ভালোবাসার শহরে বইমেলায় ভালোবাসার উদযাপন
কলকাতা হল ভালোবাসার শহর। প্রেমের শহর। যতই ঠান্ডা পড়ুক এই শহরে পা দিলে হৃদয়ে উষ্ণ লাভা ঢেলে দেবেই। আর এই শহরে হওয়া আন্তর্জাতিক বইমেলা কি কাউকে একা হতে দিতে পারে? যেখানে সারাবছর প্রেমের মরশুম সেখানে বইমেলা ব্যতিক্রম কেন হবে!
এই বইমেলা বাঙালির সরস্বতী পুজো ছাড়াও আর এক ভ্যালেন্টাইন। গাছে গাছে কুল পাকুক বা না-পাকুক তাদের পায়ের ধুলো উড়িয়ে অঞ্জলি ছাড়া বইমেলা অসম্পূর্ণ। রং-বেরঙের শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে ভরা একেকটা স্টল যেন একেকটা মণ্ডপ। ফুলগুলো যেন বই। প্রতিটা আলিঙ্গন যেন প্রসাদ।
হাতে অল্প টাকা। কলেজ পড়ুয়া। তাদের ফুডস্টলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই। বই কিনবে। কিন্তু কী বই কিনবে? দু-জনের জমানো টাকায় গাড়ি ভাড়াসহ দু-তিনটে বই হবে। স্টলে স্টলে ঘুরে পছন্দের বই কিনে নেয়। তারপর স্টলের মধ্যেই ঠিক করে কে আগে পড়বে।
কলকাতা বইমেলা এমন এক চুম্বক, সবকিছুকে কাছে টেনে নেয়। তার কাছে লোহা বা কাচের ফারাক নেই। সে শুধু টানে। কাছে টানে। বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে গেছি সেই মিলনমেলা প্রাঙ্গণ থেকে। তখন কলেজ পড়ুয়া। পাঠ্যবই আর সাহিত্যের বই দুইয়ের দ্বন্দ্ব চলে ক্রমাগত। পত্রিকা নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে বসতাম। এই প্যালিভিলিয়নের প্রেম ছিল জমাটি। দু-জন (প্রেমিক-প্রেমিকা) মিলে টেবিল সামলাচ্ছে। কেউ একজন আগে এসে বেঁধে দিচ্ছে ব্যানার। কেউ বই সাজাচ্ছে। আবার মেয়েটি হয়তো বাড়ি থেকে কিছু বানিয়ে এনেছে। দু-জনের টিফিন। ১০-১২ দিন ছোট্ট একটা যেন পরিবার। সংসার সম্পর্কে তখনো তাদের অভিজ্ঞতা সুতো বুনতে শেখেনি। এই বইমেলা যেন লাটাই হয়ে তাদের সুতো ছেড়েছে। নীল আকাশের মাঝে তারা উড়ছে। পাখির গল্প শুনছে। মেঘের স্পর্শ নিচ্ছে। রামধনু দেখছে। একই জলের পাউচ আধাআধি ভাগ করে নিচ্ছে। এটাই আসলে বইমেলার প্রেম।
হাতে অল্প টাকা। কলেজ পড়ুয়া। তাদের ফুডস্টলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই। বই কিনবে। কিন্তু কী বই কিনবে? দু-জনের জমানো টাকায় গাড়ি ভাড়াসহ দু-তিনটে বই হবে। স্টলে স্টলে ঘুরে পছন্দের বই কিনে নেয়। তারপর স্টলের মধ্যেই ঠিক করে কে আগে পড়বে। কেউ কাউকে এক পা জমি ছাড়তে নারাজ। শেষপর্যন্ত ছেলেরাই ব্যর্থ হয়। কিন্তু শর্ত একটাই, সময়সীমা। পাঁচদিন বা সাতদিনে বই পড়ে শেষ করতে হবে। কী আর করবে মেয়েটিও কিন্তু কিন্তু করে মেনে নেয়।
এরপর, কেউ আসে কানের দুল কিনতে। কেউ আসে ফিশফ্রাই খেতে। কাপড়ের ব্যাগ কিনতে। এরা কি বইমেলার আপনজন নয়? হাতে হাত দিয়ে মেলার মধ্যে যখন ঘুরে বেড়ায় মেলা তখন নিজেকে একা ভাবতে পারে? তাদের স্পর্শ মেলা কি পায় না? তারা তো যেতে পারত মিলেনিয়ামপার্ক, বাবুঘাট, ভিক্টোরিয়া, লেকগার্ডেন্স…গঙ্গার পাড়ে দু-পা দুলিয়ে দেখতে পারত সূর্যের বধূবরণ বেশ। কেন তারা বইমেলায় আসে? ধুলো উড়ে… ধাক্কাধাক্কি লাগে… তারা বইমেলায় আসে… বই কিনুক বা না-কিনুক তারা হৃদয়ের পাঠক হয়ে মনের গ্রন্থাকারে সাজিয়ে রাখে ক্যাটালগ। না-হোক মুদ্রিত, ছাপার অক্ষরে না-থাক তাদের তাকে জলের পাউচ ঘিরে থাকুক উল্লাস।

চন্দ্রবিন্দুর বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ে, বইমেলা ধুলো, গার্গী শ্রেয়সী… হাওয়ায়, হাওয়ায়… বইমেলার ধুলোয় যদি গার্গী, শ্রেয়সীর পায়ের ছাপ না থাকে সকল পথকষ্ট বৃথা। আর গার্গী, শ্রেয়সীদের ভিড়ে কেউ যদি তার পুরোনো প্রেমিকাকে খুঁজে পায়, তার হৃদকম্পনে মেলা কি একটুও দুলবে না? তাদের হাতে ওপর হাত রেখে আবার কি বলবে না— ওই, ডাকছে বই?