উকিল হবেন নাকি লেখক? ভাবতে ভাবতেই ২০ বছর বয়সে প্রথম বই প্রকাশ পেল শরদিন্দুর
পান থেকে চুন খসলেই আমাদের পাড়ার চায়ের দোকানে জটলা বাড়ে। কী, কেন, কবে, কোথায়, কীভাবের দৌলতে তখন বাঙালি মাত্রেই গোয়েন্দা। বাঙালির এই খানাতল্লাশ কোন কোন ক্ষেত্রে সন্দেহ বাতিকের তকমা পেলেও আট থেকে আশি আজও গোয়েন্দাগিরিতে ফলো করে ব্যোমকেশকে। ফেলুদা, ঋজুদা, কাকাবাবু কিংবা আধুনিক মিতিন মাসি’র সত্যানুসন্ধানেরও পথ প্রদর্শক এই ব্যোমকেশ। স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাঙালি তার প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে পেয়েছিল এই সত্যান্বেষীকেই। শরদিন্দু তাঁর ক্ষুরধার প্রতিভা বলে বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিকে মানবিক ও সাহিত্যিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে শরদিন্দু বলছেন, “ওগুলি (ব্যোমকেশের কাহিনিগুলি) নিছক গোয়েন্দা কাহিনি নয়। প্রতিটি কাহিনি আপনি শুধু সামাজিক কাহিনি হিসেবেও পড়তে পারেন। …একটি কথা, জীবনকে এড়িয়ে কোনোদিন গোয়েন্দা গল্প লিখবার চেষ্টা করিনি।” অবশ্য শুধু গোয়েন্দা গল্পই নয়, শরদিন্দু’র যে কোন লেখাতেই এই জীবন সম্পৃক্ততার এক পূর্ণ প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।
১৮৯৯ সালের আজকের দিনে মামাবাড়ি উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে শরদিন্দু’র জন্ম হয়। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার বিহারের পূর্ণিয়াতে বসবাস করলেও তাদের আদিনিবাস ছিল কলকাতার বরাহনগরে। সে অর্থে বলতে গেলে শরদিন্দু তাঁর সমগ্র জীবনের খুব কম সময়েই বাঙালিদের মধ্যে থেকেছেন। অথচ বাঙালি লেখক হিসেবে তাঁর পরিচিতি এ যেন ভবিতব্য ছিল। ওকালতির কাজে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা তারাভূষণকে পূর্ণিয়ায় চলে যেতে হয়। ছেলেকে উকিল বানানোর প্রবল ইচ্ছা তারাভূষণের। তাই ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করলে শরদিন্দুকে স্নাতক পড়ার জন্য প্রথমে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ও পরে আইন পড়ার জন্য পাটনাতে পাঠান তিনি। বাড়িতে বই-এর আলমারি ঠাসা বিভিন্ন বইয়ে ডুবে থাকা শরদিন্দু তখন দ্বন্দ্বে, উকিল হবেন না কি লেখক! এরই মধ্যে কুড়ি বছর বয়সে শরদিন্দুর প্রথম বই, একটি কবিতা সংগ্রহ আত্মপ্রকাশ করে। যদিও তা পাঠক মহলে তেমন সমাদৃত হয়নি, তবু জীবনের প্রথম ভালোবাসা লেখালেখিকে ছেড়ে থাকার কথা কখনোই ভাবেননি শরদিন্দু। তাই, আইন পাশ করে বাবার জুনিয়র হিসেবে কিছুদিন কাজ করলেও সারাজীবনের পেশা হিসেবে শরদিন্দু বেছে নিয়েছিলেন সাহিত্য চর্চাকেই।
ওকালতি জীবনেই ‘বসুমতি’তে ছাপা হয়েছিল তাঁর প্রথম গল্প ‘উড়ো মেঘ’। তারপর একে একে ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’ও তাঁর লেখা ছাপতে শুরু করল। ১৯২৯ সালে পাকাপোক্ত ভাবে সাহিত্য সাধনায় এলেন শরদিন্দু। শরদিন্দু যা যা লিখেছেন, তা মোটামুটি চারটি গোত্রের। সামাজিক-রোম্যান্টিক, ডিটেকটিভ কাহিনি, সরস রচনা ও ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস। নজরুলের গানের