১৮৪০ সাল নাগাদ শুরু হয় নির্মাণের কাজ
চোখের দেখায় মনে হতে পারে এথেন্সের কোনও প্রার্থনাগৃহ। অথচ এই হেরিটেজ বিল্ডিং দাঁড়িয়ে রয়েছে কলকাতার বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম একটির বুকে। স্ট্র্যান্ড রোড ও হেয়ার স্ট্রিটের ক্রসিং-এ দাঁড়ানো এই বাড়ির মুখের সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে গঙ্গা, অনবরত। অথচ রোজের কলকাতা যাতায়াতে কোথাও যেন আলাদা করে চোখে পড়ে এই বাড়ি এখনও।
সাল ১৯৭৫। ২৬ জুন ইন্দিরা গান্ধীর সিদ্ধান্তে প্রায় চাপিয়ে দেওয়া হল সেন্সরশিপ অফ প্রেস। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার বম্বে এডিশনে এই খবরটি কভার করা হয় অবিচুয়ারি কলামে। সেখানে লেখা হয়– “D.E.M O'Cracy beloved husband of T.Ruth, father of L.I. Bertie, brother of Faith, Hope and Justice expired on 26 June”।
এতে কোনও সন্দেহ নেই, সাংবাদিকতার স্বাধীনতার দরুণ নানা সময় ক্ষমতায় থাকা নানা শাসক সারা পৃথিবী জুড়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন। শাসক দলের কাছে কোনওদিনই সুখের হয়নি এই স্বাধীনতা। পরাধীন ভারতেও এই ছবিই বজায় রেখে গেছে ইংরেজ সরকার। কথা বলা থেকে লেখা, গান, নাটক সর্বত্র সেন্সর করে গেছে দিনের পর দিন। অথচ এর মধ্যেও কিছু পদাধিকারী ইংরেজরা নানা সময়ে বিশ্বাস রেখেছেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতায়। তাঁদেরই একজন ছিলেন গভর্নর জেনারেল চার্লস মেটক্যাফে। সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা সংক্রান্ত তাঁর যে অবদান তা অনস্বীকার্য।
১৮৩৫ থেকে ১৮৩৬ সাল পর্যন্ত ভারতের গভর্নর জেনারেল পদে ছিলেন চার্লস মেটক্যাফে। মাত্র একবছরের কর্মজীবনে একমাত্র তাঁরই দূরদৃষ্টি ছিল এটা বোঝার, সাংবাদিকতা শাসনমুক্ত হওয়া উচিত। মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত সঠিক খবর এবং শাসকের নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনাও হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকরভাবে। মেটক্যাফে তাঁর কর্মজীবনে সংবাদমাধ্যমগুলির দ্বারা জমা পড়া পিটিশনের ভিত্তিতে তাঁদের আশ্বাস দেন বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হবে। ১৮২৩ সালে জন অ্যাডামের তৈরি সমস্ত রেগুলেশন তিনি নাকচ করে দেন এরপরেই। মেটক্যালফে হলেন একমাত্র ব্রিটিশ যিনি গভর্নর জেনারেল পদে থাকাকালীন ১৮২৩, ’২৫ ও ’২৭-এর সমস্ত প্রেস অ্যাক্ট বাতিল করে দেন ও তিনি পদবি পান লিবারেটর অফ ইন্ডিয়ান প্রেস।
চার্লসের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের দরুণ তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে ইউরোপিয়ান ও ভারতীয়দের মিলিত সিদ্ধান্তে ঠিক করা হয় একটি লাইব্রেরি তৈরি করার কথা। ১৮৩৮ সালে এই কাজটি দেখার জন্য গঠিত হয় একটি কমিটি। যে জায়গাটি ঠিক করা হয় লাইব্রেরি তৈরির জন্য, তা তখন হরিনারায়ণ শেঠ নামক এক বনেদি বাঙালির জমি।
১৮৪০ সাল নাগাদ শুরু হয় নির্মাণের কাজ। উনিশ শতকের ব্রিটিশ এম্পেরিয়াল আর্কিটেকচারের প্রতিফলনে এই নির্মাণের নকশাটি বানান সে সময়ের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট সি কে রবিনসন। ১৮৪৪ সালে বাড়িটি সম্পূর্ণ হলে মেটক্যাফের হাতে তৈরি ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির সমস্ত সংগ্রহ ধর্মতলা থেকে সরিয়ে আনা হয় এই বাড়িতে।
প্রায় দশফুট উঁচু একটি নিরেট বেসমেন্টের উপর তৈরি এই স্থাপত্যে রয়েছে ৩০টি করিনথিয়ান কলম। যেগুলি উচ্চতায় ৩৬ ফুট লম্বা। হলে ঢোকার মূল পথটি পশ্চিমদিকে যেখানে দৈত্যাকার কিছু সিঁড়ি অবস্থিত। এই পথটি যদিও এখন বন্ধ। বাড়িটিতে এখন ঢোকার একমাত্র রাস্তা পূর্বদিকে।
ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি শুরু হয় মেটক্যাফের হাতেই। প্রায় ৪৬৭৫টি বই ফোর্টউইলিয়ামের কলেজ লাইব্রেরি থেকে তিনি সরিয়ে আনেন ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরিতে। জানিয়ে রাখা ভালো ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির প্রথম মালিক ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ। ১৮৪৪ সালে মেটক্যাফে হল নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার পর এই লাইব্রেরি তার নতুন ও স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায়।
আপাতত বাড়িটির একতলায় এশিয়াটিক সোশ্যাইটির কিছু বিদেশি জার্নাল ও পাণ্ডুলিপি নিয়ে চলছে একটি বিভাগ। দোতলায় রয়েছে কিছু অফিস, প্রদর্শনশালা ও বিক্রির কাউন্টার। যেগুলি মূলত চালিত হয় আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দ্বারা।