বইমেলার বেস্টসেলার

বঙ্গদর্শন.কম অভিযান চালালো কলকাতা বইমেলার মাঠে

৪৬তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। কোভিডের পর দ্বিতীয় বইমেলা। বইমেলা প্রাঙ্গন হয়ে উঠেছে দুর্গাপুজো কিংবা পুনর্মিলন। কোভিড জনজীবনকে তুমুল ধাক্কা দিয়েছে ঠিকই, তবে জ্ঞানশূন্য মানুষকে জ্ঞান দিয়েছে এ কথা অনস্বীকার্য। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য সব পাল্টে গিয়েছে নিজ অভ্যাসে। কেউ কেউ তাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন, কেউ কেউ স্রোতের পালে হাওয়া দিতে পারেননি। বইমেলায় সেলফি স্টিকের গুরুত্ব বেড়েছে। তা আর নিছক ছবি তোলার মাধ্যম হয়ে থাকেনি, অর্থের জোগান দিচ্ছে। ইউটিউবার, ভ্লগাররা এসে গিয়েছেন মেলার মাঠে। মহামারীর পর যখন চাকরি চলে যাচ্ছে ঘরে ঘরে, ব্যবসার হাল খারাপ, তখন একদল বিভিন্ন বয়সের মানুষ শুরু করেছিলেন ইউটিউব চ্যানেল। যদিও তাতে বই ব্যবসায় ভাটা পড়েনি এতটুকুও। কলেজস্ট্রিটে মাছি তাড়ানো প্রকাশককেও দেখা যাচ্ছে একমুখ হাসিতে। বইমেলায় কী না হয়! বই বিক্রি আর দেদার খাওয়া দাওয়া, আড্ডার পাশাপাশি টুকরো প্রেম! আরও একটু বেশি হলে ক্ষতি কী! আনন্দ, দে’জ, পত্রভারতী, আজকাল, ধানসিড়ি, গাংচিলে পাঠকদের ভিড় বজায় রয়েছে আগের মতোই। এখনও স্বনামধন্য সাহিত্যিক শংকর স্টলের বাইরে বসে থাকছেন। কিছু সময় আবার দেখা যাচ্ছে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় পাঠকদের সই দিচ্ছেন, কথা বলছেন। সত্তর, আশি, নব্বই ও তার পরবর্তী সময়ের কবিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। চেনা ছন্দে পাঠকদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠেছেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী। আর বইয়ের পালে হাওয়া লেগেছে।

এখন কথা হচ্ছে, এবারের বইমেলার বেস্টসেলার তাহলে কোন বইগুলি? এই প্রশ্ন রেখে বঙ্গদর্শন.কম-এর তিনজনের একটি দল বইমেলার ১ নম্বর গেট থেকে ৯ নম্বর গেট অবধি অভিযান চালিয়েছিল গত কয়েকদিন ধরে। সেখান থেকে খোঁজ পাওয়া গেল বেশ কয়েকটি বইয়ের, যা বিক্রি হচ্ছে হটকেকের মতো। সুপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত কল্লোল লাহিড়ীর ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’ ২০২২ সালের বইমেলা থেকে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। এবারেও তার খামতি নেই। তার একটা অন্য কারণ হয়তো উপন্যাস অবলম্বনে ওয়েব সিরিজ নির্মাণ। আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে উপন্যাসের নাম, গল্প। ওয়েব সিরিজটি এখনও মুক্তি পায়নি, তার আগে পাঠক বইটি কিনে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন নিজস্ব স্বভাবে। সম্প্রতি বইটির বাংলাদেশ সংস্করণ প্রকাশ করেছে বাতিঘর। একুশে বইমেলাতেও দেদার বিকোচ্ছে ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’। কল্লোল লাহিড়ীর আরও একটি বই ‘বাবার ইয়াশিকা ক্যামেরা’, এই বইয়ের বিক্রিও দেখার মতো। এটিও প্রকাশ করেছে সুপ্রকাশ। কল্লোল লাহিড়ীর উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া যায় মফস্‌সল আর দেশভাগের করুণ কাহিনি। সেখানে গঙ্গার ঘাটও আছে, আবার কাঁটাতারের দাগও মুছে যায়নি। বাঙালি পাঠক কেউ কেউ নিজের ছিন্নমূল জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পান বলেই হয়তো কল্লোল লাহিড়ী সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন।

কল্লোল লাহিড়ীর উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া যায় মফস্‌সল আর দেশভাগের করুণ কাহিনি। সেখানে গঙ্গার ঘাটও আছে, আবার কাঁটাতারের দাগও মুছে যায়নি।

