রাসকিন প্রকৃতি আর একটি ছোট্ট শিশু

রাসকিন বন্ডের আত্মজীবনী ‘লোন ফক্স ডান্সিং’ সদ্য প্রকাশ পেয়েছে

১৯ মে সাহিত্যিক রাসকিন বন্ডের ৮৫তম জন্মদিন। জন্মদিনের আগে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এই জনপ্রিয় সাহিত্যিকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় আরেক লেখক অনিরুদ্ধ সরকার।

২০১০ কুম্ভমেলা শেষে গেছি মুসৌরি। মুসৌরির প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে হতে সেবার ইচ্ছে হল রাসকিন বন্ডের সঙ্গে দেখা করার। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত জনপ্রিয় ভারতীয় লেখকের তখন ঠিকানা পাহাড়ি শহর মুসৌরি। শুনেছিলাম, প্রতি শনিবার তিনি মুসৌরির একটি বইয়ের দোকানে বসেন, আড্ডা দেন কচিকাঁচাদের সঙ্গে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনো কারণবশত তিনি সেদিন আসেননি। ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। মধ্যিখানে কেটে যায় অনেকগুলো বছর। সেই অপূর্ণ ইচ্ছেই পূরণ হল এক বৃহস্পতিবার, তবে পাহাড়ে নয়, খাস কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে। আমন্ত্রিত ছিলাম। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উঠে এল প্রিয় সাহিত্যিকের নানা জানা-অজানা কথা।

আরও পড়ুন
জলের মতন তুমি

রাসকিন বন্ড। যার লেখা পড়ে বড়ো হয়েছি। তাই প্রিয় বললে কম বলা হয়। বিভূতিভূষণের পর যাঁর লেখা পড়ে প্রকৃতিকে নতুন ভাবে চিনেছি। যাঁর গল্পে অদ্ভুত এক ভালোলাগা আছে। যেখানে ভূতেরাও বেশ মিষ্টি। একজন বলেছিলেন, “যদি ঘরে বসেই হিমালয়কে পেতে চাও তো রাসকিন বণ্ড পড়ো।” ‘দ্য জঙ্গল বুক’ খ্যাত সাহিত্যিক রুডিয়ার্ড কিপলিং যখন প্রয়াত হন তখন রাসকিনের বয়স মাত্র ২ বছর। রাসকিনের বাবা ছিলেন রয়্যাল বিমানবাহিনীতে। বন্ডের বয়স যখন চার বছর তখন রাসকিনের মা আলাদা হয়ে যান এবং এক পাঞ্জাবি-হিন্দুকে বিয়ে করেন। বন্ডের বয়স যখন দশ তখন হঠাৎ করে ম্যালেরিয়ায় মারা যান রাসকিনের বাবা। তারপর থেকে রাসকিনের নতুন ঠিকানা দিদার বাড়ি। রাসকিন পড়তেন সিমলার বিখ্যাত বিশপ কটন স্কুলে। রাসকিনের স্কুলের একটি মজার ঘটনা, সিমলায় স্কুলে পড়ার সময়, সেখানকার লাইব্রেরি’র ইনচার্জ ছিলেন রাসকিন, ওই ছেলেবেলার দায়িত্ব আর কি! লাইব্রেরির চাবি থাকত তাঁরই কাছে, যার সুবাদে একাধিক বই পড়ে ফেলেছিলেন। বই ছেলেবেলা থেকেই খুব প্রিয় রাসকিনের। তাঁর কথায়, “রবীন্দ্রনাথ পড়েছি একটু দেরিতে। স্কুল পাশ করার পর।” স্কুলে পড়ার সময় রাসকিন একবার চিঠি লিখেছিলেন একটি মেয়েকে। সেই চিঠি মেয়েটির হাতে না গিয়ে চলে গিয়েছিল স্কুলের হে়ডমিস্ট্রেসের হাতে। ব্যাস! শাস্তি তো পেতে হলই রাসকিনকে, সঙ্গে হেডমিস্ট্রেস কড়া ভাষায় রাসকিনকে জানিয়ে দিলেন এসব লেখালেখি বন্ধ করতে। কিন্তু স্কুলে রাসকিনের নাম ছড়িয়ে পড়ল ‘ভালো প্রেমপত্র’ লিখিয়ে বলে।

 রাসকিন বন্ডের মুসৌরির বাড়ি

ইংল্যান্ডে যে ক’দিন চ্যানেল আইল্যান্ডসে কাজ করেছেন রাসকিন তখন দিনের শেষে বই বলতে একমাত্র ভরসা ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখা কিছু বইয়ের অনুবাদ। কারণ তখন সেখানে ভারতীয় বই বলতে শুধু রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ বই-ই পাওয়া যেত। ইংল্যান্ডে গিয়ে বেশিদিন মন টিকল না রাসকিনের। ভারতে ফিরলেন হিমালয়ের টানে, প্রকৃতির টানে। ভারতে ফিরে রাসকিন বললেন, ‘‘ভারতই আমার ঘরবাড়ি। এই দেশের জমি, মাটি এগুলোই আসলে আমার ঘর।” ব্রিটেনে জন্মালেও পুরো জীবন ভারতেই কাটিয়েছেন রাসকিন। রাসকিনের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে।

