অতিমারিতে বাংলার মেয়েদের লড়াই লিপিবদ্ধ হল জিনাত রেহেনা ইসলামের গ্রন্থে

জিনাত রেহেনা ইসলামের ‘লকডাউনের দিনলিপি’ বইয়ের পাঠ-প্রতিক্রিয়া

২ মার্চ, ২০২০ ঘোষিত হল প্রথম করোনাকালীন লকডাউন। তারপর আমরা সকলে গৃহবন্দি হয়ে গেলাম। “তার ঠিক তিন মাসের মাথাতেই আমার কাছে নানান ফোন আসতে থাকে। প্রত্যেকের একটাই কথা, দিদি, আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। দিনমজুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তখন আমাদের ‘ফেমিনিজম.কম’ পত্রিকার পক্ষ থেকে আমি বেরোতে শুরু করি নানা জায়গায়। পুলিশের অনুমতি নিয়ে সেইসব এলাকার ভিতরে গিয়ে দেখি সত্যিই মহিলাদের খুব খারাপ অবস্থা। কয়েকদিন পর জানলাম, সোনার দোকান খোলা আছে, সেখানে মহিলারা গয়না বন্দক রেখে সংসার চালাচ্ছেন। সেইসব দেখে আমি ফেসবুকে লেখালেখি শুরু করলাম। এমনকি মহিলাদের এলাকায় গিয়ে তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ফেসবুক লাইভ করতে শুরু করি, যাতে তাঁদের তৈরি শাড়ি-চুরিদার-ব্যাগ এসব বিক্রি হয়। তখনই আমার কাছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রকাশকের পক্ষ থেকে ফোন আসে এবং বলা হয় সব লেখা যাতে ফেসবুকে না দিই, এগুলো নিয়ে তাঁরা বই করতে ইচ্ছুক। কিন্তু তখন আমি এতটাও ভাবিনি আসলে। পরে লেখাগুলি বই আকারে প্রকাশ করার দায়িত্ব নেয় সৃষ্টিসুখ প্রকাশনা সংস্থা।” – কথাগুলি বলছিলেন লেখিকা জিনাত রেহেনা ইসলাম। পেশায় একজন শিক্ষক। যিনি মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় দৌড়ে গেছেন, মহিলাদের পাশে থেকেছেন, নতুন উদ্যমে কর্ম-সংস্থানের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। আর এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ রয়েছে ‘লকডাউনের দিনলিপি’ বইতে।

সম্প্রতি বইটি পাঠ করার সুযোগ হল। পাঠ শেষে ফিরে গেলাম ২০২০ সালের সেই ভয়ংকর দিনগুলোতে। সবেমাত্র আমাদের জীবন-অভিধানে ঢুকতে শুরু করেছে ‘কনটেন্টমেন্ট জোন’, ‘কোয়ারেন্টিন’, ‘শারীরিক দূরত্ব’, ‘লকডাউন’ এই জাতীয় শব্দবন্ধ। আমাদের জীবন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। আমরা কেউ খেতে পেয়েছি, কেউ অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছি। আর রাজধানী দিল্লি থেকে হাজার হাজার মাইল হেঁটেছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা, লক্ষ্য ঘরে ফেরা। মহিলারা পরিবারতন্ত্র-পিতৃতন্ত্রের শিকার হয়েছেন – বেড়েছে মহিলাদের উপর অত্যাচার – তা শারীরিকভাবে হোক বা মানসিক। জিনাত রেহেনা ইসলাম অনেক বছর ধরে মেয়েদের নিয়ে লেখালেখি করছেন। তাঁর গভীর ভাবনার বিষয়ে বারবার চলে আসে মেয়েদের অবস্থান, মেয়েদের লড়াইয়ের কথা। রুদ্ধশ্বাস লকডাউনে রচিত ‘লকডাউনের দিনলিপি’ সেই অতিমারি দিনের নতুন সংযোজন। যেখানে লেখিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন বাংলার মেয়েদের লড়াই ও সংগ্রামের আগুনঝরা অধ্যায়গুলি।

বইটির উৎসর্গে লেখিকা লিখেছেন, “বিশ্বের সমস্ত লড়াকু মহিলাদের, যাঁরা বিশ্বাস করেন, প্রতিদিনের ভাতের থালাটা নিজেদের উপার্জনের অর্থে প্রস্তুত হোক।” – আমরা সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘মহানগর’ চলচ্চিত্রটির সঙ্গে পরিচিত। সেখানে দেখেছি প্রধান চরিত্র আরতি আর গৃহবধূ হয়ে থাকতে চাইছে না। সে বাইরের পৃথিবীটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। বাধা প্রচুর। তবুও আরতি হন্যে হয়ে খুঁজছে একটুকরো স্বাধীনতা। জিনাত যে কথাগুলি উৎসর্গপত্রে লিখেছেন, ‘মহানগর’ ছবিটি দেখলে যেন অক্ষরে অক্ষরে তা মিলে যায়। আলোচ্য বইয়ের শুরুতেই রয়েছে লকডাউনে নারীর যাপন। এছাড়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিভাগ এই বইয়ের সম্পদ। যেমনঃ ‘আজও কি চিনতে পেরেছি বাড়ির মহিলাদের?’, ‘শাহিনবাগ ছড়িয়ে আছে বহরমপুরের রাস্তায়’, ‘যে-মায়েরা আজ পথ দেখাচ্ছেন তামাম দেশকে’, ‘ভাই ও বোনেরা নয়, ছক ভেঙে বোন ও ভাইয়েরা’, ‘ভোট চলছে, ধর্ষণের এফআইআর ১৭ দিন পরে!’, অথবা ‘যন্ত্রণা ও হতাশা জয় করে সত্যিই সুন্দর হয়ে উঠুন’। শিরোনামগুলি দেখেই বোঝা যাচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কী এবং কারা।

