মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ কার্যত বিরোধী ঐক্যকে আরো জোরালো করল
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ধর্মতলা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ৪৬ ঘণ্টার ‘সংবিধান বাঁচাও’ ধর্না প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে শীর্ষ আদালতের রায়ে তিনি খুশি, ফলে এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই লেখার বিষয় ধর্না নয়। যদি কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে রবিবার রাতে কেন্দ্রীয় এজেন্সি গ্রেফতার করতে সফল হত, তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় কী কী ঘটতে পারত, সেটাই এই লেখার বিষয়।
মমতা সাপের লেজে পা দিয়েছেন। যুদ্ধটা এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। চিট ফান্ড স্ক্যাম নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় এজেন্সি গত বেশ কয়েক বছর ধরে তদন্ত করে চলেছে। কাজ কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনও ধারণা নেই। এই এজেন্সি তাপসী মালিকের মৃত্যু, নন্দীগ্রাম হত্যাকাণ্ড, রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরি নিয়েও তদন্ত করে চলেছে। সেই সব তদন্তের বয়সের গাছ-পাথর নেই। কিছুই হয়নি। এবারে চিট ফান্ড তদন্তের কথা। সেটাকে সামনে রেখে প্রতিহিংসার রাজনীতি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের। এই ধরনের অভিযোগ ভারতের আরও অনেক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে করা হয়েছে অতীতে। এখনও হচ্ছে।
প্রায় চার ডজন অফিসার রবিবার রাতে কলকাতার নগরপালের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কেন? কথা বলতে এত জন! বোঝাই যাচ্ছে, উদ্দেশ্য ভিন্ন ছিল। এজেন্সির অফিসারেরা যদি এক দিনের জন্যও সিপিকে গ্রেফতার করতে সফল হতেন, তাহলে আরও কয়েক জন রাজ্য পুলিশের শীর্ষকর্তাকে ডাকাডাকি শুরু হত। গ্রেফতারও হয়তো হতেন কেউ কেউ।
এমন ঘটলে কী হত? সামনে ভোট। এই কাজে শাসকদল সফল হলে, রাজ্য পুলিশের মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব হত। নির্বাচনের সময় রাজ্যের পুলিশে উপর ছড়ি ঘোরানো সম্ভব হত। লাল ডায়রি-ফায়রি তো কথার কথা। এই অপারেশন সফল হলে এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মরত।
কিন্তু তা হল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নেক্সট স্টেপ’ কী হতে পারে, এটা অনেক দুঁদে রাজনীতিকও আগাম আন্দাজ করতে পারেন না। বুদ্ধদেববাবু যদি আন্দাজ করতে পারতেন, সিঙ্গুরে মমতার আবস্থান ভবিষ্যতে তাঁর সরকার পতনের কারণ হবে, তিনি কখনই তা করতে দিতেন না। কিন্তু, তিনি সেটা আগাম আন্দাজ করতে পারেননি। মমতা যে সেদিন রাতেও সব রীতি ভেঙে সিপির বাড়িতে হাজির হবেন সেটা পরিকল্পনাকারেরা কল্পনাতেও ভাবতে পারেননি। আর, এই যাওয়াতে পুলিশের কাছে যে বার্তা স্পষ্টভাবে গেল, সেটা হল, রাজ্য সরকার তার পুলিশের পাশে অবিচলভাবে আছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ধর্নার সিদ্ধান্ত, সারা দেশে শাসকদলকে কার্যত একঘরে করে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ধর্না, এবং তার পাশে যেভাবে সারা দেশের বিরোধীদল এসে দাঁড়ালো, তাতে, এজেন্সি দিয়ে এই যে ‘প্রতিহিংসা মডেল’, এই মডেলটাই ভোঁতা করে দিলেন মমতা। এখনই এই মডেল অন্য কোনও রাজ্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পাঁচবার ভাবতে হবে এজেন্সিকে। কারণ তেমন ঘটলেই, মমতা কলকাতায় যে পথ দেখিয়েছেন, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে লখনউতে, পাটনায় বা হায়দরাবাদে।
বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার এই পর্বের লড়াইটা শুরু হয় প্রথম যখন তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্য টাকা দিলে রাজ্য প্রকল্পের নামও দেবে। এরপর তিনি ঘোষণা করলেন, আয়ুষ্মান ভারতে পশ্চিমবঙ্গ থাকবে না। তাঁর যুক্তি, এই রাজ্যে তিনি আয়ুষ্মানের চেয়ে অনেক উন্নত মানের প্রকল্প চালু করেছেন। ভোটের আগে স্বাস্থ্য প্রকল্প নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। অমিত শাহের রথ রুখে দিয়েছেন তিনি। রথযাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে বিজেপি। এরপর ব্রিগেডে ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার’ জমায়েত করে মমতা প্রমাণ করেন বিজেপি-বিরোধী লড়াইটা তিনি সামনের সারিতে দাঁড়িয়েই করতে চান।
