ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ওপেনহাইমার’ এবং ৫০-এ নারায়ণ সান্যালের ‘বিশ্বাসঘাতক’

মহাকাব্যিক পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস ‘বিশ্বাসঘাতক’

গোটা পৃথিবীর সিনেপ্রেমীদের কাছে ক্রিস্টোফার নোলানের (Christopher Nolan) সিনেমা মুক্তি পাওয়া কোনো উৎসবের থেকে কম কিছু নয়। ডানকার্কের পর তিনি আবার ইতিহাস নির্ভর একটি গল্প নিয়ে কাজ করছেন, যেটি অ্যাটম বোমার ‘সো কলড’ জনকের বায়োপিকও বটে। কথা হচ্ছে ‘ওপেনহাইমার’ (Oppenheimer) চলচ্চিত্র নিয়ে, যা ভারতে মুক্তি পাবে ২১ জুলাই। ছবিতে কী আছে বা কতটা আছে, এখনই সেসব নিয়ে কথা বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে ওপেনহাইমার মুক্তির খবরে অনেক বইপ্রিয় বাঙালি নিজেদের বুক সেল্ফ থেকে একটি বই বের করে অবশ্যই আরও একবার নতুন করে নেড়েচেড়ে দেখছেন। সেই বইটি নারায়ণ সান্যাল (Narayan Sanyal) রচিত বিশ্বাসঘাতক।

এই আখ্যানের সঙ্গে ওপেনহাইমারের যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর, তবে এ কথা কখনওই বলা যায় না, ওপেনহাইমার এই গ্রন্থের মূল চরিত্র। একটি প্রায় মহাকাব্যিক পটভূমিকায় লেখা ‘বিশ্বাসঘাতক’ গ্রন্থতে ওপেনহাইমার বড়োজোর একটি খণ্ডকাব্যের নায়ক। তবে বইয়ের শুরুর পাতাতেই যে নায়কের ছবি দেওয়া আছে, তিনি আসলে কে? এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজে এই বই। বিশ্বাসঘাতক প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৭৪ সালে (দে’জ পাবলিশিং), এবছর তা ৫০-এ পা দিল, এই সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে ফিরে দেখা যাক ‘বিশ্বাসঘাতক’-কে।

কিংবদন্তি নারায়ণ সান্যাল

গল্প এত দূর সরলরৈখিকভাবে এসেও বাঁক নেয় একদম অন্য খাতে। নারায়ণবাবু একদম প্রথম পর্যায়ে থেকে কীভাবে পরমাণু বিদীর্ণ করে তার থেকে চেন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে বোমা প্রস্তুত হল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন, তবে তা এমনভাবেই যাতে একজন সাধারণ বিজ্ঞানচর্চাহীন ব্যক্তির কাছেও বোধগম্য হয়।

বিশ্বাসঘাতক উপন্যাসের (Biswasghatak Novel) প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। একটি আখ্যানের মধ্যে এত ঐতিহাসিক চরিত্র, বৈজ্ঞানিক, রাষ্ট্রনেতার উপস্থিতি বাংলা সাহিত্যে বিরলতম। প্রথমত অবাক হতে হয় গুগল পূর্ববর্তী যুগে এত তথ্য সংগ্রহ করতে নারায়ণবাবুকে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছিল সেই বিষয়টি ভেবে। দ্বিতীয়ত, অবাক করে এই গ্রন্থের ফর্ম। কী, কেন, কীভাবে ও কে? – এই চারটি প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে আছে বইটি। গ্রন্থকার ও প্রকাশক নিজেরাই দ্বিধান্বিত ছিলেন এই গ্রন্থটাকে কী হিসাবে চিহ্নিত করা হবে সেই নিয়ে, কারণ —

“উপন্যাসের কেমিস্ট্রির ফর্মুলা অপ্রত্যাশিত। বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ একে বলা চলে না, কারণ বিজ্ঞান গ্রন্থে রোমান্টিক প্রেম কাহিনি অপাংক্তেয়। গোয়েন্দা যেখানে অপরাধীকে চিহ্নিত করছে না, অপরাধী স্বয়ং এগিয়ে আসছে ধরা দিতে… সেখানে গোয়েন্দা কাহিনির প্রশ্নই ওঠে না।”

নারায়ণ সান্যালের উপন্যাস বিশ্বাসঘাতক (১৯৭৪)

