
ব্যারাকপুরের থিয়েটারকর্মী সুরজ বিশ্বাসের উদ্যোগ
সে এককালে আমাদের বাংলায় ভাঁড়যাত্রা হতো। গম্ভীরার কৌতুকে মানুষ আমোদ পেতেন। তারপর কেটে গেছে বহু যুগ। বঙ্গজীবনে কৌতুকবিলাস কমেছে। লোকশিল্প আস্তে আস্তে কোণঠাসা হয়েছে। কিন্তু হাসি-কৌতুক-ব্যঙ্গ সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে বড্ড প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক হোক বা সামাজিক যে কোনো অবস্থানে কৌতুক বা ব্যঙ্গ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবলম্বন করে। তাই ইউরোপে ‘ক্লাউনিং’ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানির মতো দেশগুলিতে রীতিমতো ক্লাউনিং (Clowning) শিল্প সমাদৃত হয়েছে। অতীতের গ্রিস, রোম ক্লাউনিং-এর পাঠ দিয়েছে বিশ্বকে। সেখানকার দর্শক অভ্যস্ত হয়েছেন এই শিল্পের নানা আঙ্গিক উপভোগের জন্য।
পরবর্তীতে চার্লি চ্যাপলিন, বাস্টার কিটন বা হালফিলের মিস্টার বিন যেভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন বা সমাজব্যবস্থার দিকে বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিয়েছেন, সেটা আজ কিংবদন্তি বলে গণ্য হয়। এঁরা ক্লাউনিং-এর প্রবাদপুরুষ। আইরিশ নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’, ‘এন্ডগেম’, ‘এক্ট উইথআউট ওয়ার্ডস’ নাটকগুলো যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনে ক্লাউনিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বেকেটের চরিত্রগুলো ভাঁড় ছাড়া কিছুই নয়। এঁরাই নাটককে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সুরজ বিশ্বাস
জীবন অযৌক্তিক। কোনো সিরিয়াস মানে নেই জীবনের। ভাঁড় তাই জীবন নিয়ে কী করবে খুঁজে পায় না। অ্যাবসার্ড ড্রামা পড়ার সময় এই ধারণাই তৈরি হয়েছিল। বাস্তবে তা থেকে খুব বেশি দূরে কি আমরা? কথা হচ্ছিল ব্যারাকপুরের বছর ছাব্বিশের তরুণ সুরজ বিশ্বাস-এর সঙ্গে। নাট্যজগতের মানুষ হিসেবেই সুরজের পরিচিতি। বাঙালির কাছে ক্লাউনিং নামের পাশ্চাত্য ঘেঁষা আর্টটিকে পরিচিতি দিতে সুরজ উদ্যোগ নিয়েছেন। সুরজ বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “বলতে পারেন নিখাদ মজার ছলে দর্শকদের কিছু বার্তা দেওয়া ক্লাউনিং-এর উদ্দেশ্য। ক্লাউনিং এখনকার সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। চারপাশে যা দেখতে পাচ্ছি, প্রত্যেকেই ভাঁড়। সবাই ভাঁড়ামোই তো করছে।”
বাঙালির শেকড়ের সঙ্গেই কোথাও না কোথাও ক্লাউনিং রয়ে গিয়েছে। এমনটাই মনে করেন সুরজ। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র বিদেশি আর্ট ফর্ম বলেই এখানে ক্লাউনিং এর পরিচয় করাতে চাইছি। এমনটা নয়। আগে রাজসভায় বিদূষকরা থাকতেন। যেমন, কৃষ্ণনগরের গোপাল ভাঁড় অমর হয়ে আছেন বঙ্গবাসীর হৃদয়ে। বিভিন্ন লোকশিল্পেও কৌতুক রয়েছে। তাই আমার মনে হয়েছে, বাংলার সংস্কৃতিতে ক্লাউনিং একদম নতুন কিছু নয়।”
চার্লি চ্যাপলিন, বাস্টার কিটন বা হালফিলের মিস্টার বিন যেভাবে দর্শকদের হাসিয়েছেন বা সমাজব্যবস্থার দিকে বিদ্রূপ ছুঁড়ে দিয়েছেন, সেটা আজ কিংবদন্তি বলে গণ্য হয়। এঁরা ক্লাউনিং-এর প্রবাদপুরুষ।
