নতুন ফরাসি অবতারে ফের পথে প্রত্যাবর্তন করতে চলেছে অ্যাম্বাসাডর
“জীবিতাবস্থায় উত্তমকুমারকে আমি দুইবার দেখেছি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তখন সবে কলেজ। একদিন পূর্ণ সিনেমা হলের উপরে বসন্ত কেবিন থেকে আমরা বন্ধুরা মিলে ওঁকে দেখলাম। আজও মনে আছে, দেখলাম ঘিয়ে রঙা প্যান্ট আর টকটকে লাল রঙের হাফহাতা শার্ট পরে সাদা অ্যাম্বাসাডর থেকে নেমে এলেন তিনি। কী অপূর্ব সেই উত্তমকুমারের চেহারা।” বঙ্গদর্শনের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘শনিবারের কড়চা’-র (‘অতি উত্তম’ সংখ্যা) একটি লেখায় স্মৃতিচারণ করেছিলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী সাত্যকি ঘোষ।
শুধু উত্তম কুমারের এই গল্পটি নয়, এই শহরের এমন কত্ত সব গল্পের সঙ্গে অ্যাম্বাসাডর (Ambassador) জড়িয়ে রয়েছে, এই প্রজন্ম তা জানে না। সবই বিগত দিনের। তখন অ্যাম্বাসাডর বলতেই হলুদ ট্যাক্সি বুঝত না শহরবাসী। অ্যাম্বাসাডর তখন প্রকৃতপক্ষেই এই দেশের চারচাকা-জগতের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। এই শহরের বনেদিয়ানা, আভিজাত্য, পরিশ্রম—সব কিছুর সঙ্গে তাল রেখে ঘুরেছে এই গাড়ির চাকা আর স্টিয়ারিং।

শুধু কলকাতা নয়, গোটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি সহ তাবড়-তাবড় নেতা-মন্ত্রী-কেউকেটারা চড়ে বেড়িয়েছেন এই গাড়িতে। রাস্তায় সাদা অ্যাম্বাসাডর মানেই যেন গণমান্য কেউ চলেছেন। ১৯৫৮ সালে ‘অ্যাম্বাসাডর’ গাড়িটি বাজারে আনে হিন্দুস্তান মোটরস। হুগলির উত্তরপাড়ার কারখানায় তৈরি করা এই গাড়ি সারা দেশে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কতই না স্মৃতি এই ব্র্যান্ডের গাড়িকে ঘিরে। একটা সময় পর্যন্ত মন্ত্রী-আমলা থেকে শুরু করে নায়ক-নায়িকা সবাই ছিলেন এ গাড়ির সওয়ারি। ভারতে ‘প্রাইভেট কার’ মানেই গোলগাল অ্যাম্বাসাডর।

আটের দশক পর্যন্ত ভারতের বাজারে একচ্ছত্র ভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে হিন্দুস্থান মোটরসের এই গাড়ি। ১৯৮০ সালে অ্যাম্বাসাডরকে প্রথম চ্যালেঞ্জ জানায় মারুতি ৮০০। কিন্তু তাতে এই গাড়ির চাহিদা ধসে যায়নি। কিন্তু নয়ের দশক থেকে দলে দলে ঢুকতে শুরু করল দেশি, বিদেশি নিত্যনতুন ব্র্যান্ডের গাড়ি।
বাজার ছেয়ে যায় দেশি-বিদেশি সব নামী গাড়ির মডেলে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেকে বদলাতে পারেনি অ্যাম্বাসাডর গাড়ি। ফলে টিকেও থাকতে পারছিল না। ক্রেতাদের নতুন পছন্দ আর আধুনিকতার দাপটে চাহিদা কমতে কমতে তলানিতে ঠেকে গিয়েছিল অ্যাম্বাসাডরের। আটের দশকের মাঝামাঝিতেও বছরে অ্যাম্বাসাডরের বিক্রি ছিল ২৪ হাজারের মতো। ২০১৩-১৪ সালে সেই বিক্রি গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র আড়াই হাজারে। ২০১৪ সালের ২৪ মে বন্ধ হয়ে যায় উত্তরপাড়ার কারখানার উৎপাদন। ২০১৭ সালে জলের দরে হিন্দুস্তান মোটরসের ঐতিহ্যবাহী ‘অ্যাম্বাসাডর’ ব্র্যান্ড বিক্রি হয়ে যায় ফরাসি গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানি পিউজো এসএ-র কাছে। মাত্র ৮০ কোটি টাকায় এই ব্র্যান্ড কিনে নেয় তারা।

জানা যাচ্ছে, নতুন ফরাসি অবতারে ফের পথে প্রত্যাবর্তন করতে চলেছে অ্যাম্বাসাডর। ফরাসি অটোমোবাইল কোম্পানি পিউজো (Peugeot)-এর সহযোগিতায় অ্যাম্বাসাডর 2.0 মডেলটি বাজারে আনছে সিকে বিড়লা গ্রুপের অনুমোদিত কোম্পানি, হিন্দ মোটর ফাইন্যান্সিয়াল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (HMFCI)। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, আগামী দু’বছরের মধ্যে গাড়িটি ভারতের রাস্তায় চরাফেরা শুরু করে দেবে। হিন্দুস্থান মোটরসের চেন্নাই প্লান্টে তৈরি হবে অ্যাম্বাসাডরগুলি।
তথ্যসূত্রঃ
বঙ্গদর্শন আর্কাইভ
www.getbengal.com