সন্মাত্রানন্দের প্রায় প্রত্যেকটি উপন্যাসের বই এবারের বেস্টসেলার। বইগুলি প্রকাশ করেছে ধানসিড়ি। ‘নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা’ এক সময় কলেজস্ট্রিট বা অনলাইনে পাওয়া যেত না। বইটির এতই চাহিদা ছিল যে, ছাপার সঙ্গে সঙ্গে সব কপি নিঃশেষিত হয়ে যেত। সন্মাত্রানন্দ লিখিত ‘ছায়াচরাচর’, ‘হাওয়ার মতন, নেশার মতন’, ‘ধুলামাটির বাউল’, ‘তোমাকে ছুঁতে পারিনি’ বইগুলি সংগ্রহের জন্য ধানসিড়িতে প্রতিদিনকার ভিড় দেখার মতো। লেখকের গভীর দর্শনবোধকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছেন প্রবীণ থেকে নবীন পাঠকের দল – এ দৃশ্য খুব কম লেখকের জীবনেই আসে।

লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে ‘বোধশব্দ’ পত্রিকার টেবিল ঘিরে উন্মাদনা থাকে প্রতি বছর। এবারেও তার অন্যথা হয়নি। কারণ বোধশব্দ প্রকাশ করেছে সত্তরের দশকের বিস্মৃত কবি প্রবীর দাশগুপ্তের সংকলন। বইমেলায় খানিক দেরিতে ঢুকলেও এ গ্রন্থের বিক্রি দেখার মতো। প্রবীর দাশগুপ্তের মৃত্যু হয় মাত্র একুশ বছর বয়সে, ১৯৮৯ সালে। আজ তিন দশক পর পুনরায় তাঁকে ফিরে দেখছে একবিংশ শতক। প্রবীরের অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত কবিতা-সহ গ্রন্থবদ্ধ যাবতীয় রচনা, পাণ্ডুলিপি, ফটোগ্রাফ, চিত্রকর্ম এক জায়গায় করা হয়েছে এই সংকলনে। প্রবীর – একা ও রঙিন। কে বলে তিনি বিস্মৃত? কে বলে হারিয়ে যাওয়া কবিরা উপযাপিত হন না? একালের কবিরা এই সংকলন কিনছেন, পড়ছেন, অন্যকেও পড়াচ্ছেন, আলোচনা করছেন। লিটল ম্যাগাজিন তাঁবু চত্বরে মুখরিত হচ্ছে প্রবীর দাশগুপ্তের সেই বিখ্যাত কবিতা, “যে ছেলেটি শান্ত আর যে মেয়েটি আছাড়ি-পিছাড়ি/ উহাদের দেখা হোক, শালিখঠাকুর –”

প্রবীর – একা ও রঙিন। কে বলে তিনি বিস্মৃত? কে বলে হারিয়ে যাওয়া কবিরা উপযাপিত হন না? একালের কবিরা এই সংকলন কিনছেন, পড়ছেন, অন্যকেও পড়াচ্ছেন, আলোচনা করছেন।

সদ্য প্রয়াত হয়েছেন লেখক সুজন দাশগুপ্ত। ওয়েব সিরিজের কল্যাণে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে বসত করে আছে গোয়েন্দা একেন। লেখক প্রয়াত হলে যেন তাঁর বইয়ের কদর বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কথা রুঢ় হলেও মেনে নিতে অসুবিধা নেই। দ্য ক্যাফে টেবিল প্রকাশিত সুজন দাশগুপ্তের ‘একেনবাবু সমগ্র’-এর বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। এখনও পর্যন্ত ছয়টি খণ্ড রয়েছে। প্রতিটি খণ্ডই এককথায় সুপারহিট। তবে সুজন দাশগুপ্তের আকস্মিক প্রয়াণ ততোধিক স্তব্ধ করে রেখেছে বাংলা সাহিত্যকে।

