কলকাতার শিল্পী সংগঠনের আঙিনায় নয়া সংযোজন ‘চাঁদের হাট’

সমকালীন সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত। শিল্পকলাকে চর্চাগত দিক থেকে বারেবারেই  নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে ও রূপায়ন করতে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা উল্লেখযোগ্য।

 

হর থেকে একটু বেশি পথই পেরোতে হয় সেখানে যেতে। তবে বেহালার প্রত্যন্ত পশ্চিমের এই ডেরায় একবার পৌঁছে গেলে চিন্তামুক্তি। সযত্নে বেড়ে ওঠা গাছপালা আর ছবি মূর্তির ঘরসংসার। বেশ গমগম করছে সৃষ্টি সম্ভারে।

‘চাঁদের হাঁট’-এর আজকের যে এই আলোক বিচ্ছুরণ তার এক দীর্ঘ যাত্রাপথ আছে। সে যাত্রার অন্যতম কুশীলব হলেন ১৯৮০ সালে সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা তরুণ দে। আজ থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে দেখা এক স্বপ্নের সযত্ন লালন আজকের এই চাঁদের হাটের তরুণ তুর্কীরা। দুর্গাপুজোর মাঠ সাজানো থেকে নিয়মিত শিল্পকর্মশালা। দোতলা সভাকামরায় আনুষ্ঠানিক সৃষ্টিকাজ বিশ্লেষণী আলোচনা থেকে নিকটবর্তী গুরুসদয় সংগ্রহশালায় ছবি মূর্তির প্রদর্শন সবেতেই পূর্ণ উদ্যম।

তেমনই এক উদ্যোগ দেখা গেল গত ২২ থেকে ২৮ মার্চ কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ্‌ ফাইন আর্টস এ। ‘LIFE AND TIME, The Changing Landscape’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে। প্রধান সারথি দিল্লী প্রবাসী শিল্পী প্রবীর গুপ্ত।

ঘটনাচক্রে উল্লেখ্য যে প্রবীরও ১৯৮০ সালের কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজের স্নাতক ও তরুণদের সহপাঠী। বদলে যাওয়া জীবন ও সময় দিগন্তে এই দুই শিল্পী সাঁইত্রিশ বছর পার করে দিয়েছেন।

প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছিলেন ‘চাঁদের হাট’-এর ১৩ জন ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্তের দু-জন, স্বয়ং প্রবীর, রাশিয়া ফ্রান্স ইংল্যান্ড ডেনমার্ক শ্রীলঙ্কার একজন ক’রে এবং বাংলাদেশের দুইজন। সব মিলিয়ে মোট তেইশ জন শিল্পী। প্রত্যেক শিল্পীর প্রকাশভঙ্গী ভিন্ন এবং শহর কেন্দ্রের অ্যাকাডেমিতে ভাব বিনিময়ের বেশ একটা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল রচিত হয়েছিল।

ভাবপ্রকাশের অছিলায় প্রত্যেকেই কিন্ত পরিচিত এবং প্রচলিত শিল্পপ্রকরণের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। যে কয়েকটি ভিডিও আর্ট ছিল এখানে তার মধ্যে এন পুষ্পমালার কাজটি গোটা প্রদর্শনীকে সমৃদ্ধ করেছে। এক মানবী মূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিস্থাপনের এক চলমান চিত্র সেটি। অসাড় হয়ে আসা এক একটি অঙ্গখণ্ডের উদ্‌ঘাটন যেন আমাদের কৌতূহলকে চরিতার্থ করে। জীবন ও সময়ের এমন সংগঠন উদ্বেল করে আমাদের।

প্রবীর গুপ্তর ভূমিকা এখানে দ্বৈত চরিত্রের। তিনি অংশগ্রহণকারী শিল্পী একই সঙ্গে  প্রদর্শনী শীর্ষকের সংযোগকারী। গোটা প্রদর্শনীটি যদি তার ধারাভাষ্য হয় তাহলে তার প্রত্যক্ষ কাজটি স্বগতোক্তির মতো।

প্রদীপ দাসের লোহার অর্গান, যন্ত্রস্থিত করে ফেলেছে যেন নগরদৃশ্যকেও। ভবতোষ সুতার কলকাতার পুজোমাঠে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে নানারকম মাধ্যমের সাথে পরিচিত। কলকাতার পুজো শিল্পের এ এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা অতিসাধারণ বা বহুপরিচিত মাধ্যমের চরিত্রকে উলটে পালটে দেখতে শেখায়। ভবতোষ শিখেছেন তা। না হলে অতি সাধারণ জলবাহী স্বচ্ছ পাইপের মধ্যে জীবনের অমন ফল্গু ধারা সৃষ্টি করতে পারতেন না। ছিল অয়ন সাহা, ধীমান সুতার, মল্লিকা দাসসুতারের অসামান্য সংযোজন। সব মিলিয়ে এক পরিনত জীবন গাথা। প্রদর্শনীর সাথেই ছিল শিল্প আলোচনাচক্র। সঞ্চয়ন ঘোষ, শুক্লা সাওয়ান্ত সুমনা চক্রবর্তীর আলোচনা যোগালো মনন চিন্তনের খোরাক। শিল্পবিশ্বের সারাৎসার অবলোকন।

Developed by DXDasia