অশিক্ষিত মানুষ দাঙ্গা বাধায় না, কিন্তু দাঙ্গা ছড়াতে তাদের ব্যবহার করা সহজ
দেশভাগের প্রধানতম কারণ ধর্ম হওয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার আবহ নব পুলকে জাগরিত হয়। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধির মতো চিন্তানায়করা যেভাবে জনচিত্ত আলোড়িত করতে চেয়েছিলেন সেই ধারণা গতি হারায়। গান্ধি হত্যার পর দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারণা আঘাত পায় – তা যেন কফিনের শেষ পেরেক। সৃষ্ট হয় এক মহা সঙ্কট। গান্ধিজির আশঙ্কা ছিল দেশভাগ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ইতিবাচক সঙ্কেত দেবে না। তাই সত্য হল।
বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আনতে প্রয়োজন ছিল রবীন্দ্রনাথ, গান্ধির মতো চিন্তানায়ক বা দেশনায়ক। পেলাম কই? পেলাম ক্ষমতালিপ্সু কিছু রাজনৈতিক নেতা। তাঁরা দলের নেতা হলেন দেশের নেতা হতে পারলেন কই?
হাল ধরতে পারতেন নেহরু। তাঁর নেতৃত্বে দেশ যে সংবিধান পেল তাতে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল যে এই দেশ সব ধর্মের মানুষের জন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্র একসাথে থাকতে পারে না এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ধর্মীয় সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বেশি। কিন্তু গোয়া, হায়দ্রাবাদ বা কাশ্মীরের ভারতভুক্তি ভুল বার্তা দিল, সংখ্যালঘু মনে সংশয় জাগাল। এমনকি শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর যথাযোগ্য কারণ স্পষ্ট না হওয়ায়, সোমনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা ভারতবর্ষীয় সমাজে অশুভ সংকেত পাঠাল। জামিয়া মিলিয়া বা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পতাকা তুলে ধরার কাজে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সে ধারণাও গেল তলিয়ে।
সুযোগ নিল ব্যবসায়ীরা। উত্তর-স্বাধীনতা পর্বে যে সব দাঙ্গা হয়েছে সেখানে(যথা মোরাদাবাদ) সংখ্যালঘু নিম্নবিত্ত মুসলমানদের হটিয়ে ব্যবসা দখলে নেওয়া হয়ে ওঠে বিশেষ কারণ।
ধর্মীয় ভাবাবেগ ও ধর্মান্তরকরণ আশঙ্কাও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণ হয়েছে।
তবু, বাবরি থেকে গোধরা ঘটেনি নেহরু আমলে। মাঝে পেয়েছি ইন্দিরা গান্ধিকে। উগ্রপন্থীদের হাতে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়। তাঁর উত্তরাধিকারী রাজীবকেও উগ্রপন্থীরা হত্যা করে। উগ্রপন্থা ও জাতীয়তাবাদ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে ওঠে।
দেশের অন্য প্রধান রাজনৈতিক নেতারাও দায়িত্বপালন করেননি। মণ্ডল-কমণ্ডল আন্দোলনে তাঁরা ঘি ঢেলেছেন নিজ নিজ গুরুত্ব বাড়াতে। অথচ সংখ্যালঘু ও পিছড়ে বর্গের বঞ্চনা দূর করতে চেষ্টাও করেননি তাঁরা (দ্রষ্টব্যঃ সাচার কমিটির রিপোর্ট), সংরক্ষণ সূত্র থেকে গেছে সরকারি দলিলে। নিয়োগে ও নানা সরকারি উদ্যোগে(যথা ব্যাঙ্ক লোন) তাদের বঞ্চনা ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
নেহরু-পরবর্তী ভারতবর্ষে যত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছে তার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাজার ও রাজনীতির অশুভ যোগাযোগ। আর সব ক্ষেত্রেই ক্ষতি হয়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের। উল্টোদিকে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অসহিষ্ণুতা পার হয়ে সম্প্রীতির আবহ রচনায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষই কার্যকর ভূমিকা নিয়েছে। তারাই তো সাম্প্রতিককালে গুজব ও কিছু ব্যক্তির অবিমৃষ্যকারিতায় উদ্ভূত ধূলাগড় থেকে বসিরহাট অবধি ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা থামিয়েছে।
এমন উদাহরণ অনেক। বলছি না দারাশিকোহ বা হুসেন শাহ-র কথাও। বলছি না সাহিত্যে সম্প্রীতির আবহ তৈরির প্রয়াস। কিন্তু ভুলতেও পারি না বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরৎ থেকে মানিকের কথা। ভুলি কেমনে ‘আদাব’ গল্প। কে না জানে সঙ্গীতে, শিল্পে, খেলার মাঠে আমরা জাতপাত ভুলে থাকি। মান্না শুনব রফি শুনব না, বা ফিদা হুসেন সরিয়ে কেবল গনেশ পাইনের ছবি দেখব – তা হয় নাকি? পতৌদি বা আজাহার, নইম বা হাবিব – শচীন-সৌরভ বা চুণী-বলরামের চেয়ে কম প্রিয় নাকি? যেমন ভুলি না মহম্মদ শহীদের কথা বা গুরুবক্সের কথা। একালের জনপ্রিয়তম অভিনেতা শাহরুখ খান, সেরা ক্রীড়াবিদ লিয়েন্ডার পেজ। ধর্ম যাই হোক তারা তো সকলেই ভারতীয়।
কেবল ধর্ম নয়, আমাদের সমাজে জাতপাত প্রথাও বিভেদ সৃষ্টি করে। তথাকথিত ছোট জাত, পিছড়ে বর্গ অত্যাচারিত। সে বিভেদ দূর করায় যেমন সুফিরা কাজ করেছেন তেমন সন্তরাও। জাকির হুসেন বা মাদার টেরিজা কি শিক্ষাবিস্তারের জন্য, সেবার জন্য, মানবতার জন্য আমাদের প্রণাম পান না? তাঁরা সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন ভারতীয় সংস্কৃতি। এবং তা যে ঠুনকো নয় তা প্রমাণের দায় আমাদের। আমরা দায়বদ্ধ আমাদের প্রতিবেশীর কাছে, আমাদের সময়ের কাছে, আমাদের সন্তানদের কাছে।
আরও একবার স্মরণ করছি নেহরুকে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দারিদ্র সম্প্রীতি নষ্ট করে না। তাঁর বিশ্বাসের সমর্থনে তথ্য ও যুক্তি নিশ্চয় আছে। কিন্তু, যে কোনও একপ্রকার অসাম্য অন্যপ্রকার অসাম্যকে প্রভাবিত করে, উসকে দেয়। তাই অসাম্য দূর করায় গুরুত্ব দিতেই হবে। এক শতাংশের হাতে দেশের প্রায় সবটুকু সম্পদ এই তথ্য তো শুভ বার্তা দেয় না। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অশিক্ষিত মানুষ দাঙ্গা বাধায় না ঠিকই, কিন্তু দাঙ্গা ছড়াতে তাদের ব্যবহার করা তুলনায় সহজ। সুশিক্ষা সহজে তার মোকাবিলা করতে পারে।
একথা মানতে হয় যে, দেশের সংবাদমাধ্যম দাঙ্গার সময় বারবার দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু সম্প্রীতি রক্ষায়, অধিকার রক্ষায় তারা আশানুরূপ তৎপরতা দেখাননি।
(মৌড়িগ্রাম, হাওড়ায় (২৯/০১/২০১৮) গান্ধি পিস ফাউনডেশনের সভায় প্রদত্ত বক্তৃতার সংক্ষেপিত রূপ)