
দেশভাগ নিয়েই দময়ন্তীর লেখা এই ডকু-ফিকশন
দেশভাগ, পার্টিশান বা বাঁটোয়ারা- শব্দগুলো আজ আমাদের কাছে নিছক শব্দ মনে হলেও বহু মানুষের কাছে নিজ বাসভূমে পরবাসী হয়ে সব ফেলে বিদেশে চলে যাবার যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি। এই দেশভাগ নিয়েই দময়ন্তীর লেখা ডকু-ফিকশন ‘সিজনস অব বিট্রেয়াল’। এটি যখন গুরুচণ্ডালীতে বেরোচ্ছিল, আমি ২/১ টা পর্ব পড়লেও, ভুলে যেতাম পরের পর্ব পড়তে। তাই এবার কলকাতা বইমেলা যাবার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এটাকে বই আকারে পাওয়া। আনন্দের ব্যপার হচ্ছে বইটা আমি শুধু কিনিনি, লেখিকার অটোগ্রাফও পেয়েছি।
‘সিজনস অব বিট্রেয়াল’- এর কাহিনি বোনা হয়েছে ১৯৩০ থেকে ১৯৫০-এর নানান সময়ের ঘটনা দিয়ে। ডকু-ফিকশনের কেন্দ্রে আছে কিশোরগঞ্জের একটি পরিবার, যারা দেশভাগের পরে চলে আসে ভারতে, কিন্তু এই ‘চলে আসা’টুকু অত্যন্ত ঘটনাবহুল। কাহিনি শুরু হয় ১৯৫০ সালে, কিশোরী জুঁইয়ের এক কাপড়ে নিজভূমি ছেড়ে বান্ধবীর আত্মীয়দের সঙ্গে কলকাতায় চলে যাওয়া দিয়ে। দেশভাগের পরপরই পূর্ব পাকিস্তানে আসতে থাকে মোহাজিররা। এরা উর্দুভাষী ভারতীয়, এবং অত্যন্ত লোভী। অপরের বাড়ি ও নারীর প্রতি সীমাহীন লোভ এদের (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই সম্প্রদায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও লুন্ঠনের দোসর ছিল)। কিশোরগঞ্জে আসা বিহারীরা কুমতলব আঁটে জুঁই-সহ তিন কিশোরীকে অপহরণ করার, ঘটনাক্রমে তা জানতে পেরে তিনটি কিশোরীর পরিবার তাদের পাঠিয়ে দেয় ঐ পাড়ে। জূঁইয়ের প্রথম ঠাঁই হয় ছোটমাসির বাড়িতে।
আরও পড়ুন
আমুদে বাঙালির জীবনচর্যায় ‘আম’-এর দাপট
মাত্র চার বছর আগে ঘটে গেছে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দ্বি-জাতিত্বের মত অদ্ভুত একটি তত্ত্ব মোতাবেক একটি দেশ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে, একভাগ ‘শ্যাখেগো দ্যাশ’, আরেক ভাগ ‘মালাউনগো দ্যাশ’। উল্লিখিত পরিবারটির বাবা যোগেশ এবং আসন্ন প্রসবা মা লাবণ্য রয়ে যান কিশোরগঞ্জ। ১৯৫০-এর দাঙ্গার পর পরিস্থিতি আরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। স্থানীয় মুসলিম লিগ নেতাদের ইশারায় “হিন্দুগো কম দামে জিনিষ ব্যাচন” পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় যোগেশ কলকাতায় চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। যোগেশের তিন ছেলে- সুহাস, প্রভাস এবং ভানু কলকাতায় পড়ে। তারা যে মেসে থাকে সেখানে যে আলোচনা চলে, সেটা বেশ পরিচিত- গান্ধী গান্ধী কর এই এত লোক মরল, এত লোকের ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেল, কই গান্ধী তো অনশনে বসল না? হ্যাঁ, একেবারে প্রাণে মেরে ঠিক করেনি, কিন্তু এগুলোও তো দেখবে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে ব্লগার হত্যায় অনেককে ঠিক এমন সুরে হত্যাকে ভ্যালিডেট করতে দেখেছি। এই বই থেকে আমি একটা আইনের কথা জানতে পারলাম- Abducted Persons (Recovery & Restoration) 1949। এ বিষয়ে আরও জানার প্রচেষ্টা জারি থাকবে আমার।
