‘অত্যন্ত দু:খের সঙ্গে একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, যে, মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষকেরা প্রত্যেকেই একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী’
১৭৪ ই, রাসবিহারী এভিন্যুর একটি ছোট্ট ঘর। সেখানে মাঝেমাঝে উড়ে আসে ময়মনসিংহের জলছাপ মেঘ। জানলা দিয়ে উঁকি দেয় কিশোরগঞ্জের রোদেলা দুপুর। ছোটবেলার বাড়ি। বাঁশের গেট পেরোলেই একটা ঝাঁপালো বকুলগাছ। চোখ বুজলেই আজকাল এইসব ভুলতে চেয়েও ভুলতে-না-পারা পুরোনো ছবি ভীড় জমায় খুব। মা কি ডোয়ার্কিনের হারমোনিয়াম বাজিয়ে এবার ব্রহ্মসঙ্গীত গাইবেন?
দেবব্রত। চোখ দু'টি বোজা। জর্দাপান। পাশে রাখা হারমোনিয়াম। আর হারমোনিয়ামের ওপর একটা খোলা চিঠি। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড লিখেছে রেকর্ড কোম্পানির মালিককে। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড দুটি গানকে বাতিল করেছে। প্রথম গানটি হল "পুষ্প দিয়ে মারো যারে"। বাতিল করবার কারণ দর্শানো হয়েছিল প্রয়োজনাতিরিক্ত যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার এবং যার ফলে গানের সংবেদন ও আবেগ ক্ষুন্ন হয়েছে! আর দ্বিতীয় গানটি হল "তোমার শেষের গানের"। এতে টেম্পো অনাবশ্যক দ্রুত, যন্ত্রানুসঙ্গ অত্যধিক আর গানটি নাকি স্বরলিপি অনুযায়ী গাওয়া হয়নি! এই চিঠির তারিখ জুলাই ২৫, ১৯৬৯।
অথচ কী আশ্চর্য! আজকেই তো আর গান গাওয়া শুরু হয়নি। প্রথম রেকর্ড সেই ১৯৬১ সালের ১ লা মার্চ। প্রকাশ করেছিলেন হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি। গান দু'টি ছিল 'যেতে যেতে একলা পথে " এবং "আকাশভরা সূর্য তারা"। সেই তখন থেকেই তো একটানা। কতদিন হয়ে গেল! কখনো এই অভিযোগ ওঠেনি তো! না, না …উঠেছিল তো! একটু অন্য সুরে। প্রথম চিঠি যেটি বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড পাঠায় হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানিকে, তার তারিখ ৬ ই মার্চ , ১৯৬৪। এতে ৪ টি গানের উল্লেখ আছে। দু'টি গান বিনা বাধায় অনুমোদিত। "শুধু যাওয়া আসা' আর "গোধূলিগগনে মেঘে"। আর অন্য দু'টি? "এসেছিলে তবু আসো নাই"- এটি নতুন করে রেকর্ড করতে হবে। কেন? কারণ বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অবাঞ্ছিত ও অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রানুসঙ্গ। ফলে গানের ভাব নষ্ট হয়েছে, তা বিকৃত হয়েছে। আর "মেঘ বলেছে যাব যাব"। এতে অসম্ভব নাটকীয়তার প্রকাশ। যে ধরনের প্রতিধ্বনি -কক্ষ রেকর্ডিং -এর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে; তা গানের সূক্ষ্ম কারুকাজগুলিকে নষ্ট করে দিয়েছে।
দেবব্রত এই চিঠি নিয়ে বিশ্বভারতীর কলকাতা শাখার অফিসে দেখা করে জানতে চেয়েছিলেন, এই শব্দগুলির ব্যুত্পত্তিগত অর্থ ঠিক কী! তিনি এও জানতে চেয়েছিলেন, গানের মাঝে মাঝে যন্ত্রানুষঙ্গের সময়সীমা ঠিক কতক্ষণ থাকবে, সে নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কোনো নির্দেশ আছে কিনা! বলাই বাহুল্য, কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি ।
এর বেশ কয়েকমাস পর যখন এই "এসেছিলে তবু আসো নাই" গানটি নিয়ে আর এক খ্যাতনাম্নী গায়িকা জর্জ বিশ্বাসকে বলেন যে রেকর্ডিং -এ সামান্য ত্রুটি তাঁর কানে বেজেছে এবং যেহেতু তিনিও বিশ্বভারতীর অনুমোদন বোর্ডের সদস্যা, তাই যদি গানটি আর একবার ঠিকঠাক রেকর্ড করা যায় ! কোথায় গলদ? "চঞ্চল চরণ গেল ঘাসে ঘাসে" এই পংক্তিটির প্রথম "চন" কথাটি নাকি স্বরলিপি মেনে হয়নি! জর্জ তখন ওই গায়িকাকে গেয়ে শোনাতে বলেন এবং তারপর খুব বিনীতভাবে জানান যে ওই গায়িকার গাওয়াও স্বরলিপি অনুসরণ করেনি কারণ "আপনি 'চন' কথাটি নীচের মধ্যম সুর থেকে চড়া কোমল গান্ধার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ায় পুরো দুই মাত্রা লেগে যাচ্ছে, অথচ স্বরলিপির বইয়ে আছে শুধু একমাত্রা। তবে মধ্যম সুরটি গ্রেসনোট হিসেবে স্বরলিপির বইয়ে লেখা হয়েছে।"