লেখিকা জিনাত ইসলামের সঙ্গে এ-বিষয়ে কথা হল অনেকক্ষণ। তিনি বলছেন, “মহিলাদের নিজের হাতে চায় পরিবারের ও নিজের খরচ চালানোর মতো কিছু নগদ পয়সা। উপার্জনের জন্য চায় আত্মবিশ্বাস। আত্মনির্ভরশীল জীবনের খোঁজে আয়নার মুখোমুখি নিজের ক্ষমতার মুখটুকু মিলিয়ে দিতেই আমার বেরিয়ে পড়া। প্রান্তিক মেয়েদের স্বপ্ন ও সাধ পূরণের সেই আলাদিনের প্রদীপটি খুঁজে এনে হাতে দেওয়া। নিজের উপার্জন খুঁজে ফেরার ইচ্ছাটাকে জাগিয়ে তোলা।”

আসলে এই গ্রন্থ বাংলার সকল মেয়েদের হয়ে কথা বলে। ইন্টারনেট বা কাগজপত্র ঘেঁটে নয়,  মাঠে-ময়দানে ঘুরে ঘুরে খেটেখুটে জোগাড় করা তথ্য দিয়েই সাজানো হয়েছে এই বই। বীরভূমের মিলি, মুর্শিদাবাদের বিলকিস রাবেয়া, মেদিনীপুরের সন্ধ্যারানি, বর্ধমানের বাসন্তী, এছাড়াও বাংলার মানচিত্র জুড়ে ছড়িয়ে থাকা আঞ্জিরা, সামিলা, লাইলি, পুষ্পরানি, ললিতা, মমিনা বিবিদের অজস্র লড়াই, হেরে-যাওয়া, ঘাম, চোখের জল, ঘুরে দাঁড়ানো, হার-না মানার ছবি জিনাত চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই মহিলাদের মধ্যে কেউ রেশম চাষ করেন, কেউ ব্যাগ বাঁধাইয়ের কাজ করেন, কেউ বিড়ি-শ্রমিক, কেউ লোকসংগীত শিল্পী, কেউ বা সিএএ-এর প্রতিবাদী মা।

‘যে-মায়েরা আজ পথ দেখাচ্ছেন তামাম দেশকে’ শিরোনামে লেখিকা বলেন প্রতিবাদী কিছু মায়ের কথা। সেখানে এসেছে রোহিত ভেমুলা, নাজিব আহমেদ, ঐশী ঘোষের মায়েদের জীবন-চিত্র। সেই প্রসঙ্গে লেখিকার কলম থেকে বেরোচ্ছে, “এক মা এভাবেই এক সংঘবদ্ধ লড়াইয়ের জন্ম দেন। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে দেশের হাল-হকিকতের দিকে নজর দিতে শুরু করেন। ঘরের সমস্যাকে দেশের সমস্যার সঙ্গে জুড়ে দেখার দর্শন তৈরি করেন। এই মায়েরা নতুন ভারতের মা।” ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলাই যেন তাঁদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাঁরা চোখের জলও ফেলেন, আবার সন্তানদের উপর ঘটে চলা অন্যায়ে রুখে দাঁড়াতেও জানেন।

এরকম অর্ধশতাধিক মহিলার লকডাউনের দিনিলিপি তারিখ ও স্থান-সহ লিপিবদ্ধ করেছেন জিনাত। রয়েছে লড়াকু মেয়েদের ছবিও। মহিলাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণে এই বইটি হয়ে উঠেছে কঠিন সময়ের নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টেশন। উল্লেখ্য, করোনা এখনও পিছু ছাড়েনি আমাদের। নড়বড়ে অবস্থা এখনও থিতু হতে পারেনি। বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলে মেয়েদের অবস্থা এখনও দুর্বিষহ। রাজ্য সরকার থেকে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এগিয়ে আসছে বহু ব্যক্তি-উদ্যোগও। তাই বইটি এই সময়ের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। গ্রন্থটির প্রকাশক সৃষ্টিসুখ। মুদ্রিত মূল্য ২৪৯ টাকা। বইটি পাওয়া যাচ্ছে সৃষ্টিসুখের অনলাইনে। ভারতের যেকোনো প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা যাবে।

Developed by DXDasia