আখ্যানটি শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী আমেরিকায় ঘটে যাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে। পারমাণবিক বোমার একচ্ছত্র অধিপতি তখন আমেরিকা। কিন্তু তার ম্যানহার্টেন প্রজেক্টের গবেষণাগার থেকে কোনো এক বিশ্বাসঘাতক বোমা তৈরির সূত্র পলমল সিগারেটের প্যাকেটে করে মাইক্রোফিল্ম আকারে পাচার করে রাশিয়ায়। এই ঘটনায় তৈরি হয় রাষ্ট্রনৈতিক সংকট। শুরু হয় তদন্ত, প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা হল মোট বারো জন সন্দেহভাজন বিজ্ঞানীর নামের তালিকা, নাকি আসলে এই তালিকায় নাম আছে তেরো জনের! কে এই ত্রয়োদশ ব্যক্তি, যাকে এই তালিকায় যুক্ত করার কথা ভাবাটাও কঠিন ছিল অনেকের ক্ষেত্রে?

গল্প এত দূর সরলরৈখিকভাবে এসেও বাঁক নেয় একদম অন্য খাতে। নারায়ণবাবু একদম প্রথম পর্যায়ে থেকে কীভাবে পরমাণু বিদীর্ণ করে তার থেকে চেন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে বোমা প্রস্তুত হল তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেন, তবে তা এমনভাবেই যাতে একজন সাধারণ বিজ্ঞানচর্চাহীন ব্যক্তির কাছেও বোধগম্য হয়। আখ্যানে চরিত্র হিসাবে এসেছেন রাদারফোর্ড, এসেছেন নীলস বোর, হান্স বেথে, অটো হান, চ্যাডউইক, এনরিকো ফের্মি, ক্লাউস ফুকস, ওপেনহাইমার, ৎজিলার্ড, কুরি দম্পতি, স্যার অ্যালবার্ট আইনস্টাইন-সহ আরও অনেক বিজ্ঞানী, তবে তাঁরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসেছেন নন-ফিকশন আকারে। এসেছেন রুজভেল্ট, ট্রুম্যান, চার্চিল, স্ট্যালিন, মুসোলিনি, হিটলার-সহ প্রচুর রাষ্ট্রনৈতিক চরিত্র। এসেছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার গোয়েন্দাদের কথাও। আবার একসময় বিজ্ঞান থেকে প্রেমকাহিনির দিকে মোড় নেয় আখ্যান। আসলে এই গ্রন্থ ঠিক কতটা ফিকশন আর কতটা নন-ফিকশন, তা ‘কৈফিয়ৎ’ অংশে সামান্য আভাস দিলেও সম্পূর্ণ খোলসা করে বলেননি নারায়ণ সান্যাল।

নোলানের সাম্প্রতিক ছবি ওপেনহাইমার-এর প্রোটাগনিস্ট

প্রচুর চরিত্রের দুটি দিক দেখানো হয়েছে এই আখ্যানে, একটি বিস্ফোরণের আগে, অন্যটি বিস্ফোরণের পরে। এক্ষেত্রে দাপুটে অটো হানের হিরোশিমার হত্যাকাণ্ডতে নিজেকে দায়ী করে ভেঙে পড়া বা রসিক ফাইনম্যানের কর্নেল প্যাশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রসঙ্গগুলির কথা বলা যায়। এছাড়াও একাধিক বড়ো ট্রান্সফরমেশনের ঘটনা আছে এই আখ্যানে, প্রেমের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেমন আছে মানুষের মনের ট্রান্সফরমেশনের, তেমনই আছে কমিউনিস্ট থেকে ফ্যাসিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ট্রান্সফরমেশনের। আগেও বলেছি, এই গ্রন্থ একটি মহাকাব্যিক গ্রন্থ। মহাকাব্যে যেমন একটি গোটা জাতির সরস্বতী এসে ধরা দেয়, নারায়ণ সান্যালের এই গ্রন্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধত্তোর কালের সামগ্রিক সমাজ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও দর্শনগত চিত্র ধরা পড়েছে।