কাহিনিতে দু’টি চরিত্র আছে – অমরিন্দর এবং জামু, চরিত্র দু’টির ব্যাপ্তি সংক্ষিপ্ত হলেও, আমার মনে অভিঘাত অনেক বেশি। অমরিন্দর শিখ, পাকিস্তান থেকে দেশত্যাগের সময় তাদের পরিবারস্থ নারী ও শিশুদের শিখখি রক্ষার্থে হত্যার বিবরণটা পড়ার সময় বাইরে ছিলাম, আমি এত জোরে হিঁইইই করে উঠেছিলাম যে আশেপাশের সবাই তাকিয়েছিল। অন্যদিকে জামু হিন্দিভাষী অনাথ বালক, কলকাতায় এসেছে দিল্লি থেকে। পেটচুক্তিতে কাজ করতে যাবার সময় একদিন অমরিন্দর তাকে পথে ধরে তার যৌনাঙ্গটি দেখতে চায়। জামু দৌড়ে সরলাদের বাড়িতে ঢোকে, অমরিন্দর তার পিছু ধাওয়া করে সে বাড়িতে আসে, হাতে তার খোলা কৃপান। সরলার দৃঢ়তায় জামু বেঁচে যায়। পুরো ঘটনাটা পড়ে বিশ্বাস করবেন আমি প্রায় মূর্ছা যাচ্ছিলাম। একজন বৃদ্ধ প্রতিশোধের নেশায় এমনই উন্মাদ যে একটি ছোট্ট ছেলে মুসলমান প্রমাণিত হলে তাকে হত্যা করবে!
খুশবন্ত সিংয়ের ট্রেন টু পাকিস্তান বইয়ে দিল্লি থেকে আগত ট্রেন ভর্তি লাশের কথা পড়েছিলাম। আর ‘সিজনস অব বিট্রেয়াল’ বইয়ে ছোট্ট জামুর বয়ানে দিল্লিতে পাকিস্তান থেকে আগত ট্রেন ভর্তি লাশের কথা পেলাম। আরও পেলাম একটি ভয়ানক খবর, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে ভৈরব-আখাউড়া লাইনের ট্রেন মেঘনার ওপর দাঁড় করিয়ে সমস্ত হিন্দু যাত্রীকে হত্যা করা হয়, যারা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন প্রাণ বাঁচাতে, তাদের মাথায় ইঁট ছুঁড়ে হত্যা করা হয়! এই নিহতদের মধ্যে ছিলেন জুঁইয়ের কাকা মনীশও।
এছাড়াও আছে নানান ঘটনা, যেগুলো দিয়ে দেশভাগের পূর্বাপর পরিস্থিতিগুলো বুঝতে সহায়তা করবে। বাংলা ভাষায় দেশভাগের ওপর বই মনে হয় খুব বেশি নেই, তাই এই বইটি একটি মূল্যবান সংযোজন বলতে হবে। পুরো বইটাই আসলে একটি ভয়াবহ সময়ের প্রামাণ্য দলিল। এর প্রতিটি পাতাতেই কোনো না কোনো তথ্য আছে। আরেকটা দারুণ ব্যপার হচ্ছে বইয়ে আছে প্রচুর বইয়ের রেফারেন্স, যা অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য সোনার খনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে লাজবন্তী কাউরের বয়ানটি পড়তে উৎসুক, যিনি শিখখি রক্ষায় কুয়োতে ঝাঁপিয়ে পড়েও বেঁচে গেছেন।
দ্বি-জাতিত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের চরম মূল্য দিতে হয়েছে আমাদের ১৯৪৬ এবং ১৯৫০ সালে। সে বিষবাষ্প রয়ে গেছে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সাম্প্রদায়িকতার যে নিদর্শন পাই বাংলাদেশের বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের মন্তব্যঘরে, ভারতের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে এবং আমাদের আশেপাশে- তা এই বিষবাষ্পেরই ফল। কয়েকশ’ বছর একসাথে বসবাস করে একদিন জানা গেল আমরা নাকি দুই জাতি! যারা আমাদের মনে বিষ ঢুকিয়ে আলাদা করেছে, তাদের কোনো বিচার হয়নি, যে সব রাজনীতিবিদরা এই বিষবাষ্পকে বাতাস দিয়েছে তারা আজও পূজিত হয়।
