১৪ ডিসেম্বর – বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড

ঢাকা শহরের অসংখ্য শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী সমাজসেবক-কে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী

আজ ১৪ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকা শহরের অসংখ্য শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী সমাজসেবক-কে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করে। বিজয়ের প্রাক্কালে এই বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের সহায়তা করে আল বদর নামক একটি প্যারামিলিটারি বাহিনী। পাকিস্তানি মেজর জেনারেল রাও ফারমান আলির নির্দেশে তালিকা বানিয়ে ঊনস্বাধীন বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনায় লিপ্ত হয়। মূল ঘাতকের ভূমিকা রাখে জামাত ইসলামের চৌধুরী মঈনুদ্দিন এবং আশরাফুজ্জামান খান। রাও ফারমান ২০০৪ সালে স্বাভাবিক নিয়মে মারা যান, তার দুই সহচর মঈনুদ্দিন আর আশরাফুজ্জামান যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে সুখে শান্তিতে বেঁচে আছেন। শুধু নিহত শহীদদের আত্মীয়স্বজন তাঁদের লাশ পর্যন্ত পায়নি গত ৪৬ বছরে। যাদেরও বা লাশ পাওয়া গিয়েছে, বীভৎস বেয়নেট খোঁচানো চোখ উপড়ানো সেসব শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার কার্যকর হওয়ার সম্ভবনা নিকট ভবিষ্যতে নেই বলা যায়।

মানুষের মাঝে একটা ভুল ধারণা যে, পাকিস্তান যুদ্ধে পরাজয় আসন্ন বুঝতে পেরে বুদ্ধিজীবী হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। বাস্তবতা মোটেও তেমন নয়। পাকিস্তানি জেনারেলদের মনস্তত্ত্ব যদি বুঝতে চেষ্টা করে কেউ, এটা স্পষ্ট হয় যে তাদের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছাত্রজনতার যে আন্দোলন, তার পেছনে কারণ হিসেবে তারা এদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকে দায়ী করতেন। তাই বেছে বেছে তালিকা করে জ্ঞানীমানুষদের হত্যা করলে ভবিষ্যতে এসব আন্দোলনের কোনো গতি হবে না বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ২৫ মার্চ অসংখ্য শিক্ষক সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়, প্রগতিশীল ছাত্রদের গুলি করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই। যুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানের লক্ষ্য ছিল, ঢাকাশহরে তীব্র আতঙ্ক আর স্বল্পতম সময়ের ভেতর কয়েকহাজার মানুষ হত্যার মাধ্যমে ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে ওঠা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পরে সামরিক শাসন বলবৎ রাখা। কিন্তু গ্রেফতার হওয়ার আগেই শেখসাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেয়ার পরে, এবং ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে পরিকল্পণায় পরিবর্তন আসে। ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন, এই দেশের মাটি চাই তার, মানুষ না। তাজউদ্দীন আহমদ-সহ আওয়ামি লীগ নেতৃত্ব ভারতে চলে গিয়ে প্রবাসী সরকার শুরু করলে, পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা করা শুরু করে দেশব্যাপী। বাংলাদেশের ছাত্র কৃষক শ্রমিক চাকুরিজীবী মানুষ যখন ভারতসরকারের সহায়তায় মুক্তি হওয়ার ট্রেনিং নিতে থাকে, ঢাকাসহ সারাদেশের বুদ্ধিজীবীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের ভেতরে মুক্তিবাহিনীর হাইডআউট হিসেবে কাজ করতেন। পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে অনেকে সেসময়ে চাকরি চালিয়ে গিয়েছেন, আবার নিজঘরে লুকিয়ে রেখেছেন মুক্তিবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র। ঢাকার গেরিলাদের সাহায্য করতেন সুরকার আলতাফ মাহমুদ, সে অপরাধে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে আর কখনো ফিরে আসেননি, তার মৃত্যু কখন কোথায় হয়েছে, তাও জানা যায়নি। চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার অপরাধে রাজাকার সাকা চৌধুরীর টর্চারসেলে হত্যা করা হয় সমাজসেবক দানবীর নূতনচন্দ্র সিংহকে। চুরাশি বছরের বৃদ্ধ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই। কেবল যুদ্ধসমাপ্তির প্রাক্কালে নয়, পুরো ন’মাস জুড়ে প্রৌঢ় প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ শিক্ষক আইনজীবী চিকিৎসকদের হত্যা করা হয়েছে। চোখের ডাক্তারের চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, হৃদপিণ্ডের ডাক্তারের বুক বেয়নেট খুঁচিয়ে ছিন্নভিন্ন করা হয়েছে।

একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দেওয়া হয়েছে সে অনুযায়ী একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিত্সক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রকৌশলী। এঁদের মধ্যে রয়েছেন ড. জি সি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমেদ লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আর পি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহি, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, হাবিবুর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীন, সায়ীদুল হাসানসহ আরো অনেকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা হয় ফারমান আলির ডায়েরি। তাতে বুদ্ধিজীবীদের নাম, ঠিকানার তালিকা পাওয়া যায়। যেসব বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের পাশে দেয়া ছিল টিকচিহ্ন। কিছু কিছু নামের পাশে পাওয়া যায় ডসপিক আর হেইট নামে দুজন আমেরিকান গোয়েন্দা সদস্যের নাম। তার থেকে ধারণা করা হয়, বুদ্ধিজীবি হত্যার পেছনে সিআইএর ভূমিকা ছিল। ফারমান আলির দেয়া এক সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের জন্যে জেনারেল নিয়াজি ও জামসেদ দায়ী। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরকম তদন্ত না হওয়ায় কৃতকর্মের জন্যে তাদের কোনো শাস্তি তো হয়ইনি, বরং ফারমান আলি দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে জেনারেলে পরিণত হন।

একটা দেশের এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সারথি সেদেশের শিক্ষক-শিল্পীসমাজ। সহস্রাধিক বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে যে জ্ঞানশূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল বাংলাদেশে, প্রায় অর্ধশত বছরেও সে শূন্যতা পূরণ হয়নি। বরং শেখ মুজিব, তাজঊদ্দীনসহ মূলধারা আওয়ামি লীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার, মুক্তিযোদ্ধা বামপন্থীকর্মী হত্যার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ আরো অতল অন্ধকারে হারিয়ে যায়। ধর্মীয় আগ্রাসন আর ধর্মান্ধতা স্থায়ী হয়ে যায় এদেশের মানুষের ভেতর। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের চার মূলনীতি, গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। আমেরিকার সমাজতন্ত্রজুজু আর এদেশীয় পাকিস্তানপন্থীদের ভারতবিদ্বেষ একটা সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, যার শুরুটা হয়েছিল ১৯৭১ সালে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। সেখান থেকে মাথা তুলে দাঁড়াতে এই দেশটার আরো অনেকদিন সময় লাগবে।

Developed by DXDasia