
‘সবার মুখেই এক কথা- আজ বিকেলে পাক আর্মি আত্মসমর্পণ করবে’
জাহানারা ইমাম
একাত্তরের বিজয় মুহূর্ত? তখন আমি কি আর আমাতে ছিলাম? বিজয় অর্জনের মাত্র তিনদিন আগে আমার স্বামী শরীফ আকস্মিক হৃদরোগে চিরকালের মতো আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। যে বিজয় দেখার জন্য সে এতো উদগ্রীব হয়েছিল, রুমীকে পাক আর্মি তিনমাস আগে ধরে নিয়ে যাবার পরও যে দুঃসহ পুত্রশোক নীরবে মুখ গুঁজে সহ্য করে ঢাকায় বসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার যা করণীয় কাজ ছিল, সেগুলো করে গেছে, সেই বিজয় সে দেখে যেতে পারল না। রুমী নেই, শরীফও চলে গেলো। ভারতীয় বিমানের রকেটিং ও স্ট্রেফিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে শরীফের জাঞ্জা ও দাফন হলো। ছোট ছেলে জামী ক্ষিপ্তের মতো মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠছে, ‘আমার আর যুদ্ধ করা হলো না। আমি ওদের দেখে নেব। অরা ভাইয়াকে খুন করছে, আব্বুকেও খুব করেছে, ওদের ছেড়ে দেব না।’ জামীকে সামলানোই তখন এক সমস্যা। তার বন্ধু আলো আমার মা বোন- কেউই তাকে শান্ত করতে পারছে না। আমি তাকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে রেখেছি। যাতে সে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে।
ওদিকে আরেক বিপদ। ভারতীয় বিমানের বোমাবর্ষণে আমার সামনের কয়েকজন প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদের বোমা পড়েছে, (সেই সময় প্লেনের শব্দ শুনলেই লোকজন ছাদে উঠে যেত দেখার জন্য) তাতে এক বাসার দুটো মারা গেছে, বেশ কয়েকজন জখম – তারাসহ আশপাশের তিনচারটে বাড়ির সবাই এসে আশ্রয় নিয়েছে আমাদের বাড়িতে। গুরুতর আহতদের হাসপাতালে পাঠিয়ে সকলের খাওয়া–দাওয়া, রাতে সকলের শোয়ার ব্যবস্থা- এসব করতে হচ্ছিল। এর মধ্যেই সারাদিন ধরে বোমাবর্ষণ বাড়া-কমার ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য আত্মীয়-বন্ধু দেখা করতে এসেছেন, কান্না ও হাহাকারের ফাঁকে ফাঁকে জানিয়েছেন, আর বেশি দেরি নেই, শিগ্গিরই ঢাকার পতন হলো বলে। চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে এসে ঢাকা প্রায় ঘিরে ফেলেছে। শরীফও তো মরার আগের কয়েকদিন ধরে এই কথাই বলত। ১৫ ডিসেম্বর সারাদিন কলকাতা রেডিও খোলা ছিল, বার বার শোনা যাচ্ছিল পাক আর্মিকে সারেন্ডার করার নির্দেশ। সেজন্য বিকেল চারটে থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত বোমাবর্ষণ বন্ধ থাকবে, বলা হচ্ছিল।
পরদিন অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের সকালে কলকাতা রেডিওতে আবার ঘোষণা শোনা গেলো, যুদ্ধবিরতি বিকেল তিনটে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সকাল থেকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব শ্রোতের মতো হু হু করে আসছে। সবার মুখেই এক কথা- আজ বিকেলে পাক আর্মি আত্মসমর্পণ করবে। পাকসেনারা, বিহারীর যে যেদিকে পারছে, পালাচ্ছে। লোকজন কারফিউ উপেক্ষা করে দলে দলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। হায়! আমি