সুরজের ক্লাউনিং-এর জগতে কীভাবে আগমন? ‘ক্লাউন উইথ আউট বর্ডারস’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাপী ক্লাউনিং-এর প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব নিয়েছে। তাঁরাই মুম্বইতে এক মাস ব্যাপী একটি ওয়ার্কশপ আয়োজন করেন ২০১৮ সালে। সেখানেই ব্যারাকপুরের সুরজ ডাক পান। ভারতের পাঁচটা শহরের শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন ক্লাউনিং শেখার ডাকে। ভারতে ক্লাউনিং নিয়ে বিশেষ চর্চা হয় না। মুম্বইয়ের রূপেশ তিল্লু, আরশাদ ভাট ক্লাউনিংকে সমৃদ্ধ করেছেন বটে। কিন্তু কলকাতায় কোথায় এই শিল্পের চর্চা হয়? তাই সুরজ কলকাতায় শুরু করতে চলেছেন ক্লাউনিং-এর চর্চা। ২০১৮-এর পর থেকে তিনি এ পর্যন্ত ক্লাউনিং এর তিন-চারটি উপস্থাপনা করেছেন। সুরজ বলেন, “ক্লাউনিং-এর জন্য নির্দিষ্ট স্টেজ, আলো, জায়গা কিছুই লাগে না। রাস্তায় বা বাড়ির ছাদে যেখানে খুশি করা যায়। তবে ৩০ জন দর্শক বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে পরিচালককে ডিজাইন করতে হয়। শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ বা কালিদাসের অভিজ্ঞানম্ শকুন্তলম্-এর সার্থক ক্লাউনিং-এ রূপদান করা হয়েছে।”
ব্যারাকপুরেই সুরজের শৈশবে হাতেখড়ি নাটকের। তারপর থেকে ক্রমেই থিয়েটার, নাটক নিয়ে এগিয়েছেন। তীর্থঙ্কর চন্দ, রাজা ভট্টাচার্য, অদ্রিজা দাশগুপ্তের মতো নাট্যকারদের সংস্পর্শে আসাও হয়েছে কালক্রমে। নাটকের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সুরজ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। রঙ্গলোক, হাতিবাগান সংঘারামে যুক্ত থেকেছেন। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন দলে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন মাইম অর্থাৎ মূকাভিনয় নিয়ে। পদ্মশ্রী নিরঞ্জন গোস্বামীর কাছে মূকাভিনয় শিখেছেন। এ বছর ‘লোককথা’ নামে একটি মূকাভিনয় পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। এসবের সঙ্গে সঙ্গে ‘বেসড অন ফলস স্টোরি’ নামের একটি ক্লাউনিং প্রযোজনা নিয়েও ব্যস্ত আছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ক্লাউনিং নিয়ে সুরজের এগিয়ে চলার ষোলোআনা ইচ্ছে রয়েছে। সুরজ বলেন, “আমি অত কিছু ভেবে ক্লাউনিং করতে আসিনি। করতে ভালো লেগেছিল। তাই অনেকে মিলে করতে চাই। যাতে আগামী দিনে ক্লাউনিং প্রতিবাদের একটা ভাষা হয়ে ওঠে।”
না। মুম্বইয়ের রূপেশ তিল্লু, আরশাদ ভাট ক্লাউনিংকে সমৃদ্ধ করেছেন বটে। কিন্তু কলকাতায় কোথায় এই শিল্পের চর্চা হয়? তাই সুরজ বিশ্বাস কলকাতায় শুরু করতে চলেছেন ক্লাউনিং-এর চর্চা।

মূল থিয়েটারের পাশাপাশি ক্লাউনিং যাতে বিকল্প শিল্প হিসেবে পরিচিতি পায়, তাঁর স্বপ্ন দেখেন সুরজ। শুরু করেছেন ক্লাউনিং-এর ওয়ার্কশপ। তিনি এ বছরের অগাস্ট মাসে একটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করেছিলেন। নভেম্বরের ২৮ থেকে ৩০ এই তিনদিনও করছেন ক্লাউনিং-এর ওয়ার্কশপ।
একসময় বাংলায় নকশা লিখে তথাকথিত সমাজব্যবস্থাকে বিদ্রূপ করেছিলেন হুতোম ওরফে কালীপ্রসন্ন সিংহ। এই কলকাতা দেখেছে রূপচাঁদ পক্ষী বা জেলেপাড়ার সঙ। বঙ্গসমাজের যা কিছু ভ্রান্ত, তাঁকেই বিদ্ধ করেছে এসব। হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ। সেই দলে আগামীদিনে নাম লেখাতে চলেছে ক্লাউনিং? সময় দেবে সে উত্তর।
____
(সল্টলেকে ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটে সুরজ বিশ্বাস গত নভেম্বরের ২৮ থেকে ৩০ – এই তিনদিন করেছিলেন ক্লাউনিং-এর ওয়ার্কশপ। ১৮-৬০ বছর বয়সীদের কথা মাথায় রেখে এই ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়েছিল। এবার ক্লাউনিং-এর ওয়ার্কশপ থেকে বাদ নেই খুদেরাও। ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটে এবছর ডিসেম্বরের ১৫, ১৬, ১৭ তারিখে ক্লাউনিং-এর ওয়ার্কশপে ১০-১৮ বছরের বয়সীরা যোগ দিতে পারবেন।)
