Cake Mixing & Pop-up : স্বাবলম্বন ও নতুন সমাজ গড়ার দৃঢ় ‘প্রত্যয়’

মনোরোগীদের জীবন সহায়তা কেন্দ্র ‘প্রত্যয়’-এ বসেছিল কেক বানানোর আসর

ৎসব-আনন্দ সকলের। মানবাধিকারের সার বিষয় : সমানাধিকার ও যোগ্য মর্যাদা, মনে রাখেন না সমাজের তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মানুষরা। মানসিক ব্যাধি আর পাঁচটা ব্যাধির থেকে আলাদা কিছু নয়, সেখানেও আরোগ্যের পথ থাকে, স্বাভাবিক যাপনে ফেরার অদম্য ইচ্ছে থাকে; সামাজিক ‘ট্যাবু’ তা মেনে নিতে শেখেনি। ঠিক এই মনোভাবের প্রতিই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলেছেন প্রত্যয়-এর আবাসিকরা (Bengal’s first half way home Pratyay)

বড়োদিনের মরশুমে একটি কেক-পপআপ কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে প্রত্যয়-এর আবাসিকরা আবারও ‘ট্যাবু’-নির্ভর এই সমাজকে মনে করিয়ে দিতে চাইলেন, তাঁরা সক্রিয় কর্মী।

সুস্থ মনোরোগীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত আবাস, মনোরোগ থেকে সেরে ওঠা মানুষদের মনের মতো ঘর : প্রত্যয়। লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালের ঠিক উল্টোদিকের এটিই তাঁদের ঠিকানা হয়ে উঠেছে রাজ্য সরকার ও অঞ্জলি-র প্রচেষ্টায়। সারা বছর ধরেই নানান কর্মকাণ্ডে মেতে থাকেন প্রত্যয়-এর আবাসিকরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ছবি আঁকা, স্থাপনা শিল্প, সেরামিক সামগ্রী বানানো, ছবি তোলা এমনকি রান্নাবান্না! কয়েকদিন আগেই বড়োদিনের মরশুমে একটি কেক-পপআপ কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে প্রত্যয়-এর আবাসিকরা আবারও ‘ট্যাবু’-নির্ভর এই সমাজকে মনে করিয়ে দিতে চাইলেন, তাঁরা সক্রিয় কর্মী। রাজ্য সরকারের সহায়তায়, অঞ্জলি-র সাহচর্যে আবাসিকরা দেখিয়ে দিচ্ছেন নিজেদের দায়িত্ব নিতে তাঁরা সমর্থ, আর পাঁচজনের মতোই! শুধু তাই নয়, কেক-মিক্সিংয়ের মতো পাঁচতারা হোটেলের উচ্চবিত্ত সংস্কৃতিকে তাঁরা সাম্যতা বুঝিয়েছেন। এদিন অনুষ্ঠানে আবাসিকদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কমলালেবুর কেক বানাচ্ছিলেন সরকারি আধিকারিক সহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা। উল্লেখ্য, এদিন আবাসিকদের বানানো খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল, তাঁদেরই বানানো সেরামিকের পাত্রে।

কেক-মিক্সিংয়ের মতো পাঁচতারা হোটেলের উচ্চবিত্ত সংস্কৃতিকে তাঁরা সাম্যতা বুঝিয়েছেন। এদিন অনুষ্ঠানে আবাসিকদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কমলালেবুর কেক বানাচ্ছিলেন সরকারি আধিকারিকরা সহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।

অনুষ্ঠানে সামিল হয়েছিলেন নব নিযুক্ত নবীন আইএএস অফিসাররা, তেজস্বী রাণা, সুরভি সিংগল, যুগ্ম অধিকর্তা শর্মিষ্ঠা ঘোষ (সমাজকল্যাণ দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)-সহ মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের মতে, প্রত্যয় সরকারি-অসরকারি যৌথ কাজের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। প্রত্যয় পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার রত্নাবলী রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেছেন, “এই প্রথম এত বড়ো পরিসরে ওঁদের নিয়ে কেক বানানোর আয়োজন করা হল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্রম দিয়ে যাঁরা কেক-পেস্ট্রি বানাতে পারেন, বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে মিশতে পারেন, তাঁরা কেন কর্মী স্বীকৃতি পাবে না! ওঁদের আত্মীয়স্বজন থেকেও নেই। সুস্থ হলেও বাড়ির লোক ওঁদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান না। এক্ষেত্রে ওঁদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা সবচেয়ে জরুরি। আমাদের চ্যালেঞ্জ সেই জায়গায় ওঁদের পৌঁছে দেওয়া, বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করা।” রত্নাবলীর এই দৃঢ় মনোভাবই বলে দিচ্ছিল, আবাসিকদের নিয়ে প্রতিটি কর্মশালার সারকথাই হলো মনোরোগী তকমা মুছে ‘সক্রিয় কর্মী’ হয়ে ওঠার ‘প্রত্যয়’। শুধুমাত্র কেক বা পেস্ট্রি বানানোই নয়, অত্যন্ত পেশাদারি ভাবে হাইজিন মেনে প্রত্যেকের হাতে ছিল অ্যাপ্রন ও গ্লাভস।

 

এদিন কেক-পপআপ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রত্যয়-এ চলছিল ক্যুইয়ার শিল্প-প্রদর্শনী। এক প্রান্তিকের সঙ্গে অন্য এক প্রান্তিকের স্বর মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল এক নতুন সিম্ফোনি। যে সিম্ফোনির সঙ্গে মিশে ছিল কমলালেবুর আঘ্রাণ, আবাসিকদের আনন্দঘন ‘জিঙ্গেল বেল’, সত্যিকারের বড়োদিনের স্বপ্ন। যে স্বপ্নে ভেদাভেদ নেই, সমান্তরাল পৃথিবীর স্বপ্ন আছে, আছে মনের মতো ঘর, মনের মতো মন।

____ 
প্রতিবেদন: মৌনী মণ্ডল | ছবি: সুমন সাধু
 

Post Tags
Developed by DXDasia