কোম্পানি আর কেজো ছবির গল্প

পশ্চিমে ক্যামেরার আবিষ্কার পালটে দিয়েছিল ছবি আঁকার ধারণাকেই

ছোটবেলায় জীবন বিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল খাতা আর পরীক্ষার উত্তরপত্রে পেনসিলে ছবি এঁকে বেশ মজা পেতাম। ওই ছবি আঁকাটুকুই উপভোগ করতাম, বিষয়টির অন্য সব অংশ এত বিস্বাদ লাগত যে লাইফ সাইন্স থেকে বায়োলজিতে উত্তরণ আমার কাছে অধরাই রয়ে গেছে। আমি যে ছবি দারুণ ভালো আঁকি সেরকম নয়, তবে ব্যাঙের পাকস্থলি কিংবা মানুষের হৃদপিণ্ড আঁকলে সেটা যে খুব দুর্বোধ্য হত তা এখনও পর্যন্ত কেউ বলেনি। প্র্যাকটিক্যাল খাতার জন্য যে ক’টা ছবি বরাদ্দ ছিল তার থেকে অনেকগুলো বেশি ছবি এঁকে রাখতাম। আঠেরো শতকের ছবি আঁকিয়ে জৈনুদ্দিনের কথা তখন জানতাম না। জানলে হয়তো তাঁর মতো পেশা বেছে নেওয়ার স্বপ্ন দেখতাম ছোটবেলায়। বড় হয়ে যখন তাঁর কথা পড়লাম, সেইসঙ্গে এটাও জেনে ফেললাম যে তাঁর পেশাও এখন লুপ্ত। তাই স্বপ্ন দেখার কোনো সুযোগ আপাতত নেই। টাইমমেশিন আবিষ্কার হলে অবশ্য ভেবে দেখা যেত।

শুধু জৈনুদ্দিন কেন, ভবানী দাস আর রাম দাসের কথাই ধরা যাক না। এঁরা পাটনা থেকে কলকাতা এসেছিলেন ছবি আঁকার চাকরি নিয়ে। চাকরি দিয়েছিলেন মেরি ইম্পে। সুপ্রিম কোর্টের প্রথম বিচারপতি ইলাইজা ইম্পের স্ত্রী। তাঁর ছিল পশুপাখির আশ্চর্য সংগ্রহশালা। ইংলিশ হোয়াইটম্যান কাগজে এই সব পশুপাখির অবয়বকে ধরে রাখাই ছিল তিনজনের কাজ। এই ধরনের কাজ এখন আর কে দেবে? বড়োজোর ফটোগ্রাফারের চাকরি পাওয়া যেতে পারে। ক্যামেরা এসে রংতুলির বাজার অনেকটাই খেয়ে নিয়েছে যে!

 

পশ্চিমে ক্যামেরার আবিষ্কার ছবি আঁকার ধারণাকেই পুরোটা পালটে দিয়েছিল। রূপের নিঁখুত প্রতিলিপি তো ফটোগ্রাফিতেই পাওয়া যায়, তাহলে বাইরের জগৎকে ক্যানভাসে হুবহু নকল তৈরি করে ছবি আঁকিয়েদের তৃপ্তি কোথায়? তাই এল বিমূর্ত ছবি। এমন কিছু আঁকতে হবে যা কিনা বাইরের অনুকরণ নয়। তারপর সেখান থেকে এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজম, সুররিয়ালিজম… সে আরেক গল্প। এদিকে কলকাতায় তো ক্যামেরা এসে ছবি আঁকিয়েদের পেটের ভাতই কেড়ে নিল। কীভাবে? এই গল্পের শুরুটা হয়েছিল আরও আগে, ওয়ারেন হেস্টিংস-এর সময়ে। ব্রিটিশ শিল্পীরা তখন ছবি আঁকেন নিজেদের মর্জিতে। ফরমায়েশি আঁকার সময় নেই তাঁদের, আঁকলেও সাম্মানিক বড্ড বেশি। আবার সব ইংরেজ তো ছবি আঁকতে পারেন না, কিন্তু তাঁদের শখ, যখন দেশে ফিরবেন তখন বাড়ির লোকজনকে দেখাবেন ভারতবর্ষ দেশটা কীরকম, তার মানুষজন পশুপাখি গাছপালা কত নতুন রকমের, তাই সেগুলোর ছবি পাওয়া গেলে মন্দ হত না। 