বেস্টসেলার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আর সেখানে দে’জ-এর বই থাকবে না, এ কি হয়! ২০২৩ সালে প্রকাশিত দে’জ পাবলিশিং-এর বেস্টসেলারগুলির মধ্যে প্রথমেই থাকবেন শংকর। তাঁর নতুন উপন্যাস ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চ্যাটার্জি’ দেদার বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও অমর মিত্রের ‘র‍্যাডক্লিফ লাইন’, অঞ্জন দত্তের ‘ড্যানি ডিটেকটিভ ২’, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘গদ্য সংগ্রহ ৩’, তরুণ মজুমদারের ‘শাপলা-শালুকের দিনগুলি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৯ঋক্যালের স্টলে নাকি বিরিয়ানি পাওয়া যাচ্ছে। বইমেলার মাঠ তাই সরগরম। আসল ব্যাপার হচ্ছে, বিরিয়ানি না, ‘বিরিয়ানির বই’ পাওয়া যাচ্ছে। ক্যালকাটা বিরিয়ানির নেপথ্য নায়ক জি ইংলিস, জেমস কিড ও উইলিয়াম কেরিকে উৎসর্গীকৃত এই বই সম্পাদনা করেছেন সামরান হুদা ও দামু মুখোপাধ্যায়। বিরিয়ানির সঙ্গে ঢাকা নাকি কলকাতা, কার সম্পর্ক বেশি মাখোমাখো, পারসিক, মোগল, অওয়ধি – কে আগে কে পরে, আজকের কলকাতা ও বিরিয়ানি-বিলাস ইত্যাদি নিয়ে চমৎকার এই বই এবারের বইমেলার অন্যতম বেস্টসেলার।

২০২৩ সালে প্রকাশিত দে’জ পাবলিশিং-এর বেস্টসেলারগুলির মধ্যে প্রথমেই থাকবেন শংকর। তাঁর নতুন উপন্যাস ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস চ্যাটার্জি’ দেদার বিক্রি হচ্ছে।

ভিন্ন স্বাদের বই করতে লোকমুখে সুনাম অর্জন করেছে মনফকিরা। স্টলে ঢুকতেই দেখা গেল সিনেমা ও শিল্পকেন্দ্রিক অসামান্য কিছু বই। প্রকাশকদের কথায় সেগুলি প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। এই যেমন – খ্রিস্তভ কিয়েসলোভস্কির ‘প্রেম ও হত্যা’ (দুটি ছবির চিত্রনাট্য, পরিচালকের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার), ভিনসেন্ট ভ্যান গখের শেষ সাত মাসের চিঠির বাংলা সংস্করণ ‘এ ভাবেই চলে যেতে চাই’ (১ জানুয়ারি-২৩ জুলাই, ১৮৯০), পাবলো পিকাসোর ‘আমি : আমার ছবি’ ইত্যাদি। সর্বসাধারণদের জন্য এসব বই না হলেও শিল্পপ্রেমী মানুষেরা মনফকিরার কাজ সম্বন্ধে সচেতন। শুধুমাত্র কলকাতা নয়, অন্যান্য রাজ্য থেকে আগত পাঠকরাও এই বইগুলি নেড়েচেড়ে দেখছেন, কিনছেন।

এক নম্বর হলের ভিতর সুসজ্জিত মায়া বুকস-এর সম্ভার। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মহীনের আদি ঘোড়া তাপস বাপি দাসের জীবনী। ‘রিইনকারনেশন অফ ডার্ক স্ট্যালিয়ন’ (জার্নি অফ অ্যান আনসাং লেজেন্ড) ইংরেজি ভাষায় এই বইটি লিখেছেন ঋষিতা দে। বইটি প্রকাশ করেছে দিল্লির দ্য বুক বেকার্স এবং বুকস্ট্রিট পাবলিকেশনস। এছাড়াও গতবছর বইমেলায় প্রকাশিত তাপস বাপি দাসের আত্মজীবনীমূলক বাংলা পুস্তিকা ‘মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি’ প্রকাশ করেছিল পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস। এই দুটি বই-ই এবারের বইমেলার অন্যতম বেস্টসেলার। সদ্য কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়েছেন তাপস বাপি। রাজ্য সরকারের অধীনে তাঁর চিকিৎসা চলছে। মহীনের জীবিত ঘোড়াদের মধ্যে একজন এই তাপস বাপিকে ‘মিস’ করছে বইমেলার মাঠ। বইয়ে বইয়ে ধরা আছে গান নিয়ে তাঁর সংগ্রাম, তাঁর পড়াশোনা, এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর ভালোবাসার পাঠ। মহীনের ঘোড়াগুলির প্রতি ভালোবাসায় পাঠকরা তাই সংগ্রহ করছেন এ দুটি বই।

আসলে কোন বই বেস্টসেলার আর কোন বই নয়, তা দিয়ে কোনোকিছুই বিচার হয় না। কত গুরুত্বপূর্ণ সব বই হারিয়ে যায় চেনা লেখকদের ভিড়ে। কে রাখে তার হিসাব! সময় নিশ্চয় সবকিছুর হিসাব রেখে দেয়। তবে এই যে বাংলা বই মানুষ পড়ছেন, ভাবছেন, উন্মাদিত হচ্ছেন – এটাই বা কম কী!

Developed by DXDasia