প্যারোডি করে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজস্ব সরস ভঙ্গিতে লিখেছিলেন, “তোমার এ মহাবিশ্বে ছাতা হারায় খালি প্রভু!” ‘চুয়াচন্দন’, ‘চিত্রচোর’, ‘মরু ও সঙ্ঘ’র গুরুগম্ভীর লেখক শরদিন্দু অবলীলায় লিখেছেন, “শিল্পীর শিরে পিলপিল করে আইডিয়া/ লেখেন যখন পুস্তক তিনি তাই দিয়া/ উইপোকা কয় চল এইবার খাই গিয়া!” পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থার সুরাহায় ছোটো থেকেই সিনেমার পোকা শরদিন্দু মুম্বাইয়ের বম্বে টকিজে ছবির গল্প লেখক হিসেবে কাজও করেছেন। ‘ভাবী’, ‘বচন’,’দুর্গা’,’কঙ্কন’ প্রভৃতি বম্বে টকিজের হয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে বাণিজ্যিক ফরমায়েশির সঙ্গে বেশিদিন খাপ খাওয়াতে পারেননি শরদিন্দু। বড়ো ছেলে নামী সংস্থায় চিফ কেমিস্টের পাকা কাজ পেলে শরদিন্দু সব ফরমায়েশ ছেড়ে আবার সম্পূর্ণ সাহিত্যচর্চায় ডুব দেন। সত্যান্বেষীর প্রায় পনেরো বছর পর পুনরায় প্রত্যাবর্তন ঘটে ব্যোমকেশের। ভীষণভাবে সাড়া পড়ে যায় পাঠকমহলে।
কেবল সমসময় নয়, ঐতিহাসিকের চোখ দিয়ে অতীতকেও চমৎকারভাবে দেখতে পারতেন শরদিন্দু। নিজেই বলেছিলেন, “আমি বাঙালিকে তাহার প্রাচীনের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছি। বাঙালি যতদিন না নিজের বংশগরিমার কথা জানিতে পারিবে, ততদিন তাহার চরিত্র গঠিত হইবে না…”। তাই বাঙালি পেয়েছে ‘কালের মন্দিরা’, ‘গৌড়মল্লার’, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’, ‘কুমারসম্ভবের কবি’, ‘শিবাজী ও সদাশিব’ কিংবা ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসকে। ইতিহাসবিদ্ রমেশচন্দ্র মজুমদার শরদিন্দুকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “লোকে ইতিহাস পড়ে না, কিন্তু আপনার বই পড়িবে”। বাংলা ছোটগল্পের দুনিয়াতেও শরদিন্দুর অবদান নেহাত কম নয়। তাঁর ‘ভল্লু সর্দার’, ‘কর্তার কীর্তি’, ‘কানু কহে রাই’ প্রভৃতি পাঠক বারবার পড়লেও ক্লান্ত হবেন না। নানারকম বই পড়ার পাশাপাশি ভাষাচর্চার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। নিজে সংস্কৃত শিখবেন বলে মাস-মাইনে দিয়ে পণ্ডিত রেখেছিলেন। তৎসম শব্দের পরিপূর্ণ ব্যবহার শরদিন্দুর লেখার অন্যতম আকর্ষণ। আগ্রহ ছিল জ্যোতিষ চর্চায় ও প্ল্যানচেটে। তিনি নিজেই বলছেন, “it has become a part of my life”। ১৯৫২-তে মুম্বাইতে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন তিনি। জীবনের শেষ ১৯ বছর নিজের অর্থে তৈরি বাড়ি ‘মিথিলা’তেই কাটিয়ে দেন শরদিন্দু। এখানে তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল নানারকম বই। ভালো পাঠক না হলে ভালো লেখক হওয়া যায় না, শিক্ষিত পাঠকই শিক্ষিত লেখক তৈরি করে এ কথার যথাযথ প্রমাণ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিশ্বজুড়ে চলা এই বন্দিদশার মুহূর্তে শরদিন্দু অমনিবাস কিংবা ব্যোমকেশ সমগ্রর পাশাপাশি শরদিন্দু’র লেখা অবলম্বনে তৈরি কিছু সিনেমা আমাদের কোয়ারান্টাইন লিস্টে রাখাই যায়। মাথায় রাখবেন, ‘দাদার কীর্তি’, ‘চিড়িয়াখানা’ এবং অবশ্যই ‘ঝিন্দের বন্দী’ ছাড়া সে লিস্ট কিন্তু অসম্পূর্ণ।