এই আখ্যানে পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিজের চরিত্র বদলে বারবার ধ্রুবপদের মতো ফিরে এসেছে, যেন কার্লমার্ক্সের সেই বিখ্যাত উক্তির অংশ, “first as tragedy, second as farce”। ট্রিনিটি টেস্টে প্রথম পরীক্ষামূলক বোমা বিস্ফোরণের পর দেড় মিনিট কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বিজ্ঞানী কথা বলতে পারেননি, দেড় মিনিট পর কানে আসে বিস্ফোরণের শব্দ। এর বেশ অনেকগুলো দিন পর যখন এই আখ্যানের বিশ্বাসঘাতক তার প্রেয়সীর কাছ থেকে এক চরমতম সত্যি জানতে পারেন, তার ঠিক পরে তারাও অনুভব করেন ‘অস্বাভাবিক একটি নিস্তব্ধতা।’ পুরো দেড় মিনিট তারাও কেউ কোনো কথা বলেননি। এই ‘দেড় মিনিটে’-র রূপকটি নারায়ণবাবু যে চরম শৈল্পিক চেতনায় এই আখ্যানে ব্যবহার করেছেন, তা পাঠকদের ভীষণভাবে অবাক করে।

নোলানের সাম্প্রতিক ছবি ওপেনহাইমার-এর দৃশ্য

নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং
ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্।
দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মা
ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো
(শ্রীমৎভাগবতগীতা, অধ্যায় ১১, শ্লোক ২৪)

এই লোকটি ওপেনহাইমার ট্রিনিটি টেস্টের পর বিস্ফোরণের ব্যাপকতা দেখে উচ্চারণ করেন। তিনি এই বিস্ফোরণকে সহস্র সূর্য উদয়ের সঙ্গে তুলনা করেন, যা মূলত শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল গীতায়। চিন্তার দিক থেকে ওপেনহাইমারি কমিউনিস্ট হওয়ার কারণে এখানে ধর্মের যোগ খুঁজতে যাওয়া বৃথা, ধরে নেওয়া যায় তিনি কেবল এটিকে একটি কবিতা হিসেবেই ব্যবহার করেছিলেন। আমরা যদি একটু মহাভারতের দিকে তাকাই, তাহলে সেখানে ধর্মযুদ্ধের যে তত্ত্ব পাওয়া যায়, তা আপাতভাবে খুব সহজ-সরল মনে হলেও, তা ঠিক ততটা সহজ নয়। মহাভারতে বলা হয়েছে, অহিংসা পরম ধর্ম, ধর্ম হিংসা তথ্যবচ। এবার এই ধর্মহিংসাটা কী সেটা খুব গোলমেলে বিষয়। কৌরবপক্ষে নারায়ণী সেনাকে পাঠিয়ে তাদের অবধারিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়াটাও কি ধর্মের জন্য ছিল? এর উত্তর আমাদের মহাভারত দেয় না। ঠিক তেমনভাবেই, কোন ধর্ম হিংসার জোরে জার্মানির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত করা আণবিক বোমাকে শক্তি আস্ফালনের জন্য আমেরিকা জাপানের উপর নিক্ষেপ করেছিল তার উত্তর ইতিহাসের কাছে আজও অধরা। এই আখ্যানের বিশ্বাসঘাতককে আপাতভাবে ট্রেটার মনে হলেও, তিনি কোন দর্শন থেকে কোন পরিস্থিতিতে কাজ করেছিলেন, সেটা জানার পর হয়তো পাঠকের মন পাল্টাতেও পারে। আমাদের বিশ্বাসঘাতকের পিতা ছোটোবেলায় সন্তান যাতে জুয়াচুরি না শেখে, সেই কারণে এক বিশেষ ঘটনায় একটি কয়েনকে কেটে আর দুটি দিককেই ‘হেড’ বানিয়ে দিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তি বড়ো হয়ে যখন একটি ভুল সময়ে ভুল পক্ষে থেকে কিছু হেডলেস মনস্টারের মধ্যে থাকতে থাকতে যখন বুঝতে পারেন ব্যাপারটা ভুল হচ্ছে, তখন তিনি যে কাজটি করেন তা কেবল শাদায় কালোয় বিচার করা যায় না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানব সভ্যতার ইতিহাস। বিশ্বাসঘাতক কি আদৌ বিশ্বাসঘাতক, এই প্রশ্ন আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে ঘটনাটা ঘটার সময়েও ছিল, ছিল আজ থেকে ৫০ বছর আগে নারায়ণবাবুর গ্রন্থটি লেখার সময়ও এবং তা আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক।
 

Developed by DXDasia