“শিশুরা কোথায় এখন? শিশুই নেই তো শিশুসাহিত্য।” – শিবরাম

নিজেকে সাহিত্যিক বলার চেয়ে ‘লেখক মাত্র’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন শিবরাম

শিবরাম চক্রবর্তী’ আসলে ক’জন? আগামী শতাব্দীতে হয়তো এমন গবেষণা হবে যে, শিবরাম চক্রবর্তী নামে চার-পাঁচজন মানুষ লিখতেন। শিশু সাহিত্যে অনাবিল রসের ভাণ্ডারী হিসাবে আমরা যাকে পেয়েছি গত চল্লিশ বছর ধরে, সেই একই মানুষ কি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা নিয়ে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লিখতেন? রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই অতি-উগ্র আধুনিক কবিতার দুটি বই, নাম ‘চুম্বন’ আর ‘মানুষ’ যিনি লিখেছিলেন, তিনি কি এই একই হাস্যরসিক শিব্রাম চক্রবর্তী?

শিবরামের রস-বৈচিত্র্যের প্রতি এই শ্রদ্ধা-আনত বিস্ময়টি প্রকাশ করেছিলেন স্বয়ং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি কিনা তরুণ বয়সে শিবরামের ‘আকাশ দেখতে রাস্তায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকার’ অকৃত্রিম বাউণ্ডুলেপনার সাক্ষী থেকেছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথার প্রসঙ্গ ধরেই বলতে হয়, শিবরামের লেখনীর এই যে বৈচিত্র্য, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরেও তো সেই বৈচিত্র্যের অভাব কিছু নেই। সমালোচকরা বলেন, এই বৈচিত্র্যময় জীবন সত্ত্বেও সেই জীবনকে পাঠকের কাছে আত্মপ্রচারের ঢঙে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। ‘বিধাতার চেয়ে বড়ো’ কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন- “এই সাধ জাগে মোর সব স্বপ্ন ছেয়ে-/ আমি বড়ো হই, যদি তুমি বড়ো হও মোর চেয়ে।” সর্বদাই অন্যকে নিজের চেয়ে বড়ো ভাবতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেন বড়ো স্বাভাবিক ছিল শিবরামের পক্ষে।

অথচ, সত্যিই কি নিজের কথাই বলে যাননি তিনি? নিজেকে অতি ক্ষুদ্র করে দেখানোর যে সহজাত প্রচেষ্টা তাঁর ছিল, তার পাশেই তিনি এ-ও লিখে রাখছেন যে, “আমার জীবন আমার যত কাহিনির মধ্যেই বিধৃত, বিবৃত। তার মধ্যেই তারা ধরা পড়েছে, ধরা রয়েছে। খুঁজে পেতে সমঝে নিতে হবে।” লেখার মধ্যে নিজের কথাকে যিনি যত সফলভাবে সর্বজনীন সুরে উত্থাপন করতে পারবেন, তিনি লেখক হিসেবে তত সার্থক। শিবরাম সেদিন থেকে কতখানি সফল, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত, নিজেকে সাহিত্যিক বলার চেয়ে ‘লেখক মাত্র’ বলতেই বেশি পছন্দ করতেন তিনি।

কিংবদন্তিতুল্য তাঁর এই বিনয় তাঁকে যেন অনেক বেশি কাছের মানুষ করে তুলেছে। বিনয়ের মধ্যেই তিনি খেলা করেছেন শব্দ নিয়ে, তৈরি করেছেন হেঁয়ালির খাসমহল, সৃষ্টি করেছেন অভিনব কৌতুক। কিন্তু সেই বিনয় কখনোই স্পষ্টবাদিতা থেকে সরে গিয়ে নয়। নিজেকে বরাবর ক্ষুদ্র প্রতিপন্ন করতে চাওয়া, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর গভীর বিষয়-ভাবনা চমকিত করে পাঠক-শ্রোতাকে। 

বাংলা শিশুসাহিত্যের কালজয়ী এবং জনপ্রিয় স্রষ্টাদের তালিকায় তাঁর নাম বরাবর উপরের সারিতেই জ্বলজ্বল করবে। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার কারণ নিজেই বুঝিয়ে দিচ্ছেন এই বলে – “সে আমি শিশু সাহিত্য করি না বলেই। ‘করি না’ না বলে পারি না বলাটাই ঠিক। সত্যিকার শিশুসাহিত্য করেছেন দক্ষিণারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোর, কুলদাচরণ, সুখলতা রাও, সুকুমার রায় প্রভৃতিরাই – শিশুদের জন্য লিখেছেন – শিশুদের মত করেই লেখা। সে কলম আমি পাব কোথায়! এ যুগে সে লেখনী আর সেই লেখা হারিয়ে গেছে বলেই আমার মনে হয়। কারো কারো হাতে সে ধরনের লেখা এখনও খেলা করে বটে, কিন্তু সে অতি বিরল। …আমার ছোটদের লেখায় কিছু পোলা থাকে আর পান থাকে – এছাড়া কী আছে আর? আমার লেখায় বেশ ভেজাল আছে, সেই অ্যাডাল্টারেটেড লেখা। ছেলেমেয়েদের অ্যাডাল্ট বানিয়ে ছাড়ে। আর সেই জন্যেই হয়তো তারা তা ভালোবাসে।” নিজের সম্পর্কে এমন চাঁচাছোলা বিশ্লেষণের পরেই তাঁর আরেকটি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি – “শিশুসাহিত্যের স্বর্ণযুগ আর নেই। শিশুই নেই তো শিশুসাহিত্য। শিশুরা কোথায় এখন? শিশুরা আর জন্মায় না, জন্মালেও বেঁচে থাকে না বেশিদিন, মানে, ঐ শৈশব অবস্থাটা অতি ক্ষণস্থায়ী এখন। সময় গতিতে শিশুরা সব বয়স্ক হয়েই জন্ম নিচ্ছে, দেখতে না দেখতে বুড়িয়ে যাচ্ছে – দেহের দিক থেকে নয়, মনের দিক থেকে।”

শিবরাম সত্যিই বড়ো চালাক মানুষ ছিলেন। নইলে ভবিষ্যৎ সমাজকে এত স্বচ্ছভাবে দেখার পরেও কিনা আজীবন বিনয় করে গেলেন!
 

Developed by DXDasia