এরপর শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে দেখা করে দেবব্রত গানটির টেপ শোনান। তারিখ ছিল ১৯/১/৬৫। শান্তিদেব লিখিতভাবে নিজের মতামত জানান, "এইভাবে সুর অবশ্যই হতে পারে এতে কোনো দোষ নেই।"
এরপর কিছুদিন শান্তিতেই কেটেছিল। তবে একটি ব্যাপারে জর্জ বিশ্বাস খুব কঠোর নীতি নিয়েছিলেন। তা হল, তাঁর গানের রেকর্ডের প্রচারে কোনো আতিশয্য চলবে না। কোনো রেকর্ড কোনো পত্রপত্রিকায় সমালোচনার জন্য দেওয়া যাবে না। কোথাও কোনো রেকর্ডে গায়কের আলোকচিত্র দেওয়া যাবে না। তবে প্রথম যখন লং প্লেয়িং রেকর্ড হয়, তখন বহু অনুরোধ উপরোধের পর তিনি একটি ছবি দিতে স্বীকৃত হন।
এরপর সেই চিঠি। যার উল্লেখ আগেই করেছি। আর সেই দুটি গান। "পুষ্প দিয়ে মারো যারে" আর "তোমার শেষের গানের"। কী কী কারণে অনুমোদন পায়নি, তাও লিখেছি। এই চিঠির উত্তরে জর্জ বিশ্বাস যে চিঠি দেন ইংরিজিতে, তার একটি ভাষান্তর দিই বরং। তারিখ ১৬/৮/১৯৬৯।
"মাননীয় মহাশয়,
আমি খুব বিশদে রবীন্দ্ররচনা বিচার করে দেখেও কোথাও এই তথ্য পাইনি, যে যন্ত্রানুসঙ্গ বা টেম্পো নিয়ে স্বয়ং গুরুদেব কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। অত্যন্ত দু:খের সঙ্গে একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, যে, মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষকেরা প্রত্যেকেই একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী। অবশ্য এ বিষয়ে এখনো আমি ওয়াকিবহাল নই, এই একনায়কতন্ত্র ঠিক কবে থেকে চালু হয়েছে!
আমি অনেক দিন রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে প্রত্যক্ষ চর্চায় রত এবং নিজের বোধ বুদ্ধি দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ণমাত্রায় সচেতন। আমরা তো পশু পাখি কীট পতঙ্গ নই, যে নিয়মের বাইরে যেতে ভয় পাব। নতুন কিছু চাইব না বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করব না। আমি নিজের মতো করে রবীন্দ্রনাথে আস্থা অটুট রেখে কিছু সামান্য চিন্তাভাবনার প্রয়াস করেছি। এখনো তো বাকি রয়ে গেছে কত কিছুই। এখন যদি আমাকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের নিয়মরীতি মেনে নিয়ে নিজেকে বদলাতে হয়, তার প্রস্তুতিপর্বেও কিছু সময় চাই।
অনুগ্রহ করে যদি আমার গানগুলি অনুমোদন করেন, কৃতজ্ঞ থাকব। কারণ আমার বয়স হচ্ছে আর নতুন করে রেকর্ডিং প্রচুর অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপার।"
এই চিঠির কোনো জবাব আসেনি। এবং ওই দুটি গানের রেকর্ডিং প্রকাশিত হতেও পারেনি।
এরপর কিছু রেকর্ড হয়েছিল বটে, কিন্তু জর্জ নিজেই আর খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না।
জর্জ প্রচারবিমুখ ছিলেন। তবুও জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। তাহলে কি এর পেছনে পেশাগত অসূয়া? হিসেব বলে, রেকর্ড কোম্পানির মালিক খবরের কাগজে সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, জর্জ বিশ্বাস যেখানে বছরে রয়ালটি পান আটত্রিশ হাজার টাকা, সেখানে তাঁর পরের নাম যে শিল্পীর, তিনি পান ষোলো হাজারের মতো! মানে অর্ধেকেরও কম! এরপরেও কি চলার পথে ফুল বিছানো থাকবে?
যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার নিয়ে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড একটি নিয়মাবলীর খসড়া পাঠায়। তার সংক্ষিপ্তকরণ করেই বলি:
১। উপযোগী যন্ত্র: এস্রাজ, বাঁশি, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, অর্গ্যান। পাখোয়াজ, বাঁয়া-তবলা, খোল, ঢোল, মন্দিরা।
২। গানের মূল আবেগ বজায় রাখতে হবে। সেইমতো অনুকূল আবহসঙ্গীত। যেখানে কন্ঠস্বরে বিশ্রাম আবশ্যক, সেটুকুই দেওয়া হবে।
৩। যন্ত্র ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন। গানের ভাব বুঝে যন্ত্র ব্যবহৃত হবে।
৪। যন্ত্র কখনোই কন্ঠকে অতিক্রম করবে না।
৫। তালযন্ত্রের সঙ্গতকালে তালের ছন্দ বা বোল কথার ছন্দ ও লয়ের বিপরীত যেন না হয়
৬। যে সব গানে কথার ওপর ঝোঁক আছে, সে সব গানে তালবাদ্যকেও ছন্দের অনুকূল থাকতে হবে।
এত বিধিনিষেধ? রবিগান কানের ভিতর দিয়া মর্মে পৌঁছবে, তবেই না প্রাণ আকুল করবে! গান তো একাকী গায়কের নয়! গাইতে হবে তাত্পর্য হৃদয়ঙ্গম করে, আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। জর্জ বীতস্পৃহ। না:, আর প্রয়োজন নেই যুদ্ধের। অসম যুদ্ধ। প্রতিপক্ষ বড়ই সবল।
এই যে এত কথা, স্বয়ং ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কিন্তু তাঁর রবিকার গান নিয়ে পিয়ানো বাজিয়ে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন, ছাপানো স্বরলিপির অদলবদল করে গানও শেখাতেন। জর্জ বিশ্বাস এই একই ধরনের ভাবনায় ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ংও তো এর বিপক্ষে ছিলেন না। তিনি তো নিজেই বলেছিলেন, "প্রথম ধাক্কাতেই মনে হয়, ইওরোপীয় সঙ্গীতের হার্মনি আমাদের সঙ্গীতে চলিবে না। কিন্তু তাহা ইওরোপীয় সঙ্গীতে ব্যবহার করা হয় বলিয়াই কি একান্তভাবে ইওরোপীয়? তাহা হইলে তো ইওরোপে রোগীর ওপর যে অস্ত্রচিকিত্সা চলে, তাহা বাঙালীর দেহে চালাইতে যাওয়া ভুল! অর্থাৎ মূল বিষয় হইল আমাদের গানে হার্মনি ব্যবহার করিলে তার ছাঁদ স্বতন্ত্র হইবে। যৌবনের স্বাভাবিক সাহস যাহাদের আছে এবং লক্ষ্মীছাড়ার খ্যাপা হাওয়া যাহাদের গায়ে লাগিল, এই একটি আবিষ্কারের ক্ষেত্র তাহাদের সামনে পড়িয়া।"
জর্জ বিশ্বাস এই নিয়েই ভেবেছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের যে স্বতন্ত্র এক আবেগ-উৎসারী ক্ষমতা, তাকে আরও জোরালো করার বাসনায় এই যন্ত্রানুষঙ্গের ব্যবহারে পরীক্ষা নিরীক্ষা। রবীন্দ্রনাথ যে নিজেই একবার বলেছিলেন, ''গানের গতি অনেকখানি তরল। তাই গায়ককে খানিক স্বাধীনতা দিতেই হয়।"
শ্রোতারাই তো গ্রহণ বা বর্জনকারী। জর্জ ভালো লাগা মন্দ লাগার বিচার তাঁদের ওপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি এ বিষয়ে গুরুদেবকেই প্রথম ও শেষ কথা বলে ভেবে এসেছেন, যিনি বলেছিলেন, "আমার বিশ্বাস, সঙ্গীতেও সেই বাহিরের সংস্রব প্রয়োজন হইয়াছে। তাহাকে প্রাচীন দস্তুরের লোহার সিন্দুক হইতে মুক্ত করিয়া বিশ্বের হাটে ভাঙাইতে হইবে।"
প্রথমদিকে যদি বা নিয়ম ভাঙার বা পাশ্চাত্য যন্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহারের অনুকরণ প্রয়াস থাকে, ধীরে ধীরে আমরা নিজেরাই তো ঠিক পথটি খুঁজে নিতে পারি। জর্জ ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনায় সেই উজ্জ্বল আলোর দিশা দেখিয়েছিলেন।
তিতিবিরক্ত জর্জ চিঠিতে লিখেছিলেন, "আমাদের মাতামহীর আমলের জীর্ণ কাঁথা দিয়ে ঘিরে রাখলে এবং পলতে করে ফোঁটা ফোঁটা নিয়মের বিধান খাইয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে টিকিয়ে রাখা যাবে, এমন কথা রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভাবতে বা বলতে পারেননি।"
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "কন্ঠ গায়কের। গায়কের কন্ঠে গায়ক তো গোচর হবেই! তাই প্রকাশের বা ভাবের প্রকারভেদও থাকবে। মূল কাঠামো ঠিক রেখে প্রকাশভঙ্গীর স্বাধীনতা মঞ্জুর।"
সেই স্বাধীনতাটুকু মুঠিতে ভ'রে নিয়ে অকৃপণ ঔদার্যে তা আবার আমাদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন জর্জ। তবুও কি বলব জর্জ বিশ্বাস বিতর্কিত শিল্পী?
