নাহুমস-এর কেক থেকে জয়নগরের মোয়া- শীতকালের কলকাতা ধারণ করতে পারে সবকিছুই
‘ছুটি’ এমন একটি খুশিয়াল শব্দ, যা লহমায় মন ভালো করে দিতে পারে আট থেকে আশির। ছোটোবেলায় হলুদ মলাটের ‘ছোটোবড়ো মিলে’ ক্যাসেটে শোনা গানের কথা ছিল, “আগে আর পরে ছোটাছুটি ছোটাছুটি/ মাঝখানে কিছু ছুটি কাটানোর দিন”। আর শীতকালীন বড়োদিন মানে ছোটো-বড়ো সকলেরই ছুটি।
সৈয়দ মুজতবা আলীর অনন্য বই ‘চাচা কাহিনী’-র ‘বেলতলাতে দু-দুবার’ নামক রচনাতে বলা ছিল বড়ো শহরে মেলা জমে না, কারণ, মুজতবা আলীর ভাষায়, “যেখানে মানুষ বারো মাস মুখোশ পরে থাকে সেখানে বহুরূপী কল্কে পাবে কেন?”; কিন্তু কার্নিভালের নানান কিসিম কলকাতা শহর দেখেছে এবং দেখে চলেছে। হুতোম তো বলেইছিলেন, ‘হুজুকে কলকাতা’! তো এমন কার্নিভালের শহরে শীতকাল যথারীতি বাড়তি খুশির সময়। কারণ এই একটা ঋতু, যা সবসময়েই মোচ্ছবমুখর। ফি রোববার পিকনিক তো আছেই, তার সঙ্গে রয়েছে রক্তদান শিবির, বিবিধ মেলা, ফিল্মোৎসব, বইমেলা, নানান আঞ্চলিক উৎসব। আর তার মধ্যেই আছে বড়োদিন, আর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নতুন বছর।

শীত উদযাপনের সময়। বড়োদিন সেই উদযাপনের একটি অপরিহার্য অংশ। পার্কস্ট্রিট নামক এলাকাটির আবেদন বছরভর একরকম, আর বছরশেষের এই সময় আরেকরকম। সান্তাপোশাক, সান্তাটুপি, বেলুন এবং আলো শহরের এই এলাকাকে ভরিয়ে রাখে। বছরের এইসময় বাঙালির কলোনিয়াল সত্তা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সাহেব হওয়ার অকস্মাৎ তাগিদ যেন এইসময়েই বেশি। তবে পার্কস্ট্রিট আর বো-ব্যারাকের এই আনন্দের মাঝে লুকিয়ে থাকা বিষাদকে এড়িয়ে যাওয়া মুশকিল। এই শহরকে ভালোবেসে যে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা রয়ে গেছেন বো-ব্যারাকের অন্ধকারে, বড়োদিন তাদেরও। অঞ্জন দত্তর ‘বো ব্যারাকস ফরএভার’ সিনেমাটি দেখিয়েছিল এই অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ভেঙে পড়া জীবন।

বছরখানেক আগে একটি গ্যালারিতে একটি ফোটোগ্রাফির এক্সিবিশনে দেখা গিয়েছিল, এমিলি নামক এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলার জীবন, তার কেক বানানো, ক্রিসমাস ট্রি সাজানো যত্ন করে, পাইপ বানানো, গ্লাসে ওয়াইন ঢালা- এসবকিছুই তার একার জন্য; কিন্তু বোধহয় তার অপেক্ষা থাকে আরও মানুষের জন্য, যারা আসবেন। “ওহে সুন্দর, মম গৃহে আজি পরমোৎসব রাতি”, এই পরমোৎসবের আহ্বান তার গৃহসজ্জায়, তার মলিন গাউন পরে একার অপেক্ষায়। আলোর শহরের আড়ালে এরা থাকেন একমনে। ডন কিহোতের মতোন ধরে থাকেন, তাদের জংধরা ভালোবাসার সময়কে।
তবে এসবের বাইরে শীত এবং বড়োদিন উদযাপনের একটা বঙ্গজ তারিকাও আছে। সেখানে রয়েছে নানাবিধ মেলা। বিজ্ঞান মেলার হিড়িক পড়ে যায় এইসময়। বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েরা স্কুলড্রেস পরে সাধারণ বৈজ্ঞানিক কারিকুরি দেখায় রীতিমতো যত্ন করে। ছোটোবেলায় এই বিজ্ঞান মেলার জোরে কতবার ভৌতবিজ্ঞান বা জীবনবিজ্ঞানের ভয় কেটে গেছে, তার ইয়ত্তা নেই। আঞ্চলিক বইমেলা, নানারকম উৎসব এসব তো আছেই। গানবাজনার শোনার আদর্শ সন্ধে তো এসময়েই মেলে। এখনও উত্তরের পাড়ায় পাড়ায় হয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বাঘসিংহের খেলা দেখানোর বর্বরতা বন্ধ হওয়ার পর সার্কাসের বাজার পড়েছে। তবু কোহিনুর, অজন্তা বা আফ্রিকান সার্কাস এখনও আসে শহরে। সেই তাঁবুর অন্ধকারের চাপা উত্তেজনা শীতকাল ছাড়া অর্থহীন।

নাহুমস-এর কেক থেকে জয়নগরের মোয়া- শীতকালের কলকাতা ধারণ করতে পারে সবকিছুই। আর তার সঙ্গেই তারে বাঁধা থাকে বিষণ্ণ ডিপার্চারের সুর। বছর চলে যাওয়া, আর তার সঙ্গেই ছেড়ে যাওয়া কতকিছুর। গবেষক পি.টি নায়ার যখন কেরালার প্রত্যন্ত গ্রামে, তার জন্মভূমিতে ফিরছিলেন এই শহর ছেড়ে, তখন বলেছিলেন তিনি সবথেকে বেশি ভালোবেসেছেন এই শহরকে। এই শহরে তার যাপনের প্রতিটা ক্ষণ তিনি ধরে রেখেছেন যত্ন করে, একজন প্রেমিক কিউরেটরের মতোন। এই শহর বেঁচে থাকে অনাত্মীয়ের ভালোবাসায়, শীতকাল সেই ভালোবাসার আবহসঙ্গীত বাজায় তার উত্তুরে হাওয়ায়।