
মায়া আর্ট স্পেসে চলছে শিল্পী যোগেন চৌধুরীর একক প্রদর্শন।
যদিও এখন হেমন্তকাল, মায়া আর্ট স্পেসের একক প্রদর্শনে শিল্পী যোগেন চৌধুরী সাদা-কালো রেখায় শরতের আমেজ দিতে চেয়েছেন দর্শকদের। যে কারণে প্রর্দশনের নাম ‘Autumnal Lines’। এখানে শিল্পীর সবক'টা ছবিই সাদা কালোয় আঁকা। যোগেন চৌধুরী মনে করেন, রং-এর জগতে এই দু’টিই সবচেয়ে জোরালো। সাদা কাগজে কালো রঙ-এর যে বৈপরীত্য, সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় তা এক সম্পূর্ণতাকে ফুটিয়ে তোলে। চিনের তাও দর্শনে বলা আছে বৈপরীত্যের মধ্যে সৌন্দর্যের কথা। এর বাইরেও কালো রং শিল্পী যোগেন চৌধুরীর যাবতীয় সৃজনে আরেকটি তাৎপর্য বহন করে। খুব ছোটোবেলায় শিল্পী প্রত্যক্ষ করেছিলেন দেশভাগ। ফরিদপুরের ভিটে ছেড়ে তাঁকে মাত্র আট বছর বয়সে চলে আসতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণা এবং অস্থিরতা তাঁর সৃজনে ফুটে ওঠে কালো রং হয়ে। তিনি সচেতনভাবেই কালোর ব্যবহার করেন নিজের ছবিতে। যোগেন চৌধুরী যখন আর্ট কলেজে পড়তেন, ইলেকট্রিসিটির অভাবে হারিকেনের আলোয় স্কেচ আঁকতে হত তখন। যার ফলে ছবি হত কালো। পরে সেই রং-কেই নিজের মনস্তত্বের জটিলতা বোঝাতে ব্যবহার করলেন তিনি।

মনস্তত্বের জটিলতা বলতেই এসে যায় আধুনিকতার কথা। প্রাগাধুনিক শিল্পে মানুষের মনকে দেখা হত সমতল একটা মাঠের মতো করে। আধুনিকতাই মানুষকে শেখালো মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আলো আর অন্ধকারের অপার রহস্য। যোগেন চৌধুরীর সৃজনে আধুনিক শিল্পভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর প্যারিস যাওয়ার পর থেকে। ইউরোপের ছবি দেখে তাঁর চেতনায় যে জীবনজিজ্ঞাসা উঁকি মারা শুরু করেছিল, তা পালটে দেয় শিল্পীর স্টাইল। অবশ্য ভারতীয় ঐতিহ্য পুরোপুরি ত্যাগ করেননি তিনি। লতা, পাতা, ফুল তাই যোগেন চৌধুরীর ছবিতে বারবার চলে আসে। জীবনই মানুষের সবথেকে বড়ো শিক্ষক। আর শিল্পীদের ক্ষেত্রে তো সৃজনের যা কিছু ইন্ধন সবই আসে জীবন থেকে। যোগেন চৌধুরী তাই 'Art for Art's Sake'-এর নীতিতে বিশ্বাস করেন না। বরং তিনি 'Art for Life'-এর কথা বলেন। তিনি মনে করেন একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য খুব প্রয়োজনীয়।

নিজের পরিবার থেকেই যোগেন চৌধুরী পেয়েছেন ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা। তাঁর বাবা গ্রামের থিয়েটারে জিনিসপত্র সাজাতেন রং দিয়ে, তাঁর বাড়িতে কুমোর যত্ন করে তৈরি করতেন দুর্গা প্রতিমা। থিয়েটার আর প্রতিমার কাজে যে সব উপকরণ ব্যবহৃত হত, তার অবশিষ্টটুকু সম্বল করেই ছোট্ট যোগেন চেষ্টা করতেন ছবি আঁকার। নিজের হাতে তৈরি এঁটেল মাটির পুতুলগুলোকে রং করতেন। যোগেন চৌধুরীর মা ছিলেন আলপনায় দড়, রঙিন সুতো দিয়ে কাঁথা সেলাইয়ে তাঁর জুড়ি মেলা সহজ ছিল না। এরকম পরিবেশে বেড়ে উঠলে নান্দনিকতার সঙ্গে জীবন একাত্ম হয়ে যায়। ;যোগেন চৌধুরী বুঝে গেছিলেন, শিল্পই তাঁর জীবনের সবকিছু। যে কারণে স্কুলের পাঠ শেষ হবার পর তিনি ভর্তি হয়েছিলেন আর্ট কলেজে। তারপর ফ্রান্স সরকারের বৃত্তি নিয়ে প্যারিসে যান তিনি। হ্যান্ডলুম বোর্ডের ডিজাইনার, রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর, শান্তিনিকেতনে কলাভবনের শিক্ষক – নানা ভূমিকায় তিনি সুন্দরের অনুষঙ্গ যাপন করেছেন।

এই প্রদর্শনে যে ছবিগুলো দর্শকের জন্য রাখা আছে, শিল্পীর ভাষায় সেগুলি ‘বিন্দুতে সিন্ধু’। মোটা তুলিতে হোক বা কলমের সূক্ষ্ম আঁচড়ে, কাগজের ওপর তিনি সহজ অথচ রহস্যময় ভঙ্গিতে পরিবেশন করেছেন কখনও সরীসৃপের অবয়ব, কখনও বা মৃত্যুর রেখচিত্র, আবার কখনও পেশিবহুল মানবদেহ। অবনীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নন্দলাল বসু, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় কিংবা রামকিঙ্কর বেইজের মতো প্রণম্য শিল্পীরা বন্ধুবান্ধব ও ছাত্রছাত্রীদের শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানোর জন্য পোস্টকার্ড আকারের যে সব ড্রয়িং করতেন, এই প্রদর্শনের ছবিগুলো তারই উত্তরসূরী। মায়া আর্ট স্পেসে প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা এইসব ছোটো ছোটো স্কেচ এবং ড্রয়িং দেখা যাচ্ছে ১৩ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত।