জর্জ অনুধাবন করেছিলেন, ঐতিহ্য এক অন্য ব্যাপার। ঐতিহ্যমোহে আচ্ছন্ন লোকজনের পক্ষে নতুন কোনো ব্যাপার, রীতি মেনে নেওয়া শক্ত ও সময়সাপেক্ষ। শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলার হাওয়া গায়ে লাগেনি জর্জ বিশ্বাসের। ওই হাওয়া গায়ে লাগিয়ে যাঁরা গান শিখেছেন, তাঁরা ভাবেন তাঁরাই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তাঁদের পক্ষে অন্য কোনো দখিনা বাতাস বরদাস্ত করা শক্ত।
জর্জের সামনে চলার পথে "শক্ত উঁচু একটি দেওয়াল" ছিল। আর সামনে খোলা ছিল তিনটি পথ।
১। নিজের রুচি, শালীনতা বিসর্জন দিয়ে দেওয়াল নির্মাতাদের সঙ্গে লাঠালাঠি ও তাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার।
২। দেওয়ালের কাছে নতি স্বীকার করে দেওয়ালের নীচে একটি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে মাথা নীচু করে পথ চলা।
৩। একটি সিঁড়ি বানিয়ে মাথা উঁচু করে ওই দেওয়াল অতিক্রমের চেষ্টা।
ওই উঁচু দেওয়ালটি কী? "শান্তিনিকেতনী সংস্কারের ভূত কাঁধে চেপে বসা কয়েকটি লোকের মস্তিষ্কপ্রসূত ভূতকালের ভূতে পাওয়া ধারণা"।
কোন পথটি বেছে নিয়েছিলেন তিনি?
"যে মানসিকতা আমার ভেতরে জন্মেছে এবং বড় হয়ে উঠেছে, সেই মানসিকতা নিয়ে, তিন নম্বরের পথটি ছাড়া আর আমার কোনো উপায়ই নেই অর্থাত সিঁড়ি বানিয়ে মাথা উঁচু করে দেওয়ালটি টপকে যাওয়া। কিন্তু সিঁড়ি বানাতে সময় লাগবে। যদি বানাতে পারি, মাথা উঁচু করে আবার পথ চলা শুরু করব। যদি না পারি, নিজের অক্ষমতাকেই দায়ী করব।"
এই লেখা ১৭ ই নভেম্বর, ১৯৭৬। এর পর আর মাত্র পৌনে চারবছর আয়ুষ্কাল অবশিষ্ট ছিল জর্জ বিশ্বাসের। তাতে ওই সিঁড়ি বানানোর কাজ তেমন করে আর করা হয়ে উঠল কই! আমাদের চেতনার গর্ভগৃহটি শুধু অন্ধকার থেকে খানিক আলোয় এসেছিল।
বৃষ্টিদিন ছিল। ১৯৮০ – র ১৮ ই অগাস্ট। জর্জ চলে যাচ্ছিলেন। একা। যদিও পাশে ছিল অনেক ভালোবাসার জন। জর্জের চোখ দুটি বন্ধ ছিল যদিও… যদিও বা নীরব কন্ঠে ছিল… "আমার জ্বলেনি আলো অন্ধকারে…" ….তখনও কিন্তু অন্ধকার হয়নি। অন্ধকার ছিলই না। একটা দুটো ফোঁটা বৃষ্টিও তো ছিল। সেই বৃষ্টিজলে কিশোরগঞ্জের মাদকগন্ধ। জর্জ চলে যাচ্ছিলেন। পেরিয়ে যাচ্ছিলেন অন্তবিহীন পথ। এক অভিমানের অন্ধকার থেকে অন্য এক অভিমানের আলোয়।
অভিমানের অন্য নামটি যে অহঙ্কারও বটে!