সংকটে কালজয়ী সাহিত্যিকের পরিবার
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘আরণ্যক’। ওই নামেই ব্যারাকপুরে রয়েছে দোতলা এক বাড়ি। বিভূতিভূষণের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটায় থাকেন তাঁরই বংশধরেরা। এখন সেই বাড়ি ধ্বংসের মুখে। তার গা ঘেঁষে গড়ে উঠছে এক বহুতল। ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর জন্য অল্প জায়গা ফাঁকা থাকা প্রয়োজন, সেটুকুও রাখা হয়নি।
বহুতল নির্মাণ শুরু হওয়ার মোটামুটি দু’বছর পর গত জুন মাসে নজরে আসে যে তার ক্ষতিকর প্রভাব ‘আরণ্যক’-এর ওপর পড়ছে। প্রায় ৭০ বছর আগে বাড়িটি তৈরি হয়েছিল। আদি স্বত্বাধিকারী ছিলেন বিভূতিভূষণের স্ত্রী রমাদেবী। পাশেই সুকান্ত সদন, চার্নক পুলিশ ফাঁড়ি এবং বিখ্যাত দাদা-বৌদির বিরিয়ানি। ব্যারাকপুর স্টেশনও খুব কাছে।
যেখানে বহুতল গড়ে উঠছে, সেই জমি ব্যারাকপুর পুরসভার। নির্মাণ সম্ভবত সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে চলছে, জানালেন বিভূতিভূষণের নাতি তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২০-র জুন মাসে টিটাগড় থানায় এফআইআর দায়ের করতে তিনি গিয়ে ব্যর্থ হন। তাঁর কথায়, “খুব জোরে হাতুড়ির শব্দ আরম্ভ হলে আমাদের বাড়ি কাঁপতে থাকে। নানা অংশে ফাটল দেখা দেয়। ভয় হতে থাকে, যে কোনো মুহূর্তে বাড়ি ভেঙে পড়বে।”
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
কয়েকদিন পর হাতুড়ির শব্দ থামে। তবে নির্মাণকাজ চলতেই থাকে। বাড়ির পাঁচিল ভেঙে দেওয়া হয়। অবাঞ্ছিত লোক ঢুকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। নদর্মা ব্যবস্থাও ধ্বংসের মুখে। অল্প বৃষ্টিতেই ভেসে যাচ্ছে বাড়ি। মে মাসে যখন আমফানের তাণ্ডব হল, বাড়ির এক তলায় জল জমেছিল প্রায় দেড় ফুট। বেশ কিছু স্মারক দ্রব্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে নির্মাণকর্মীরা বাড়ির এক জামরুল গাছের অনেকটা কেটে ফেলেন। “কোনো বিজ্ঞপ্তি বা অনুমতি ছাড়াই এটা ঘটেছে”, জানান তথাগত।
এই বাড়িতে রাখা আছে বিভূতিভূষণের ব্যবহার করা নানা জিনিস। তাঁর পেন, জামাকাপড়, গল্প-উপন্যাসের প্রথম সংস্করণ, অপ্রকাশিত লেখা এবং আরো কত কিছু। বাড়ির একটা অংশ তাঁর স্মৃতিতে উৎসর্গ করা। বিভূতিভূষণের ছেলে তথা ‘তারানাথ তান্ত্রিক’, ‘অলাতচক্র’-র মতো জনপ্রিয় উপন্যাসের রচয়িতা তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে থেকেছেন আমৃত্যু। ২০১০ সালে তিনি প্রয়াত হন।
আরও পড়ুন: বিবেকানন্দ নামের এক বটগাছের কথা
এই ঘটনা নিয়ে গত ১০ জানুয়ারি বিভূতিভূষণের পুত্রবধূ মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন। যার ফলে সমস্যাটি গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের নজরে পড়ে। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতাদেবীর কথায়, “আমি পোস্ট দেওয়ার পর পুরসভা আমাদের বাড়ির সঙ্গে একটা নর্দমা যুক্ত করে। কিন্তু জল তাতে নামবে বলে মনে হয় না। আশেপাশের বাড়ির জলনিকাশি ব্যবস্থা আটকে রয়েছে বড়ো বড়ো লোহার পাত পড়ে থাকার জন্য। পুরসভা বলেছে নির্মাণের কাজ হয়ে গেলে নর্দমা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। কিন্তু আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারছি না।”
চলছে বহুতল নির্মাণের কাজ
ব্যারাকপুরের পুরপ্রধান উত্তম দাস প্রথমে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেই চাননি। পরে একটি চিঠি লিখে মিতাদেবীকে জানান, পুরসভার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে পাঁচিল নতুন করে গড়ে দেওয়া হবে। বাড়ির অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি এবং জলনিকাশি ব্যবস্থাও মেরামত করে দেওয়া হবে। ব্যয়ভার বহন করবে পুরসভা। কিন্তু ১৩ জানুয়ারি থেকে পাঁচিল নির্মাণের কাজ শুরু করে দেওয়া হয়। তথাগত বলেন, “আমাদের না জানিয়ে পাঁচিল ভেঙে ফেলা হয়েছিল, তেমনি কোনো আগাম বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পাঁচিল মেরামতির কাজ শুরু হয়। বাড়ির স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ কতটা হয়েছে, তা জানতে আমরা ইঞ্জিনিয়ার পাঠানোর আর্জি করেছিলাম। ফলাফলে আমরা সন্তুষ্ট নই। নিজেরাই বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করে খতিয়ে দেখতে চাই।”
তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মা – এখন দু’জনেই থাকেন সেই বাড়িতে। বিভূতিভূষণের স্মৃতি বিজড়িত ‘আরণ্যক’-এ পর্যটকের আনাগোনা লেগেই থাকে। সেই ঐতিহ্যের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