এদিকে মুর্শিদাবাদ শহর তখন ধুঁকছে, ভাগ্যের খোঁজে দলে দলে নতুন লোক আসছে কলকাতায়। নবাবের দরবারে যে শিল্পীরা আলো করে থাকতেন, তাঁদেরও কেউ কেউ আসছেন, যদি কোনো সমঝদার মোসায়েব জুটে যায়, সেই আশায়। এঁদেরকে দিয়ে অল্প খরচে ছবি আঁকানো শুরু করলেন শৌখিন ব্রিটিশেরা। এই শিল্পীরাও বুঝলেন, নতুন খদ্দেরদের রুচি আলাদা, মুঘল ছাঁচ এঁদের কাছে খুব বেশি সুবিচার পাবে না, তাই কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। ব্রিটিশদের পছন্দমতো ছবি আঁকলে ইউরোপীয় রীতি ছাপ তো পড়বেই, আবার এতদিনের অভ্যেস করা মুঘল ঘরানাকেও হঠাৎ করে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অনিবার্য ফল – প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য রীতির মিশ্রণ। ছবি বিক্রি হয়ে সেগুলো চলে যেত লন্ডনে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই তখন শাসক – তাদের কাজের বহর ক্রমশ বাড়ছে। বাড়ছে শখের চাহিদার সাথে সাথে ছবি আঁকার প্রশাসনিক চাহিদাও। কোম্পানির প্রয়োজনে ছবি আঁকিয়ে নেওয়া হচ্ছে – আর পাটনা হোক বা মুর্শিদাবাদ – ভারতের কোনাকোনা থেকে শিল্পীরা এসে জমিয়ে তুলছেন কলকাতা। এঁদের সূক্ষ্ম কাজ দেখে ব্রিটিশরাও প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নতুন যুগের সুবাদে ভারতে ঢুকছে আধুনিক বিজ্ঞান। গবেষণার জন্যও প্রয়োজন অনেক অনেক ছবি। শিবপুরে ‘বোটানিক্যাল গার্ডেন’, ব্যারাকপুরে ‘ইন্সটিউট অফ প্রমোটিং ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ – প্রচুর নতুন কাজ, এর সঙ্গে নতুন উদ্যম। এবং অবশ্যই নতুন নতুন নাম – পিরবক্স, শেখ মুহম্মদ আমির। কলকাতার বাইরেও এঁদের ডাক পড়ছে – কেউ আঁকছেন মানুষ, কেউ আঁকছেন পশু – কেউ বা রাস্তাঘাট বা অন্য অনেক কিছু – বিষয়ের অভাব নেই। ছবিতে রাজকীয় জাঁকজমকের বদলে আস্তে আস্তে বাড়ছে বাস্তবতার আঁচড়।

এই বাস্তবতাও একসময়ে ভাঙবে। রবি বর্মা আঁকবেন ‘শকুন্তলা’, অবনীন্দ্রনাথ আঁকবেন ‘ভারতমাতা’, আসবেন রবীন্দ্রনাথ, আসবেন নন্দলাল। এবং তার উলটো দিকে আসবে জীবন বিজ্ঞানের গিনিপিগ আর আরশোলা। এই সব কিছুর শুরু যেখান থেকে, সেখানে কিন্তু এত বিভাজন ছিল না। ছবি আঁকা ছিল নিতান্তই কেজো। শিল্পীরা তখন আঁকতেন পেটের দায়ে, তাতেই বদলে গেছিল ঘরানা, বাংলা পেয়েছিল প্রথম আধুনিক ছবি, আর কলকাতা চিনতে পেরেছিল তার প্রবণতাকে। সেই প্রবণতাই বলে দিয়েছিল যে এই শহর অন্য শহরদের থেকে আলাদা, এই শহর পাগলামির শহর। কেজো থেকে অকেজোতে রূপান্তরেই এই শহরের মজা।

Developed by DXDasia