দুল করিম কিন্তু অনেক আগেই সাবধান করে গেছেন, “দিন হতে দিন আসে যে কঠিন/ করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম…”। এখন দেখার, কোন পথে যায় বাংলাদেশ, কোন রূপ পায় তার জাতিসত্তার অন্বেষা।
________
মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।