রাসকিনের লেখায় তাই বারেবারে ফিরে এসেছে হিমালেয় উদার উন্মুক্ত প্রকৃতি, হিল স্টেশনের কথা, জঙ্গলের কথা আর এসেছে নিঃসঙ্গতার কথা। আর সেই কারণে ভিএস নয়পল বলেছিলেন, “রাসকিন নিঃসঙ্গতাকেও বাঙ্ময় করে তুলেছিলেন।”

আলো এবং ছায়ার মধ্যিখানে রাসকিন বন্ড

সাহিত্যিক রাসকিন যিনি খুব কমই প্রকাশ্যে এসেছেন, বিজ্ঞদের মতো কথা বলেছেন। একেবারে প্রচার বিমুখ এক ভিন্নধারার সাহিত্যিক রাসকিন বন্ড। আট থেকে আশি সবার জন্য লিখলেও ‘শিশু সাহিত্যিক’ বললে তিনি বেশ খুশি হন। স্বভাব সরল এই মানুষটি চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ পড়ে ছেলেবেলায় বাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছিলেন, আর চেয়েছিলেন লেখক হতে। ছোটোবেলা কেটেছে সিমলা আর দেরাদুনে। পরে মুসৌরিতে পাকাপাকি ভাবে থাকা শুরু। বাউণ্ডুলে জীবনে থিতু হয়েছিলেন মুসৌরিতে এসে। সংবাদপত্র আর পত্রিকায় গল্প লিখে ফ্রিলান্সিং করে লেখালেখি শুরু, সেই ১৭ বছর বয়সে যা শুরু করেছিলেন তা আজও চলছে। শত উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়েও রাসকিনের কলম চলছে এখনও। মুসৌরির যে বাড়িতে থাকেন সেটি বেশ সাজানো গোছানো। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র অনুবাদ রয়েছে তাঁর বাড়িতে। ৮৫ বছর বয়সেও রাসকিন একেবারেই প্রচারবিমুখ লেখক। একবার উঠতি লেখকদের প্রচারকেন্দ্রিক মাতামাতি দেখে বলেছিলেন, “লেখকের কাজ শুধু লেখা। সারাদিন বই প্রমোশন, প্রচার, সোস্যাল নেটওয়ার্কেই যদি তিনি ব্যস্ত থাকবেন তিনি লিখবেন কখন আর ভাববেন কখন?” এখনও মানুষটি লেখেন খাতা-কলমে। যান্ত্রিকতার খুব একটা ধার ধারেন না, অনেকটা পরিচালক ক্রিস্টফার নোলানের মতো।

রাসকিনের আত্মজীবনী ‘লোন ফক্স ডান্সিং’ সদ্য প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন নিজের জীবনের একেবারে ভিন্ন স্বাদের কিছু গল্প। দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থার কথা তিনি যেমন বলেছেন, তেমনি একটি মামলায় জড়িয়ে পড়ার কথাও বলেছেন যে কারণে তাঁকে কোর্ট অবধি যেতে হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা প্রসঙ্গে রাসকিন বলেন, “আমার মতই গাছপালা ও প্রকৃতি পছন্দ করতেন ইন্দিরা গান্ধী।” রাসকিনের বেশ কিছু কবিতা, গল্পে ‘বিনিয়া’ নামে এক নারীর কথা এসেছে, যে বিনিয়া ‘ব্লু আমব্রেলা’-তে এক ছোট্ট মেয়ে, সেই-ই আবার ‘বিনিয়া পাসেস বাই’-তে একজন তরুণী। বিনিয়া প্রসঙ্গে রাসকিনের মন্তব্য, “বিনিয়া কিছুটা স্বপ্ন আর কিছুটা বাস্তব। আর রোল মডেল তো একটা থাকতেই হয়।”

রাসকিন বন্ডের সঙ্গে আলাপচারিতায় লেখক অনিরুদ্ধ সরকার 

সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমা শুটিং-এর সময় রাসকিন ছিলেন দার্জিলিং-এ। তখন অবশ্য সাহিত্যিক ‘রাসকিন বন্ড’ হননি তিনি। একে অপরকে চিনতেন না। রাসকিনের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের আলাপ করিয়ে দেন সত্যজিৎ রায়ের জীবনীকার, ব্রিটিশ অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র পরিচালক মারি সিটন। মারি সিটন অবশ্য রাসকিনকে আগে থেকেই চিনতেন। রাসকিন বন্ড পেয়েছেন সাহিত্য অ্যাকাডেমি, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ সম্মান। রাসকিনের গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন শ্যাম বেনেগালের মতো চিত্র-পরিচালক। আলাপচারিতার শেষে মনে হল সাহিত্য থেকে যখন প্রকৃতি বিলুপ্তির দিন গুনছে, তখন রাসকিন বন্ড ৮৫ তেও যেন সেই ছোট্ট শিশু, যে গাছেদের কথা বলে, ফুলের কথা বলে, পাহাড়ের কথা বলে, আর বলে কখনো বড় হয়ো না।

Developed by DXDasia