মমতা কোথায় আলাদা? রাজ্যের আর যে সব নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত করেছে বা করছে, তাঁদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগটা ব্যক্তিগত দুর্নীতির। এবং বিরাট বিরাট টাকার অঙ্কের। মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর ছবি কেনা হয়েছে চিট ফান্ডের টাকায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই টাকা মমতার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি। মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং ‘জাগো বাংলা’ পত্রিকার তহবিলে ঢুকেছে। ‘জাগো বাংলা’র সম্পাদক বা মালিক তিনি নন। আর টাকার পরিমাণটাও ২ কোটি মতো। আর একটা সোজা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। সেটা হল, কংগ্রেস এবং বিজেপির বহু সংখ্যক শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে প্রমাণ না হওয়া দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রাফাল নিয়ে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি দুর্নীতিপরায়ণ বলছেন। ‘ন্যাশনাল হেরল্ড’ নিয়ে গান্ধী পরিবাররের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করছে বিজেপি। বিজেপি আমলে অমিত শাহের ছেলের ব্যবসার আকাশছোঁয়া নিয়ে বৃদ্ধি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার সম্প্রতি বই লিখে অভিযোগ এনেছেন, তিনি যখন গুজরাট দাঙ্গা থামাতে সেনা বাহিনী নিয়ে আহমেদাবাদ গিয়েছিলে, সেনাকে প্রায় ২৪ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল। গভীর রাতে তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাড়ি গিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, গাড়ির অভাবে সেনা দাঙ্গা-স্থলে যেতে পারছে না, রাজ্য সরকার গাড়ি দিচ্ছে না বলে। তাঁর অভিযোগ, তাতেও কাজ হয়নি। হলে হয়তো বহু প্রাণ বাঁচত। সাহারা-বিড়লা পেপার্সে নরেন্দ্র মোদী-সহ দেশের বেশ কয়েক জন নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, যা সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেয়। অমিত শাহের বিরুদ্ধে এনকাউন্টার কিলিংয়ের অভিযোগ এনেছেন গুজরাটের এক প্রাক্তন পুলিশ কর্তা। বিজেপি পার্টি ফান্ড এখন অন্য সব রাজনৈতিক দলের ফান্ডের তুলনায় সর্ববৃহৎ। সেই অর্থের ৯০ ভাগ এসেছে অজানা সূত্র থেকে। গত সপ্তাহে কোবরা পোস্ট কয়েকটি শেল কোম্পানি (টাকা সরানোর জন্য তৈরি কাগজে কলমে কোম্পানি) থেকে বিজেপি ফান্ডে কয়েক কোটি টাকা আসার কথা প্রকাশ্যে আনে স্টিং অপারেশন করে। বিজেপি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। এবং এসবই অভিযোগ। এখনও প্রমাণ হয়নি। ভারতের রাজনীতি এরকমই। ভোটে জিততে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। আর সেই অর্থ বেশিরভাগ সময়ই আসে অজানা সূত্র থেকে। যদি দাঁড়িপাল্লায় বসানো যায়, মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এই বিরাট তালিকায় অনেক নিচের দিকে থাকবে। রাজনৈতিক দূর্নীতির অভিযোগের সামগ্রিক চিত্রে অনেক বেশি জ্বল জ্বল করছে অন্যেরা।
একটা প্রশ্ন উঠেছে। বিজেপি যদি চিটফান্ড দুর্নীতি নিয়ে এতই ‘সিরিয়াস’, তাহলে তারা অভিযুক্ত মুকুল রায়কে দলে নিলেন কেন? কেনই বা কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর অসমের বিজেপি মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্পর্কে এজেন্সি নীরব হয়ে গেল। এরও সদুত্তর নেই।
একটা লড়াই শুরু হয়েছে। কারণ আক্রমণকারী ভয় পাচ্ছে, তার জমিদারি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। ফলে এই লড়াইয়ে যে কোনও যুদ্ধনীতি মানা হবে না, তা বলাই বাহুল্য। এবং এই লড়াই আরো কদর্য হয়ে উঠতে পারে আগামী দু’মাসে।
ছবিসূত্র – হিন্দুস্তান টাইমস