বেরোতে পারছি না। শোকে এবং আলসারের ব্যথার শয্যাশায়ী। জামী বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছে – সে কয়েকটা খানসেনা মারবেই মারবে। আমি বিছানায় পড়ে থেকেও তার হাত কঠিন মুষ্টিতে ধরে আছি। আলীকে বলেছি, খবরদার, ওকে বেরুতে দিবি না। শরীফের বন্ধু মঞ্জুর হোসেন তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে এবং গাড়ির ভেতরের সীটে বাংলাদেশের পতাকা বিছিয়ে যখন এলেন এবং বললেন বিকেল তিনটেয় পাক আর্মি সারেন্ডার করবে, তখন স্থির বিশ্বাস হলো- আজই তাহলে বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের দিন আর আজই হবে বাংলাদেশের মুক্তিপাগল জনগণের বিজয়ের দিন। মঞ্জুর যাবার সময় পতাকাটা আমার কাছে রেখে বললেন, ‘আজ যদি সারেন্ডার হয়, কাল সকালে এসে পতাকাটা তুলবো।’
ঘরের মধ্যে থেকেও বুঝতে পারছিলাম বাইরে সারা ঢাকা শহরে কী তুমুল উত্তেজনা। শুনছি মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকছে চারদিক থেকে, ঢুকছে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জেনারেলরা। খানিক পরপরই পরিচিতরা পাঁচ মিনিটের জন্য ঢুকে প্রথমে খানিকটা কান্না ও হাহাকার, তারপরেই আনন্দের সংবাদ- মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে উল্লাস করছে, ভারতীয় জেনারেলদের জীপ ঘিরে বাংলাদেশী জনতা ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে। কেউ আর ঘরে নেই। আমিই শুধু রইনু পড়ে। শোকে, দুঃখে, ক্রোধে, অপমানে ক্ষিপ্ত পুত্র, তাকে আগলে-রাখা বন্ধু, আমার মা, বোন, ননদ, ভাগ্নীরা আর আমার অন্ধ, বৃদ্ধ অর্থব শ্বশুর- এই ক’জন শুধু আমার ঘিরে রইল। আর রইল এ বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া এক দঙ্গল প্রতিবেশী। আজ এই ষোলই ডিসেম্বরে পাক আর্মির সারেন্ডারের দিনে, বাংলাদেশের বিজয়ের দিনে তারা ঘরে বসে শরীফের কুলখানির সোয়ালক্ষ দোয়া পড়ল, মেয়েরা ঘরে জমানো চাল, চিনি, জাফরান দিয়ে জরদা রাঁধল, সবাই মিলে শরীফের রুহের মাগফেরাত কামনা করল।
একাত্তরের সেই বিজয় দিবসে আমার অনুভূতি উললব্ধির কথা আমি কখনই অন্যদের মতো গুছিয়ে, যুতসই শব্দাবলী সাজিয়ে লিখতে পারব না। মনে হয়, মনটা সেদিন পাথর হয়ে গিয়েছিল এবং যান্ত্রিকও। রোবটের মতোই অনুভূতিহীন মন নিয়ে সবকিছুর তদারকি করেছি। ১৭ ডিসেম্বর মঞ্জুর এসে পতাকা তুলেছেন। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবরাও এসেছে, সবাই কেঁদেছে- আমি কাঁদতে পারিনি। ফ্যাল ফ্যাল করে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। বিরাট একটা শূন্যতার মধ্যে যেন বোধশূন্যহীন হয়ে ছিলাম। সন্ধ্যার পর যখন রুমীর কয়েকজন সহযোদ্ধা দুই নং সেক্টরের মেলাঘর ক্যাম্পের দুর্ধর্ষ বীর মেজর হায়দারের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে এলো আমার সঙ্গে দেখা করতে, কেবল তখনি যেন প্রাণ পেয়ে আমি জেগে উঠলাম। ওদের হাত ধরে ঘরের মাঝখানে টেনে এনে বললাম, ‘এসো বাবারা, বসো।’
(ঋণ – ‘বিজয়ের মুহূর্ত ১৯৭১’)
