ভাটোরা দ্বীপের ‘অন্যরকম’ শৈশব – সন্নিধ রায়চৌধুরীর ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি

পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম ভাটোরা, যা পরিচিত মাছ ধরার গ্রাম হিসেবে

পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম – ভাটোরা। যা পরিচিত মাছ ধরার গ্রাম হিসেবে। এখানকার বেশিরভাগ শিশুই বড়ো হয় তাদের বাবা-মা-কে ছাড়াই। কারণ খুব ভোরে মাছ ধরতে বের হন তাঁরা, তারপর সেই মাছ বাজারে বিক্রি করে সংসার চলে অধিকাংশের। বাচ্চাদের সঠিক উপদেশ দেওয়ার কেউ নেই, ছোটো থেকে একা একাই বড়ো হতে হয় তাদের। ফলস্বরূপ, অনেকসময় ভুল পথে চালিত হয় শিশুরা।

তরুণ ফটোগ্রাফার সন্নিধ রায়চৌধুরী বলেন, “ভাটোরা যাওয়ার সময় প্রায় চল্লিশ মিনিট হেঁটেছি ছবি তুলতে তুলতে। হঠাৎই কিছু বাচ্চাদের চোখে পড়ে। নজরে আসে তাদের ধূমপান করার মুহূর্ত। কাছে গিয়ে বুঝলাম, বাঁশ বা কঞ্চির মধ্যে তামাক দিয়ে ওরা ধূমপান করে। ওদের শাসন বা বারণ করার কেউ নেই। কারণ ওরা এভাবেই বড়ো হচ্ছে। অথচ ওদের সঙ্গে প্রচুর গল্প করি। এমনকি ওরা নদীর ঘাট অবধি এগিয়ে দেয়। মানুষ হিসেবে ওরা খুবই ভালো।”

সন্নিধ রায়চৌধুরীর বড়ো হওয়া কলকাতা শহরে। কিন্তু তিনি ভুলে যাননি তাঁর শিকড়। সুযোগ পেলেই গ্রামে পৌঁছে যান। সেখান থেকে তাঁর ক্যামেরার ফ্রেম খুঁজে নেয় নানান মানুষকে, তাদের রুটি-রোজগার, জীবনপ্রণালী, বেঁচে থাকার আর্তনাদ-সকল। রূপনারায়ণ নদী পেরিয়ে একদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে সান্নিধ্য আবিষ্কার করেছিলেন এই ভাটোরা গ্রামের শিশুদের।

মোটামুটি ক্লাস টুয়েলভের পর থেকেই ছবি তোলার নেশা তাঁর। ফটোগ্রাফি কেন টানল সন্নিধকে! তিনি জানান, “কথা বলার চেয়ে একটা ফটোগ্রাফির মাধ্যমে আমার কথা খুব সহজভাবে বোঝাতে পারব দর্শকদের। আমার জন্ম এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে। কলকাতার বিখ্যাত সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়িতে। কিন্তু এত শহর-গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে আমি আবিষ্কার করি কত ধরনের মানুষকে। প্রত্যেকের বেঁচে থাকার তাগিদ আলাদা, জীবন যাপন আলাদা, প্রত্যেকেই কিছুর একটা সন্ধানে মেতে আছেন। ধর্ম-বর্ণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষ হিসেবে আসলে আমরা সবাই এক। এমনকি খাওয়ার ব্যাপারের আমার কোনও অনীহা নেই। বিফ খাই, পর্ক খাই, এমনকি বাড়ির কালীপুজোয় নির্জলা উপবাসও করি। এই শিক্ষাটা কিন্তু আমার ফটোগ্রাফির মাধ্যমে এসেছে।”

জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় লিখেছেন, “জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি, বছরের পার,/ তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!” সন্নিধ রায়চৌধুরী তাঁর ছবিতে খুঁজে নিতে চাইছেন এক প্রকাশ্য চলমানতা। যে ছবি কথা বলে, হাঁটে, হাসে, কাঁদে। ফটোগ্রাফিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সন্নিধ। তিনি যে কথাগুলি বলছিলেন, তা যতটা তাঁর নিজের, ততটাই আমাদের সবার। এখানেই শিল্পীর আরাম, শিল্পের আরাম।

ভাটোরা এলাকার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। এখন ওই গ্রামে পর্যাপ্ত খাবার, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎ আছে। আর যা যা নেই, তাও শীঘ্রই সমাধান হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস। কথা প্রসঙ্গে সান্নিধ্য বলেন, “গ্রামবাংলার এই যে র-নেস (Rawness), এটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এখানে গেলেই বোঝা যায় মানুষ কী বিচিত্র জীব! তারা যেমন খুনোখুনি করে, আবার পাশের বন্ধুটিকে জড়িয়েও ধরে। আসলে ওখানে বাচ্চাদের ছবি তুলব বলে যাইনি। কিন্তু তাদের এই মুহূর্তটা হাতছাড়া করতে চাইনি। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে এই সিরিজ।”

সন্নিধ রায়চৌধুরী

ভাটোরা, যেন হয়ে উঠেছে শান্ত নির্জন এক স্বাধীন দ্বীপ।

Developed by DXDasia